মিউজিয়াম অব ইসলামিক কালচারাল হেরিটেজ অ্যান্ড আল-কোরআন লার্নিং সেন্টার থাইল্যান্ডের একটি গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান। দেশটির নারা থিওয়াত শহরে অবস্থিত এই জাদুঘরে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বহু নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। তবে এই জাদুঘর ইসলামী ভ্রাতৃত্বের উত্তম নিদর্শনও বটে। কেননা এখানে কোরআনের এমন বহু প্রাচীন অনুলিপি আছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম ও রাজপরিবারের সদস্যরা ওয়াকফ ও দান হিসেবে দিয়েছে। এখানে ভারত, ইরান, ইয়েমেন, মিসর, নাইজেরিয়া, ব্রুনাই ও স্পেনের প্রাচীন নিদর্শন আছে। জাদুঘরটি ২০২৪ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
জাদুঘরের কর্মকর্তা নিক ইলহাম বলেন, জাদুঘরে বর্তমানে কোরআন ও হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির মোট ১৮৪টি সংগ্রহ আছে, যেগুলোর বয়স ১০০ বছর থেকে শুরু করে এক হাজার বছরেরও বেশি। এসব সংগ্রহের বিশেষত্ব শুধু তাদের প্রাচীনত্বে নয়, বরং অধিকাংশ পাণ্ডুলিপি আলেম ও রাজপরিবারের বংশধরদের ওয়াকফকৃত। এগুলো কিনে সংগ্রহ করা হয়নি।
মালয়েশিয়া থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শনগুলোর মধ্যে আছে প্রখ্যাত আলেম টুক কেনালি (রহ.)-এর একটি পাণ্ডুলিপি, যার বয়স আনুমানিক ১৬০ বছর। এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত কোরআনের একটি অনুলিপিও এখানে সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপি দুটি মালয়েশিয়ার কেলান্তান অঙ্গরাজ্যের কুবাং কেরিয়ানের একটি পণ্ডুক (ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো অতীত কাল থেকেই স্থানীয় আলেমদের কোরআনি জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার প্রমাণ।
জাদুঘরে প্রখ্যাত আলেম শায়খ দাউদ ফাতানি (রহ.)-এর হাতে লেখা একটি বই আছে, যার বয়স দুই শ বছরেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই পাণ্ডুলিপির বিশেষত্ব হলো, এর কিছু লেখায় সোনার অলংকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন রঙের কালি তৈরি করা হয়েছে ফুলের প্রাকৃতিক নির্যাস থেকে।
মালয় উপদ্বীপের নিদর্শনের পাশাপাশি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে মালয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন কোরআনের অনুলিপি, যা প্রায় চার শ বছর আগে শায়খ নুরুদ্দিন আর-রানিরি প্রস্তুত করেছিলেন। এ ছাড়া স্পেনের ঐতিহাসিক অঞ্চল আন্দালুসিয়া থেকে প্রাপ্ত একটি পাণ্ডুলিপিও রয়েছে, যার বয়স প্রায় আট শ বছর।
জাদুঘরে এমন কিছু ব্যতিক্রমধর্মী সংগ্রহও রয়েছে, যেগুলো গাছের বাকল ও পশুর চামড়ার ওপর প্রস্তুত করা হয়েছে। নিক ইলহাম বলেন, এসব মূল্যবান সংগ্রহের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে ইসলামী শিক্ষা উন্নয়ন এবং জ্ঞান সংরক্ষণের প্রচেষ্টা কখনোই জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যদিও জাদুঘরটি দক্ষিণ থাইল্যান্ডে অবস্থিত, তবু এর প্রতিটি প্রদর্শনীকক্ষে মালয় অঞ্চলের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চেতনা সমুন্নত রাখা হয়েছে। মালয় আলেম ও রাজপরিবারের উত্তরসূরিদের প্রদর্শিত ওয়াকফর এই চেতনা জাদুঘরটিকে শুধু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং অত্র অঞ্চলের ইসলামী ঐতিহ্যের ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই জাদুঘর এমন এক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা যুগের পর যুগ ধরে সযত্নে লালিত, সংরক্ষিত এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এটি শুধু অতীতের স্মারক নয়; বরং সমগ্র মালয় অঞ্চলের ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ওয়াকফভিত্তিক সভ্যতার ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
তথ্য সূত্র : স্ট্রেইট টাইমস ও মালয় মেইল