বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ-সংঘাত ছাড়াও দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক সংকটে চরম বিপর্যয়ের মুখে পৃথিবীর ৮৭টি দেশের প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লাখ শিশুর শিক্ষাজীবন। ‘অবরুদ্ধ শৈশবের’ এমন করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে জাতিসংঘের জরুরি শিক্ষা বিষয়ক বৈশ্বিক তহবিল ‘এডুকেশন ক্যাননট ওয়েট’ (ইসিডব্লিউ) ২০২৬ এর প্রতিবেদনে।
সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীর ৮৭টি দেশের প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লাখ শিশুর শিক্ষাজীবন এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে, দুই বছর আগের তুলনায় যা ২১ মিলিয়ন বা ২ কোটিরও বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটের আবর্তে পড়া এই বিপুল শিশুর মধ্যে ৯ কোটি ৩০ লাখ শিশুই বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে স্কুলের বাইরে। এই সংকট কেবল বৈশ্বিক নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে এতটাই ঘনীভূত যে, দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জর্জরিত মাত্র ৯টি দেশেই বসবাস করছে ভুক্তভোগী এসব শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশ।
সংঘাতের কারণে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত ও ঘরবাড়ি হারানো শরণার্থী শিশুদের গল্প আরও বেদনাদায়ক। সাধারণ সংকটকবলিত এলাকায় যেখানে ৩৬ শতাংশ শিশু স্কুলের বাইরে থাকে, সেখানে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার অর্ধেক ছাড়িয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া শরণার্থী শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে প্রায় তিনজন (৭৪ শতাংশ) শিশুই শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
তবে এই শিশুরা যে স্বেচ্ছায় স্কুল ছাড়ছে, তা কিন্তু নয়। ইসিডব্লিউ’র প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে যে, পরিবারের অনিচ্ছা বা পড়াশোনার প্রতি অনীহা এর জন্য দায়ী নয়; বরং বাবা-মায়েরা তাদের শেষ সম্বলটুকু থাকা পর্যন্ত সন্তানকে ক্লাসে পাঠাতে লড়াই করেন। মূলত চরম আর্থিক অনটন, ক্ষুধার তাড়না এবং সংঘাতের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়াই শতকরা ৮০ ভাগ শিশুর স্কুল থেকে ঝরে পড়ার মূল কারণ।
কিন্তু যখন এই শিশুদের পাশে দাঁড়ানো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে মানবিক শিক্ষার জন্য বরাদ্দ আন্তর্জাতিক তহবিল ও অনুদান আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। সবমিলিয়ে বিদ্যালয় থেকে এই দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতা শিশুদের জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংকটের মুখোমুখি হওয়া শিশুদের ৯০ শতাংশই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরও সাধারণ রিডিং পড়া বা প্রাথমিক গণিতের ন্যূনতম যোগ্যতাটুকু অর্জন করতে পারছে না, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশে। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যে শিশু ১০ বছর বয়সের মধ্যে সাধারণ রিডিং পড়তে শেখে না, ১৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই তার স্কুল থেকে চিরতরে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
সংকটময় এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্বব্যাংকের ফ্রেমওয়ার্ক ও বিশেষজ্ঞরা কেবল বই-খাতা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। সংঘাত, বোমা আর বাস্তুচ্যুতির ট্রমা, গভীর উদ্বেগ ও বিষণ্নতা শিশুদের মনের ভেতর যে গভীর ক্ষত তৈরি করে, তা তাদের শেখার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে স্থবির করে দেয়। তাই শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ ও শক্তিশালী ভিত্তি পুনর্গঠন করতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সহযোগিতা দেওয়াকে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক কর্তব্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।