পাবনার ফরিদপুর উপজেলার পুঙ্গলি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুজিত কুমার মুন্সির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও চরম কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় ইউনিয়নবাসীর মধ্যে।
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ নিত্যদিনের জরুরি সেবা পেতে দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরেও সাধারণ মানুষ কোনো সমাধান পাচ্ছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অধিকাংশ সময় নিজ কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন এবং স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়ে কোনো তোয়াক্কা করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে এই মৎস্য কর্মকর্তাকে সরিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কোনো দক্ষ কর্মকর্তাকে এই ইউনিয়নের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে পাবনা জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মৎস্য কর্মকর্তা সুজিত কুমার মুন্সি ইউনিয়ন প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নাগরিক সেবা প্রাপ্তি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নানাভাবে নাজেহালের শিকার হচ্ছেন তারা। সরজমিনে পুঙ্গলি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্রের খোঁজ পাওয়া যায়।
বিল চন্দন এলাকার শাহানাজ পারভীন নামের এক নারী ওয়ারিশ সার্টিফিকেট নিতে এসে চরম হয়রানির শিকার হন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অনেক হয়রানির পর শেষ পর্যন্ত ২০০ টাকা দেওয়ার পর আমার কাজ করে দেওয়া হয়েছে।’
শাহাদাত হোসেন নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগের প্রশাসক থাকাকালীন ছোটখাটো কাজের জন্য কোনো টাকা লাগত না। কিন্তু এখন ছোটখাটো কাজ করতে গেলেই ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া জন্মনিবন্ধন ও ওয়ারিশ সার্টিফিকেট নিতেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে।’
পাছ পুঙ্গলি এলাকার বাদশা সরদার বলেন, ‘দিনের পর দিন বসে থেকেও একটা স্বাক্ষর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আজ সকালে এসে দুপুর পর্যন্ত বসে আছি, অথচ কোনো কাজ করে নিতে পারছি না।’
জাকিরুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ‘এখানে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। প্রশাসকের একটা স্বাক্ষর নিতে এক সপ্তাহ লেগে যায়। তিনি সপ্তাহে একদিনও ইউনিয়ন পরিষদে আসেন কিনা, আমরা তো কোনোদিন দেখতে পাই না।’
সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় এক অভিনব চিত্র। প্রশাসক সুজিত কুমার মুন্সীর মূল স্বাক্ষর ছাড়াই জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট, ওয়ারিসনামা, চারিত্রিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ যাবতীয় কাগজপত্রে কম্পিউটার থেকে স্ক্যানিং করা স্বাক্ষর বসিয়ে প্রিন্ট দেওয়া হচ্ছে। আর সেখানে দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশরা ওই ডিজিটাল স্বাক্ষরের নিচে বর্তমান তারিখ বসিয়ে গ্রাহকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিষদের কর্মচারীরা জানান, প্রশাসক স্যার সপ্তাহে একদিন আসেন আবার নাও আসেন। নিয়মিত কার্যালয়ে না আশায়। ফলে জনভোগান্তি এড়াতে বাধ্য হয়ে তারা এ পদ্ধতিতে কাজ করে দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা জানান, বর্তমান প্রশাসকের উদাসীনতার কারণে ইউনিয়নের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, ইউনিয়ন পরিষদের চলমান উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও কাজের নিম্নমান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই।
বিশেষ করে মাটি ভরাট ও ইটের রাস্তার 'কাবিটা-কাবিখা' প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই আট পুঙ্গলী পাকারাস্তা থেকে কবরস্থানের আধা কিলোমিটার রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নিয়ম ভেঙে সেখানে শুধু বাঁশ দিয়ে দুর্বল পাইলিং করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে যে ধরনের কাজ করা হচ্ছে, রাস্তাটি আগের অবস্থায় এর চেয়ে অনেক ভালো ছিল।
এছাড়া প্রকল্প অনুযায়ী বাইরে থেকে মাটি কিনে আনার নিয়ম থাকলেও স্থানীয় মানুষের জায়গা থেকে জোরপূর্বক মাটি কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি এলাকার আরো একটি জলঢালাই রাস্তার কাজেও কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
এসব অনিয়ম, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মৎস্য কর্মকর্তা ও পুঙ্গলি ইউনিয়ন প্রশাসক সুজিত কুমার মুন্সি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে তিনি বলেন কোন অভিযোগ থাকলে সেটা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন আমার বিরুদ্ধে কেউ কোথায় অভিযোগ দিয়েছে আমি জানি না।’




