জনগণের করের টাকায় বেতন পান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিনিময়ে তাদের দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া। তবে সেই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা নিজেদের কিংবা পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা পরিচালনা করে সরকারি চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন।
এমন অভিযোগই উঠে এসেছে যমুনা টেলিভিশনের এক অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেউ নিজের নামে, আবার কেউ স্ত্রী, সন্তান বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। লাইসেন্স পরিবারের সদস্যদের নামে হলেও বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত থাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার হাতেই। অভিযোগ রয়েছে, দাপ্তরিক ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ বাগিয়ে নেওয়ারও। পাশাপাশি নামমাত্র মূল্যে জমি কিনে পরে বিপুল মুনাফায় বিক্রির অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই বিনিয়োগের অর্থের উৎস কী?
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হতে পারেন না। সরকারি চাকরির পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া শুধু নৈতিক বিচ্যুতিই নয়, আইনগতভাবেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ধরনের অভিযোগে অতীতেও আলোচনায় এসেছেন একাধিক সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় জেকেজির মাধ্যমে করোনার ভুয়া পরীক্ষার সনদ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন চিকিৎসক সাবরিনা শারমিন হোসেন। পরে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।
একইভাবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম. মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লাভস এন্ড লাইভস অর্গানিক লিমিটেডসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে তথ্য উঠে আসে, এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পর আদালত তাদের আয়কর সংক্রান্ত নথি তলব করেন।
ছাগলকাণ্ডে আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের নামে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। যা সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ হিসেবে তদন্তে উঠে আসে।
অন্যদিকে পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নামেও অবসরের পর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। অথচ আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধস্তন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘ধনী হতে চাইলে সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় যেতে।’
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আরো তিনজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের নামে আবাসন ব্যবসার তথ্য উঠে এসেছে। তারা হলেন অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিমউদ্দিন, কাজী ফজলুল করিম এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য মনির হোসেন। অনুসন্ধান বলছে, এই তিন কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের নামেই গড়ে উঠেছে একাধিক আবাসন ব্যবসা। তাদের মধ্যে রয়েছে গাজী জসিমুদ্দিনের স্ত্রী খালেদা আমিন, কাজী ফজলুল করিমের স্ত্রী নুজহাত ফাতেমা এবং মনির হোসেনের স্ত্রী উম্মে কুলসুম।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা যদি ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে সরকারের অনুমতি ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করেন, তবে তা আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ব্যবসা করার আগ্রহ থাকলে সরকারি চাকরি ছেড়ে সেই পেশায় যাওয়াই উচিত। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টিকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অনিয়মে জড়ানোর সাহস না পায়।



