মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন হলো পরিবার। একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল পরিবার, আর সেই পরিবারের ভিত্তি হলো বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমান সময়ে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে পরকিয়ার মতো জঘন্য অনৈতিক সম্পর্ক সমাজে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শান্তি ও পারস্পরিক বিশ্বাস।
পরকিয়া কী?
পরকিয়া বলতে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক নিজের বৈধ জীবনসঙ্গী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে প্রেম, আবেগ, অন্তরঙ্গতা বা অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বোঝায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত। এবং মারাত্মক অপরাধ।
১. ব্যভিচারের যাবতীয় উপকরণ থেকে বেচেঁ থাকার নির্দেশ
ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সকল পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
এই আয়াতে অবৈধ প্রেম, গোপন সম্পর্ক, অশালীন বার্তা আদান-প্রদান, অনৈতিক মেলামেশা কিংবা এমন যেকোনো আচরণ যা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়—সবই নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে।
২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ
পরকিয়ার সূচনা প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি থেকে হয়। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)
এরপর আল্লাহ তাআলা নারীদের প্রতিও একই নির্দেশ প্রদান করেছেন। ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
দৃষ্টি সংযম মানুষের অন্তরকে পবিত্র রাখে এবং অবৈধ আকর্ষণ থেকে রক্ষা করে।
৩. একাকী নির্জনে অবস্থান নিষিদ্ধ
ইসলাম পরপুরুষ ও পরনারীর নির্জনে একত্রে অবস্থান করতে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২১৬৫)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অনেক বড় অপরাধের সূচনা হয় ছোট ছোট অসতর্কতা থেকে।
৪. লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ
পরকিয়া প্রতিরোধে লজ্জাশীলতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৯)
লজ্জাবোধ মানুষকে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রাখে।
৫. বিবাহকে সহজ করার নির্দেশ
অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধে ইসলাম বৈধ বিবাহকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করে দাও।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)
বিবাহ মানুষের চরিত্রকে সংযত রাখে এবং অবৈধ সম্পর্কের প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
৬. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার আদায়
পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ বজায় থাকলে পরকিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য—প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।
৭. অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা
বর্তমান যুগে অশ্লীল সিনেমা, অনৈতিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অশালীন বিনোদন পরকিয়ার অন্যতম কারণ। তাই এসব থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)
৮. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জন
যে ব্যক্তি সর্বদা মনে রাখে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, সে সহজে গুনাহে লিপ্ত হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২)
এভাবে তাকওয়া মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে রাখে।
পরকিয়ার ভয়াবহ পরিণতি
পরকিয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। এর ফলে—
১. পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।
২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।
৩. সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
৪. সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়।
৫. আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আখিরাতের কঠিন শাস্তির কারণ হয়।
অতএব, পরকিয়া প্রতিরোধে শুধু আইন নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, আত্মসংযম, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ইসলামী নৈতিকতার চর্চা অপরিহার্য। পরকিয়া একটি পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসলাম মানবজাতির কল্যাণে এমন একটি জীবনব্যবস্থা প্রদান করেছে, যেখানে দৃষ্টি সংযম, লজ্জাশীলতা, বৈধ বিবাহ, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, আল্লাহভীতি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পরকিয়ার সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনো সাময়িক আবেগ বা পার্থিব মোহের কাছে নিজের ঈমান, পরিবার ও সম্মানকে বিসর্জন দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র জীবনযাপন এবং হারাম সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




