অর্থনীতির প্রাণ বা প্রধান চালিকাশক্তি বলা হয় বেসরকারি খাতকে। অথচ দেশে বেসরকারি খাতের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি—এই চতুর্মুখী আক্রমণের শিকার হয়েছে আমাদের বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাত কতটা বিপর্যস্ত তার কিছুটা প্রমাণ মেলে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার থেকে। কয়েক মাস ধরেই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে, যার অর্থ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি নিম্নমুখী।
দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। আবার কয়েক বছর ধরে চলে আসা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অনেক চালু কারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বেকারত্ব আকাশছোঁয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজ গবেষকরা বলছেন, বেসরকারি খাতের এই সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকবে না, সামাজিক নানা ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, বেকারত্ব বাড়বে। আর বেকারত্ব বাড়লে তা সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৯৮ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে মোট ১৭ লাখ ৩৮ হাজার ৭৬৯.৮০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল, যা এক বছর পরে বেড়ে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯.৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ঋণের মোট পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন সময়কালে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ। কিন্তু বছরের প্রথম পাঁচ মাসের কোনো মাসেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এতে স্পষ্ট যে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় ঋণপ্রবাহ না থাকায় বিনিয়োগ কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, যা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপও নতুন ঋণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সম্মাননীয় ফেলো হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে আনা, ব্যবসাবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণ কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে পারলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে। অন্যথায় এই নিম্নগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর আরো চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতি সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

