মসজিদ শুধু ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; বরং এটি মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির উদ্যান। যখন কোনো বান্দা নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন, তখন মসজিদের দেয়াল, মেহরাব আর মুসল্লিদের সঙ্গে তাঁর এক অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই অনুভূতি তাঁকে বারবার টেনে আনে আল্লাহর ঘরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন সালাত ও জিকিরের জন্য মসজিদে অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তার প্রতি এতটাই আনন্দিত হন, যেমন প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)
এখানে (তাওয়াত্বনা) মসজিদে অবস্থান করার অর্থ হলো, মসজিদকে স্বদেশের মতো এমনভাবে ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া, যার প্রতি বান্দা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং এখানে অবস্থান করলে তিনি প্রশান্তি লাভ করেন।
আর ‘তাবাশবাশা’ শব্দটির অথ হলো অত্যন্ত হাসিমুখে ও পরম মমতায় কাউকে বরণ করে নেওয়া।
সন্তান বা প্রিয় কোনো আত্মীয় পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে আজ ঘরে ফিরছে। দরজায় পা রাখতেই মা-বাবা কি তাকে সোফায় বসিয়ে রেখে অন্য ঘরে চলে যান? কখনো না! তারা বরং পরম আদরে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন, সেরা আসনটি দেন, খুশিতে চোখের পানি ফেলেন।
সুবহানাল্লাহ! আপনি-আমি যখন অজু করে মসজিদের দিকে পা বাড়াই, তখন আসমানের মালিক আপনাকে-আমাকে ঠিক সেভাবেই স্বাগত জানান। তখন আমরা আল্লাহর ঘরের সাধারণ কোোন আগন্তুক থাকি না, বরং হয়ে যাই আরশের মালিকের রাজকীয় মেহমান।
যখন আপনি মসজিদের বারান্দায় পা রাখবেন, তখন এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলুন যে আমি আল্লাহর মেহমান হিসাবে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করছি। এরপর মসজিদের পরিবেশকে অন্তর দিয়ে অনুভব করুন। দেখবেন, মসজিদের ফ্যানের শীতল বাতাস বাড়ির ফ্যানের বাতাসের চেয়েও প্রশান্তিময় লাগছে। মনটাকে এমন হালকা ও প্রশান্ত অনুভব করবেন, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। যদি আপনি অনুভূতির শক্তি দিয়ে মসজিদকে এভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তবে একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরের মসজিদও আপনার কাছে রাজপ্রাসাদের চেয়ে বেশি মোহনীয় মনে হবে। এই অনুভূতির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। প্রখ্যাত তাবেঈ রবি ইবনে খুসাইম (১০-৬৫ হি.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গের চেয়ে মসজিদের চড়ুই পাখির ডাকের মাধ্যমে বেশি প্রশান্তি অনুভব করি।’(মাওসুআতুল আখলাক, ১/১৩৩)
প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (১৫-৯৪ হি.) বলেন, ‘৪০ বছর যাবৎ আমার জামাতের সালাত মিস হয়নি। আর ৩০ বছর যাবৎ মুয়াজ্জিন যখন আজান দিয়েছে, তখন আমি সালাতের জন্য মসজিদে উপস্থিত থেকেছি।’ (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/২২১)
সুতরাং আমরা যখন অন্তরের চোখ দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হব এবং অনুভব করতে পারব যে আমরা আল্লাহর ঘরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং আল্লাহ আমাদের আগমনে আনন্দিত হচ্ছেন, তখন দুনিয়ার কোনো কাজ আমাদের মসজিদের চৌকাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।