মৃত্যু মানুষের জীবনের অবধারিত পরিণতি। পৃথিবীর সব পরিচয়, ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব একদিন মৃত্যুর কাছে থেমে যায়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের কর্ম, চরিত্র, ঈমান, ইলম ও মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাই ইতিহাসে আমরা দেখি, কোনো কোনো নেককার আলেম, দাঈ, মুজাহিদ বা সমাজসেবকের ইন্তেকালে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, আবার অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি নীরব পরিবেশে দাফন হয়েছেন। প্রশ্ন হলো—জানাজায় মানুষের সংখ্যা কি ইসলামে বিশেষ কোনো মর্যাদার প্রমাণ? অধিক লোকের উপস্থিতি কি মৃত ব্যক্তির কল্যাণের নিশ্চয়তা বহন করে?
ইসলাম বাহ্যিক সংখ্যা বা লোকদেখানো সম্মানের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়। তবে একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, নেককার ব্যক্তির জন্য মুমিনদের আন্তরিক দোয়া, সৎ সাক্ষ্য এবং জানাজার সালাতে অধিক সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ইসলামে মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া। জানাজায় মানুষের সংখ্যা, সামাজিক অবস্থান বা বাহ্যিক জনপ্রিয়তা নয়; বরং আল্লাহভীতি ও নেক আমলই প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড।
জানাজায় বহু মানুষের সমাগম মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণের একটি কারণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তির জানাজায় এমন চল্লিশজন মুসলিম অংশগ্রহণ করবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, এবং তারা তার জন্য সুপারিশ (দোয়া) করবে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জানাজায় অধিকসংখ্যক ঈমানদার মানুষের উপস্থিতি মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের একটি কারণ হতে পারে। তবে এর মূল বিষয় হলো—তাঁদের আন্তরিক দোয়া ও ঈমান, শুধু সংখ্যা নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্য হাদিসে আরও বলেন, ‘যে মুসলিমের জানাজায় একশত মুসলিম অংশগ্রহণ করে এবং সবাই তার জন্য দোয়া করে, তাদের দোয়া কবুল করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৭)
এখানে সংখ্যার উদ্দেশ্য গৌরব প্রদর্শন নয়; বরং বেশি সংখ্যক মুমিনের আন্তরিক দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা।
মুমিনদের সাক্ষ্য একটি সুসংবাদ
একবার একটি জানাজা অতিক্রম করলে সাহাবিগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে।’ পরে আরেক ব্যক্তির জানাজা গেলে সাহাবিরা তার নিন্দা করেন। তখন তিনি বলেন, ‘তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে।’ এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৩৬৭)
এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, মানুষের মতামতই চূড়ান্ত ফয়সালা। বরং নেককার ব্যক্তির ব্যাপারে সৎ মুমিনদের স্বতঃস্ফূর্ত উত্তম সাক্ষ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি শুভ লক্ষণ হতে পারে।
আল্লাহ যাঁকে ভালোবাসেন, মানুষও তাঁকে ভালোবাসে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে বলেন, 'আমি অমুককে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাস।' এরপর আকাশবাসীদের মধ্যে তাঁর ভালোবাসার ঘোষণা দেওয়া হয়। অতঃপর পৃথিবীতেও তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩২০৯)
এ কারণেই অনেক নেককার আলেম ও বুযুর্গের মৃত্যুতে অসংখ্য মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন। ইতিহাসে বহু মনীষীর জানাজায় অভূতপূর্ব মানুষের সমাগম ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইবনে তাইমিয়া (রহ.)।
জানাজায় বহু মানুষের উপস্থিতি কামনা করার চেয়ে এমন জীবন গড়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ মৃত্যুর পর আন্তরিকভাবে আমাদের জন্য দোয়া করে। একজন মুসলমানের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাসের সঙ্গে আমল করা।
২. কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করে জীবন-যাপন করা।
৩. মানুষের উপকার করা এবং উত্তম চরিত্র গঠন করা।
৪. জীবদ্দশায় এমন আচরণ করা, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ কল্যাণের সাক্ষ্য দেয় ও দোয়া করে।
৫. অন্যের জানাজায় অংশগ্রহণ করে তার জন্য আন্তরিকভাবে মাগফিরাতের দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এমন জীবন দান করুন, যা মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মুমিনদের আন্তরিক দোয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। আমিন।




