বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি বন্ধ করার বিষয়ে সব সময়ই একমত। ক্ষমতায় থাকুক, আর বিরোধী দলেই থাকুক—সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি বন্ধ হয় না। ক্রমাগত বেড়েই চলে দুর্নীতির চিত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন এক চিত্র আমাদের সামনে আসে।
সরকার বদলায়, স্লোগান বদলায়, কিন্তু দুর্নীতি থেকে যায়। কখনো কখনো তা আরো বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে জানানো হয় যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবা খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরো বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১.৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০.৯ শতাংশ।
দুর্নীতি হচ্ছে মূলত মাঠ পর্যায়ে। সরকার বদলালেও কাঠামো বরাবরই একই রকম ছিল। দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অপরাধে শাস্তির উদাহরণ না থাকায় তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। তবে দেশের অনেকেই আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো দুর্নীতি হবে না। সব অফিশিয়াল কাজকর্ম নিয়ম অনুযায়ী হবে। ঘুষ, দুর্নীতির কোনো চিহ্ন দেখা যাবে না। দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে সব উল্টো হয়েছে। বৈষম্য বেড়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে। কিছুদিন আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি হয়েছে। অবশ্য তিনি নিজেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। টিআইবির প্রতিবেদনে তেমনটাই প্রমাণিত হয়েছে, যেমনটা এনসিপির আহ্বায়ক বলেছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের মুখে জোরালো আওয়াজ শোনা গেলেও তা কমাতে বাস্তবিক তারা কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। কোনো কোনো উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অভিযোগ উঠলেও প্রধান উপদেষ্টা সেটি আমলে নেননি। এমনকি কমিশন গঠন ছাড়া মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি দমনে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
টিআইবি পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বছরে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.২৩ শতাংশের সমান।
বাংলাদেশে জমির খতিয়ান তুলতে ঘুষ, বিদ্যুতের সংযোগ নিতে ঘুষ, ব্যবসার অনুমোদন পেতে ঘুষ, চাকরি পেতে ঘুষ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার পেতেও ঘুষ দিতে হয়। যে রাষ্ট্রের নাগরিককে সেবা দেওয়ার কথা, সেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সেবাকে অনেক সময় পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো উদ্বেগজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। সরকারি অফিসে ঘুষ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অর্থপাচার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আসলে সমস্যা কোথায়?
অনেকে মনে করে, দুর্নীতির মূল কারণ কিছু অসৎ ব্যক্তি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা রাজনীতিক জন্মগতভাবে দুর্নীতিবাজ হয়ে ওঠেন না। তিনি একটি দুর্বল ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করেন। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি থাকে না, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না, যখন রাজনৈতিক পরিচয় বিচারকে প্রভাবিত করে, তখন দুর্নীতি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
দুর্নীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি নয়, একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একজন কর্মকর্তা, একজন ব্যবসায়ী, একজন রাজনৈতিক নেতা এবং একটি স্বার্থগোষ্ঠী পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে এমন এক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
বিগত এক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেতু হয়েছে, মহাসড়ক হয়েছে, মেট্রো রেল হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। সেসব ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়েছে। আর উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবে—এটি এ দেশে অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেই মনে করা হয়। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে মোটাদাগে কোনো উন্নয়নই হয়নি বলা যায়। তাহলে এত দুর্নীতির চিত্র কেন?
চাঁদাবাজির বিষয়টিও দুর্নীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয় না। পরিবহন, বাজার, নির্মাণ খাত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আর এই চিত্র ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।
অনেকেই মনে করে, কঠোর আইন করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন নতুন নয়। সমস্যাটি আইনের অভাব নয়, সমস্যাটি আইনের প্রয়োগে। বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তদন্ত হয়, মামলা হয়, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল অস্পষ্ট থেকে যায়। ফলে অপরাধীরা একটি বার্তা পায়—ঝুঁকি কম, লাভ বেশি।
দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা বলতে শুধু বক্তৃতা নয়, বরং নিজের দলের মানুষ হলেও অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেওয়ার মানসিকতা। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা না হলে দুর্নীতিবিরোধী কোনো অভিযান দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপমুক্ত না থাকে, তাহলে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে না।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল সেবার পরিধি আরো বাড়াতে হবে। যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমবে, সেখানে ঘুষের সুযোগও কমবে। ভূমি, কর, লাইসেন্স, সরকারি ক্রয় এবং নাগরিক সেবার পুরো প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করতে হবে।
চতুর্থত, তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অস্ত্রগুলোর একটি। সাংবাদিকরা যদি ভয়ভীতি বা চাপের মুখে কাজ করেন, তাহলে অনেক অনিয়ম অন্ধকারেই থেকে যাবে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সংস্কৃতি যত দিন থাকবে, তত দিন ক্ষমতায় গিয়ে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতাও থাকবে। ফলে দুর্নীতির চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সংস্কৃতি। আমরা প্রায়ই দুর্নীতির জন্য শুধু রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তাদের দায়ী করি। কিন্তু অনেক সময় আমরাও নিয়ম ভাঙার জন্য শর্টকাট খুঁজি, তদবির খুঁজি, ঘুষ দিয়ে সুবিধা নিতে চাই। অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজেরও দায়িত্ব।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ সংকট এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ—এসবের মধ্যে দুর্নীতি দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির কারণে শুধু অর্থের অপচয় হয় না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আইনের শাসন দুর্বল হয় এবং বৈষম্য আরো গভীর হয়।
যে রাষ্ট্রে একজন গরিব মানুষ ন্যায়বিচার পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, যে রাষ্ট্রে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, যে রাষ্ট্রে ক্ষমতার ছায়া আইনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, সেই রাষ্ট্র কখনো প্রকৃত অর্থে সমতার রাষ্ট্র হতে পারে না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাই নতুন কোনো স্লোগান নয়, প্রয়োজন দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রয়োজন রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধি। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা নয়, জবাবদিহি হবে প্রধান শক্তি; পরিচয় নয়, আইন হবে সর্বোচ্চ; আর ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থ হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলভিত্তি।
লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়




একসময় ডেঙ্গুকে শুধু ঢাকার রোগ বলা হতো। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন অতীত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের জরিপে বেশির ভাগ জেলায় ব্রেটো ইনডেক্স ২০ বা তার বেশি পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানে এই সূচক ২০-এর বেশি হলেই ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ এলাকাই এখন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আর শুধু সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।