ইসলামী রাজস্বনীতির কতগুলো মৌলিক উদ্দেশ্য আছে। এক. জনগণের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করা। দুই. সম্পদ জমিয়ে না রেখে তা ন্যায়পূর্ণ বণ্টনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তিন. অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগ সম্প্রসারিত করা। চার. বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাস করা। পাঁচ. আয় ও সম্পদের বণ্টন সুনিশ্চিত করা। (সূত্র : ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা : তত্ত্ব ও প্রয়োগ)
ইসলামী রাজস্বব্যবস্থার উৎস
ইসলামী রাজস্বের উৎসগুলো কোরআন, হাদিস ও খোলাফায়ে রাশেদার নীতিমালার আলোকে নির্ধারিত হয়েছে। এ আয়ের উৎসসমূহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী রাজস্বব্যবস্থাকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা—ভূমি রাজস্ব, খুমুস জাকাত, সাদাকা ও জিজিয়া
মালিকানা বা উত্তরাধিকারহীন ধন-সম্পদ
১. ভূমি রাজস্ব : রাষ্ট্রের সব ভূমি ব্যবহার করার নিমিত্তে জনগণের কাছ থেকে যে কর আদায় করা হয়, তাকে ভূমি রাজস্ব বলে। দেশের জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এটিকে আবার দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা—ক. ওশর ও খ. খারাজ। এই দুুটিই ভূমি রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ক. ওশর : আরবি ‘আশারাতুন’ শব্দ থেকে ওশর শব্দটি এসেছে। এর শাব্দিক অর্থ এক-দশমাংশ। যে জমির মালিক মুসলমান অথবা যে জমি মুসলমানই সর্বপ্রথম চাষের উপযোগী করে তুলেছে, সে জমি ওশরি জমি হিসেবে অভিহিত।
ওশর সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যা উপার্জন করো এবং যা আমরা তোমাদের জন্য জমিতে উৎপন্ন করো, সেখান থেকে উত্কৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো। আর সেখান থেকে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্প কোরো না, যা তোমরা নিজেরা গ্রহণ করো না চোখ বন্ধ করা ছাড়া। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত ও চির প্রশংসিত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৭)
ওশর প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপন্ন ফসলের ওপর (এক-দশমাংশ) ওশর ওয়াজিব হয়। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের ওপর অর্থ (বিশ ভাগের এক ভাগ) ওশর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৮৩)
খ. খারাজ : সাধারণত ভূমির ওপর ধার্যকৃত করকে খারাজ বলে। তবে ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের মালিকানা বা ভোগকৃত জমি থেকে যে রাজস্ব আদায় করা হয়, তাকে খারাজ বলা হয়। জমির জরিপ ও গুণাগুণ নির্ণয় করে ইসলামী রাষ্ট্র খারাজের পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকে। খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামলে দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা) সর্বপ্রথম ইরাক, সিরিয়া ও মিসরের বিস্তৃত উর্বর জমির ওপর জরিপ পরিচালনা করেছিলেন। এ জন্য ভূমি রাজস্ব বিষয়ে পারদর্শী হজরত উসমান বিন হানিফ (রা) জরিপের কাজ পরিচালনা করেন। খারাজ রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সম্পদ। তাই এটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জমির গুণাগুণ, উর্বরতা, সেচ ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো অবহেলার কারণে ভূমির মালিকের প্রতি অবিচার বা জুলুম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ অবিচার হলো কঠিন গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জালিমদের (যারা জুলুম ও অবিচার করে) জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি।’ (সুরা : কাহফ : ২৯)
অবিচার বা জুলুম সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের ওপর জুলুম হারাম করে দিয়েছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম কোরো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৭)
২. খুমুস : আরবি শব্দ ‘খুমুস’, অর্থ এক-পঞ্চমাংশ। ইসলামী শরিয়তে এটি একটি বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে আর্থিক ব্যবস্থার অংশ। এটি এমন একটি কর, যা নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের ওপর প্রযোজ্য। ইসলামী আইন মতে, সাধারণত যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনিমতের মাল) এক-পঞ্চমাংশ খুমুস হিসেবে গণ্য করা হয়। যা ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমাল তহবিলে জমা করতে হয়। গনিমত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর নির্দেশনা হচ্ছে, ‘আর তোমরা জেনে নাও যে যুদ্ধে তোমরা যেসব বস্তু গনিমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরের জন্য। যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর ওপর এবং যা কিছু (বণ্টননীতি) আমরা নাজিল করেছি আমাদের বান্দার ওপর সত্য-মিথ্যার ফায়সালার দিন এবং দুই দলের জমা হওয়ার দিন (অর্থাৎ বদরের যুদ্ধের দিন)। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : আনফাল : ৪১)।
এ ছাড়া খনিজ সম্পদ, সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ও গুপ্তধনের ওপরও খুমুস প্রযোজ্য। এসব অর্থের প্রতিটি থেকে এক-পঞ্চমাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমালে জমা করার বিধানকে খুমুস বলা হয়।
৩. জাকাত ও সাদাকা : ইসলামে জাকাতের বিধানকে ফরজ করা হয়েছে। জাকাত কোনো কর বা ট্যাক্স নয়, বরং এটি আর্থিক ইবাদত। এটি সম্পদের পবিত্রকারী। জাকাত ইসলামী অর্থব্যবস্থার হৃৎপিণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ইসলামী সমাজে আয় ও সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য দূর করে জাকাত।
জাকাত রাষ্ট্রের দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত এবং অবহেলিত বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি সুরক্ষাবলয়। তাই পবিত্র কোরআনের প্রায় ৩০টি আয়াতে জাকাতের কথা বলা হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ মাল বা সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নাম জাকাত। জাকাত সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা জাকাত বণ্টনের খাত ও নীতি ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘জাকাত (সাদাকাসমূহ) আট শ্রেণির লোকের জন্য। ফকির, অভাবগ্রস্ত, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তি, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬০)
৪. জিজিয়া : জিজিয়া অর্থ হচ্ছে মাথাপিছু ধার্যকৃত কর। এটি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের ওপর ধার্যকৃত নিরাপত্তা কর। ইসলামী রাষ্ট্রে যুদ্ধ করতে সক্ষম অমুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে দেশ রক্ষার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিবছর যে অর্থ আদায় করা হয়, তাকে জিজিয়া বলা হয়। জিজিয়া সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যুদ্ধ করো আহলে কিতাবদের মধ্যকার সেসব লোকের বিরুদ্ধে, যারা আল্লাহ ও বিচার দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম করে না ও সত্য দ্বিন (ইসলাম) কবুল করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা বিনীত হয়ে করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৯)
৪. মালিকানাবিহীন সম্পদ : দুনিয়ার সম্পদের মালিক এক আল্লাহ। মানুষ দুনিয়াতে তাঁর খলিফা হিসেবে সাময়িকভাবে তাঁর সে সম্পদ ভোগ করে। সমাজে অনেক সময় দেখা যায় অনেক সম্পদ এমন আছে তার কোনো মালিক বা উত্তরাধিকার নেই। এসব মালিকানাবিহীন সম্পদের মালিক হবে ইসলামী রাষ্ট্র। এসব সম্পদ রাষ্ট্র দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবে।
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনীতি পরিচালনায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যে নীতি ও বিধান দিয়েছেন তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশের মানুষ যেমন সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন লাভ করবে, তেমনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ লাভ করবে, যেখানে জুলুম, অবিচার ও নীতিহীনতার লেশমাত্র থাকবে না।




