অবিশ্বাস্য, নজিরবিহীন, অদ্ভূত। কোনো বিশেষণই আসলে বর্ণনা করা যাবে না ঘটনাটিকে। ফুটবল বিশ্বকাপে নানা সময়ে বিতর্ক কম হয়নি। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ’ঈশ্বরের হাত’-এর গোল বা ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের জিনেদিন জিদানের ঢুস বিতর্কের কথা ভোলেননি অনেকে। সেসব মাঠের বিতর্ক। কিন্তু স্বাগতিক দেশের প্রেসিডেন্ট বা কোনো রাজনৈতিক নেতারা হস্তক্ষেপে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বদলে দেয়ার কোনো নজির নেই। শুধু ফুটবল নয়, কোনো খেলাতেই এমন নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির খুঁজে পাওয়া ভার।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এবারের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হলেও মূল আয়োজক আসলে যুক্তরাষ্ট্রই। কারণ ১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপের ৭৮টি ম্যাচই হবে যুক্তরাষ্ট্রে। কানাডা আর মেক্সিকোরে ভাগে পড়েছে ১৩টি করে ম্যাচ। ইরানের ভিসা আর তীব্র গরম বাদ দিলে, বড় কোনো বিতর্ক ছাড়াই এগুচ্ছিল বিশ্বকাপ। সেটা বোধহয় পছন্দ হয়নি ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এবারের বিশ্বকাপকে সবচেয়ে বিতর্কিত বিশ্বকাপ বানাতে তিনি এমন বিতর্কের আগুন জ্বাললেন, যা ফুটবলকে জ্বালাবে বহুদিন।
এবারের বিশ্বকাপের স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের মূল স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। টুর্নামেন্টে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩ গোল করেছেন তিনি। গত ১ জুলাই বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচেও প্রথম গোলটি তিনিই করেছিলেন। ৬১ মিনিটের সময় লাল কার্ড দেখে বালোগান মাঠ ছাড়লেও দল জিতেছে ২-০ গোলে। ব্রাজিলের রেফারি রাফায়েল ক্লজ বালোগানকে লাল কার্ড দেখান। অবশ্য প্রথমে ফাউলটি তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। পরে ভিএআর এর সহায়তায় নিশ্চিত হয়েই বালোগানকে লাল কার্ড দেখান রাফায়েল। পরে তাকে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়।
বালোগানের লাল কার্ড নিয়ে শুরুতে বিতর্ক হয়েছিল, কারণ আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে একই ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন মহাতারকা লিওনেল মেসি। এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আগামীকাল ভোর ৬টায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬এর ম্যাচে বালোগানের মাঠে নামার সুযোগ ছিল না। তবে এক ফোনে ভোজভাজির মত পাল্টে যায় সব। স্বাগতিক দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফোন করেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। তার রিভিউর আবেদনে সাড়া দিয়ে ফিফা বালোগানের ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেয়। তার মানে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বালোগানকে নিয়েই মাঠে নামবে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার সিদ্ধান্তের পর নিজ মালিকানার ট্রুথ সোশ্যালে ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ফিফাকে ধনবাদ ঠিক কাজটি করার জন্য। একটা অন্যায় বদলে দেয়ার জন্য।’
ট্রাম্পের এই ফোন আর ফিফার এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে এখন তোলপাড় ফুটবল বিশ্বে। অনেকেই মনে করেন, ট্রাম্পের সাথে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের সুবাদেই বদলে গেছে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত।
রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, ম্যাচ-পূর্ব এই কারসাজি ফিফা’র নিয়মকানুন লঙ্ঘন করেছে এবং ফেয়ার প্লের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বেলজিয়াম জাতীয় দলের কোচ রুডি গার্সিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, ফেডারেশন জাতীয় সম্মান রক্ষার জন্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ফুটবলের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেবে। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন সোমবার জানিয়েছে, তারা বালোগানের খেলার যোগ্যতার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করছে, যদিও তারা এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ফিফার স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বালোগানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার স্থগিতাদেশ টুর্নামেন্টের সুনামকে হুমকির মুখে ফেলেছে। উয়েফা বলছে, ‘নিয়মের অভিভাবকরাই যখন আর তার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না, তখন খেলার সততা বা সংহতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং একটি প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।’
তবে কে কী বললো, তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু যায় আসে না। সোমবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, তার কাছে মনেই হয়নি এটা ফাউল ছিল। ফিফার প্রেসিডেন্টের সাথে নিজের কথোপকথনের বিস্তারিত তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, বালোগানের লাল কার্ড ও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে তিনি ফিফা প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি শুধু রিভিউ করতে বলেছিলাম। আমি তো বলিনি, এটা করতেই হবে। আমি এটা বলতে পারি না। একটি নিরপেক্ষ কমিটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তবে ভিএআর-এর সহায়তায় মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েই ট্রাম্পের আপত্তি, ‘আমার মনে হয় না এটা ফাউল ছিল। দুজন ফুটবলার দ্রুতগতিতে দৌড়াচ্ছিল। তাতে দুজনের ধাক্কা লেগেছে।’
ট্রাম্প সেই রেফাারির সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রেফারিকে একটু সন্দেহভাজন মনে হয়েছে তার কাছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়েছেন রেফারির অতীত অনুসন্ধান করে দেখতে।
প্রেসিডেন্টের ফোনে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বদলে দেয়ার এই নজির ফুটবলের কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে বহুদিন। আর ট্রাম্প যেভাবে রেফারির অতীত অনুসন্ধানের পরামর্শ দিলেন, তাতে রেফারিরা কতটা নিরপেক্ষভাবে ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলো।






