চিকিৎসকের ফি, রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ, ক্রমাগতভাবে দাম বাড়তে থাকা ওষুধ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কেনা—সব মিলিয়ে চিকিৎসার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে এক শ্রেণির চিকিৎসক, ওষুধ কম্পানি ও ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনৈতিক যোগসাজশের কারণে চিকিৎসাসংক্রান্ত খরচের পরিমাণ। ফলে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের একটি বড় অংশ জরুরি ক্ষেত্রেও চিকিৎসা নিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকারে চিকিৎসক ও ওষুধ কম্পানির অনৈতিক যোগসাজশ, তার প্রতিক্রিয়ায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং চূড়ান্তভাবে রোগীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির এক নির্মম চিত্রই উঠে এসেছে।
জানা যায়, ওষুধ কম্পানিগুলোর আগ্রাসি বিপণন কার্যক্রম ক্রমেই ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। চিকিৎসকরা যাতে নির্দিষ্ট কম্পানির ওষুধ বেশি করে লেখেন সে জন্য কমিশন ও দামি উপহারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আছে বিদেশে সেমিনার-কনফারেন্স বা নিছক ভ্রমণে পাঠানো, ফ্রিজ, টিভি, এসি থেকে শুরু করে গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, এমনকি বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার মতো অনৈতিক লেনদেন। এর ফলে ওষুধ উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে যায়। তখন ওষুধের দাম ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রয়োজন না থাকলেও চিকিৎসকরা সেসব ওষুধ বা ভিটামিন বেশি করে লিখে দেন।
বর্তমানে দেশে দুই শতাধিক কম্পানি দেড় হাজার রাসায়নিক ধরনের বা জিনেরিক নামের অধীনে প্রায় ৩১ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ বিপণন করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় তালিকাভুক্ত ১১৭টি জিনেরিক নামের ওষুধের দাম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নির্ধারণ করে। বাকি সব ওষুধের দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যূনতম যৌক্তিক অবস্থানে রাখার চেষ্টাও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ফলে ওষুধ কম্পানিগুলো ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করতে পারছে। আর এর অসহায় শিকার হচ্ছে রোগীরা।
ব্যক্তিগত চিকিৎসার ব্যয় কমানোর রাষ্ট্রীয় ঘোষণা সত্ত্বেও দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর নিজস্ব ব্যয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য মতে, ব্যক্তির চিকিৎসা খরচের ৬৪.৬ শতাংশই যায় ওষুধের পেছনে। এদিকে উচ্চ ব্যয়ের কারণে বহু মানুষ চিকিৎসাই নিতে পারছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের তথ্য মতে, দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গ্যাস্ট্রিক, রক্তচাপ, বাতজ্বর, হাঁপানি ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগলেও তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসাই নেয় না। অন্যতম কারণ, ওষুধের অতিরিক্ত দাম।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিদ্যমান অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ওষুধের দাম নির্ধারণে যৌক্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দেশের বেশির ভাগ দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।

