রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতিহাসের দ্রুততম রায়ের মধ্য দিয়ে দেখা গেল, সদিচ্ছা থাকলে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসেও বিচারকার্য সম্পন্ন করা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তৎপর হলে স্বল্প সময়ে আসামি গ্রেপ্তার অসম্ভব নয়। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যার কোনো বিকল্প নেই। এদিক থেকে রামিসা হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আমাদের সামনে অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এই মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।’
শিশু রামিসার ওপর নৃশংসতা আমাদের বাকরুদ্ধ করেছিল। মাত্র সাত বছরের ফুটফুটে মেয়ে। পাশের ফ্ল্যাটেই পাশবিক নির্মমতার শিকার হয়। সেই ঘটনা ১৯ মের। ঘটনার পরপরই প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে গোটা দেশ। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৎপর হন। ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন দিনের মধ্যে ডিএনএ ও ফরেনসিক রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে গত রবিবার দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। সব মিলিয়ে ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এই রায়কে বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন ইতিহাসের দ্রুততম রায়। অবুঝ রামিসার ওপর নৃশংস ঘটনা সমাজে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, মৃত্যুদণ্ডের রায় কিছুটা হলেও সেই ক্ষত প্রশমিত করেছে। জনমনে স্বস্তি এনেছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমার মনের যে প্রত্যাশা, যে আকাঙ্ক্ষা, এই রায়ে সেটা আমি পেয়েছি। ইনশাআল্লাহ, আমি শতভাগ আশাবাদী, রায় দ্রুত কার্যকর হবে।’
আমাদের বিচারপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে হতাশার দিক হলো দীর্ঘসূত্রতা, যাকে বলা যায় বিচারের নামে প্রহসন। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, রায়ে সাজা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বছরের বছর ঝুলে আছে। এমনকি অনেক আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রেও রায় অকার্যকর রয়ে গেছে। তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে দেশে ছয় হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তিন শতাধিক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের পরিবার এখনো বিচার পায়নি।
কালের কণ্ঠ গতকাল জানিয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী হাইকোর্টে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করবেন। আগামী সপ্তাহেই এই বেঞ্চে বিচারকাজ শুরু হবে, যা অত্যন্ত অপরিহার্য ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
আমরা মনে করি, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের সমাজে যে অনাস্থা রয়েছে, তা দূর করতে অবশ্যই রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় অবিলম্বে কার্যকরসহ সব শিশু নিপীড়কের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক—এটাই কাম্য।

