কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই প্রায় এক হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা এর অন্তত পাঁচ গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অনেক রোগী হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে অথবা তাদের রোগ শনাক্তই হচ্ছে না। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশ আবারও একটি বড় ডেঙ্গু মৌসুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গুর উপস্থিতি ধরা পড়ে। তখন এটিকে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে চিহ্নিত করা হয়। ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে ডেঙ্গু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে বছর কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় এবং বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর পর থেকে ডেঙ্গু প্রায় প্রতিবছরই ফিরে এসেছে; কখনো সীমিত আকারে, কখনো মহামারির রূপ নিয়ে। ২০১৯ সালে এটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়। ২০২৩ সালে লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত এবং সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারির সাক্ষী হয় দেশ। ২০২৬ সালেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। চলতি মৌসুমে গতকাল পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় এডিস মশার দুটি প্রধান প্রজাতি; এডিস ইজিপটাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের মাধ্যমে। এডিস ইজিপটাই মূলত নগরাঞ্চলে এবং মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে বংশবিস্তার করে, আর অ্যালবোপিকটাস শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় বেশি দেখা যায়। উভয় প্রজাতিই কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে এবং বর্ষাকালে দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উচ্চ তাপমাত্রাও এখন এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আরো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
একসময় ডেঙ্গুকে শুধু ঢাকার রোগ বলা হতো। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন অতীত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের জরিপে বেশির ভাগ জেলায় ব্রেটো ইনডেক্স ২০ বা তার বেশি পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানে এই সূচক ২০-এর বেশি হলেই ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ এলাকাই এখন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আর শুধু সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।
আমরা এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছি। এই মডেল অনুযায়ী, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদি এখনই কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। এরই মধ্যে জুলাইয়ের শুরু থেকেই রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী এবং মাঠ পর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্বও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে এ বছর ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল, বাগেরহাট, কক্সবাজার, ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, কুমিল্লা, বান্দরবান, চাঁদপুর, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তাই এখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে মশা কম, তাই ডেঙ্গুর ঝুঁকিও কম। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ষাকালে কিউলেক্স মশার সংখ্যা বৃষ্টির কারণে কমে যায় বলে সামগ্রিকভাবে মশা কম মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার অনুপাত মোট মশার ১ শতাংশের কম হলেও একটি সংক্রমিত এডিস মশার একটি কামড়ই একজন মানুষকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। ফলে বাসায় মশা কম দেখেই মশারি ব্যবহার না করা, ফুলহাতা পোশাক না পরা কিংবা দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত না রাখা মারাত্মক ভুল হতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং প্রতিটি নাগরিককে এ কাজে একযোগে অংশ নিতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, অব্যবহৃত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, এসির ট্রে কিংবা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিবেশবান্ধব জৈব লার্ভিসাইড অথবা ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর (আইজিআর) ব্যবহার করা যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।
তবে প্রযুক্তি বা কীটনাশক একা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই এই লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তরুণসমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সারা বছরই সচেতনতা ও উৎস ধ্বংস কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য রোগীর চাপ মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখতে হবে। চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় নিয়মিত ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ডেঙ্গু এখন আর কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়। আমরা যদি আজ এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, আধুনিক নজরদারিব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করি, তাহলে আগামী দিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই সংকট আরো বড় আকারে ফিরে আসবে, যার মূল্য দিতে হবে আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু সরকারের নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




ফুটবল গড়াচ্ছে তার ইচ্ছা-মর্জি মাফিক। খেলা দেখতে বসে কখনো কখনো এই ফুটবলকে অপরিচিত মনে হয়। এতে বাড়ে অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা। সমর্থিত দল লড়াই থেকে বিদায় নেওয়ায় কেউ কেউ দল বদল করেছে। না, এই দলবদলের সঙ্গে রাজনীতির নেতা ও কর্মীদের দলবদলের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নেহাত ফুটবল বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য। ফুটবলের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। পরিচিত মহলে আমার বন্ধু জার্মানির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলা আর দেখছেন না। এটি তাঁর আবেগ।