• ই-পেপার

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু জামায়াতের ঘাড়ে এখনো বোঝা হয়েই আছে

ফুটবলের রাজনীতি, রাজনীতির বিশ্বকাপ

অদিতি করিম
ফুটবলের রাজনীতি, রাজনীতির বিশ্বকাপ

বিশ্বের ফুটবলভক্তদের জন্য মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম দ্বিতীয় রাউন্ডের নকআউট পর্বের ম্যাচটি আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই এই ম্যাচ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রীড়ামোদীরা তো বটেই গোটা বিশ্বের রাজনীতিক, কূটনৈতিক এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে এই খেলাটি ‘মাস্ট ওয়াচ’ গেম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সবাই দেখতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত কে জেতে, ফুটবল না ক্ষমতা?

এই বিতর্কের শুরু, যুক্তরাষ্ট্র বনাম বসনিয়ার নকআউট পর্বের ম্যাচ ঘিরে। বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে গোল করেন বালোগান। তবে দ্বিতীয়ার্ধে তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে বুট দিয়ে আঘাত করার দায়ে ভিএআর পর্যালোচনার পর তাঁকে লাল কার্ড দেখানো হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় বলে কথা। এই লাল কার্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গুঞ্জন ছড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফাকে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেন। পরে ফিফা সভাপতি নিজেই জানান যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফোনকল পেয়েছিলেন তিনি।

পরে ট্রাম্প নিজেই বালুগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করার জন্য ফিফাকে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান। ফিফাকে লাল কার্ডের বিষয়টি নিয়ে আবারও ভাবতে বলেন তিনি।

ট্রাম্প ফিফা সভাপতিকে অনুরোধ করেছিলেন না ধমক দিয়েছিলেন তা আমরা জানি না, তবে এই টেলিফোন পেয়ে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বিতর্কিত কাজটি করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি ফিফার নিরপেক্ষতা, রেফারির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার নীতি বিসর্জন দিয়ে, এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেন। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর ফিফার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা তাদের বিবৃতিতে জানায়, শৃঙ্খলাবিধির ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এক বছরের অবেক্ষাধীন মেয়াদে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা স্থগিত রাখা হয়েছে। একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে স্থগিত নিষেধাজ্ঞা তখন কার্যকর হবে। তবে কী কারণে এই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা ফিফা দেয়নি।

বেলজিয়াম এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে। শুধু বেলজিয়াম নয়, এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেয় গোটা বিশ্ব। এবারের বিশ্বকাপে এটাই প্রথম এবং একমাত্র বিতর্ক নয়। শুরু থেকেই বিশ্বকাপ নিয়ে নানা সমালোচনায় জর্জরিত ফিফা। ফুটবল বোদ্ধাদের অভিযোগ, রাজনীতি এবারের বিশ্বকাপের আবহ মলিন করেছে। অনেকেই বলছেন, নজিরবিহীন পক্ষপাত এবং ফিফার মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিক মানসিকতা এবার ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, গত বছর। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের ড্র অনুষ্ঠানে ফুটবলের ‘একত্রীকরণ শক্তি’ তুলে ধরার কথা বলে ফিফা প্রথমবারের মতো ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই পুরস্কার সেখানে তুলে দেওয়া হয়। বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব-পুরস্কারটির কোনো পূর্বঘোষণা, নিয়ম, প্রক্রিয়া বা পরিষ্কার মানদণ্ড আগে কখনোই ছিল না। এমনকি ফিফা কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্যও দাবি করেন, তাঁরা এ পুরস্কার সৃষ্টির বিষয়টি অনুষ্ঠান শুরুর আগপর্যন্ত জানতেনই না। ঘটনার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকে পুরস্কারটিকে ‘রাজনৈতিক নাটক’, ‘শান্তির ধারণার প্রতি অপমান’ এবং ‘শ্বেত ধোলাইয়ের চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। অনেক মন্তব্যে বলা হয়, ট্রাম্পকে খুশি রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ফিফা ‘নিজের মতো করে একটি পুরস্কার বানিয়ে নিয়েছে।’ ফিফা আগেও দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। এবার একটি আগাম ঘোষণা ছাড়া ‘শান্তি পুরস্কার’ তৈরি করে ট্রাম্পকে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

অনেকেই বলছেন, ফিফার ‘রাজনীতি থেকে দূরে থাকার’ দাবি এখন শুধুই প্রচারমূলক সেøাগান।

বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা শুরুর আগেই দেখা যায়, কিছু দলের সঙ্গে চরম অন্যায় আচরণ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে সবার আগে ইরানের কথা বলতে হয়। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেও ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে ইরানকে। তবে মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরে চরম বৈষম্য, ভিসা জটিলতা আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার গল্প এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সিয়াটলে নিজেদের শেষ ম্যাচের পর ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তো কোনো রাখঢাকই রাখেননি। পরিষ্কার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইরান নকআউট পর্বে উঠুক। তিনি বলেছেন, ‘এখানে আমাদের সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। আমি জানি না অন্যরা একমত হবে কি না, কিন্তু আপনি যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন তাহলে আমি বলব-হ্যাঁ, এটাই হয়েছে আমাদের সঙ্গে।’ ইরান যেন নকআউট পর্বে না জেতে সেজন্য বিশ্বকাপে পাতানো খেলা হয়েছে বলেও আলোচনা আছে। ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করে, ইরানকে ঠেকাতে অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়ার ম্যাচটি পাতানো ছিল।

ইরান বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করেছে। সমালোচিত হয়েছে ফিফা। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আছে পক্ষপাতিত্বের অনেক অভিযোগ। বিশেষ খেলোয়াড়দের প্রতি রেফারিদের নমনীয় আচরণ দৃষ্টি এড়ায়নি ফুটবলভক্তদের। অবশ্য কমবেশি সব বিশ্বকাপেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড বিতর্ক এবারের বিশ্বকাপকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই ঘটনার পর অনেকেই ইতিহাস ঘেঁটে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা করেছেন। সেবার বিশ্বকাপের প্রথম আসর লাতিন আমেরিকায় হওয়ায় দ্বিতীয় আসর ইউরোপে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। আর স্বাগতিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ইতালি।

এটি শুধু ফুটবলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনির জন্য নিজের ফ্যাসিস্ট শক্তি বিশ্বকে দেখানোর এক সুবর্ণ মঞ্চ।

জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে রাতারাতি বিদেশি খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দেওয়ার চল শুরু করেছিলেন মুসোলিনি নিজেই। অভিযোগ ছিল, ইতালি নিয়ম ভেঙে লুইস মন্তি, এনরিকে গুয়াইতা ও আনফিলগিনো গুয়ারিসিকে খেলিয়েছে। তারা আগে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের হয়ে খেললেও ইতালির হয়ে খেলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেশটিতে বসবাস করেননি। অথচ ফিফা রহস্যজনকভাবে সবকিছু এড়িয়ে যায়।

১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচের রেফারি ছিলেন এক তরুণ সুইডিশ নাগরিক। টুর্নামেন্টের ঠিক আগের রাতে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে তিনি গোপনে নৈশভোজ করেছিলেন বলে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাগতিক ইতালিকে জেতাতেই সেই রেফারিকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। এমনকি প্রথমার্ধ শেষে ড্রেসিংরুমে ঢুকে মুসোলিনি নাকি খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, রেফারি ‘সহযোগিতা’ করলেও অতিরিক্ত ফাউল না করতে।

শেষ পর্যন্ত ২-১ জয়ে প্রথমবারের মতো জুলে রিমে ট্রফি (বর্তমানে বিশ্বকাপ) জেতে ইতালি। সেই সঙ্গে মুসোলিনির বিশেষ আদেশে বানানো বিশাল ‘কোপা দেল দুচে’ ট্রফিও তুলে দেওয়া হয় দলটির হাতে। ব্যাপারটা এমন যে বিশ্বজয়ের সঙ্গে ফ্যাসিবাদেরও জয় ঘোষণা করা হয়েছিল।

এবার যখন ট্রাম্পের এক টেলিফোনে ফিফা রেফারির সিদ্ধান্ত পাল্টে দিল, তখন অনেকেই ১৯৩৪ সালের কথা স্মরণ করছিলেন। এবার কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চ্যাম্পিয়ন হবে, অথবা তাদের চ্যাম্পিয়ন বানানো হবে? ফুটবলের উত্তেজনা ছাপিয়ে এসব আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু আশার কথা, শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। জয় হয়েছে ফুটবলের। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কাছে উড়ে গেছে ফিফার স্পেশাল টিম যুক্তরাষ্ট্র। প্রমাণ হয়েছে, এখন ফুটবল রাজনীতির চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

তবে এবারের বিশ্বকাপ ক্রীড়াঙ্গনে সংশয়ের কালো ছায়া ফেলেছে। অতি রাজনীতিকরণ কী পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটিকেও কুলষিত করবে? এই প্রশ্নটি এবার সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

ফুটবল এবং খেলাধুলা পৃথিবীর মানুষকে কেবল বিনোদন দেয় না, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। একসুতোয় গাঁথে। খেলাধুলা মানুষের মেলবন্ধন তৈরি করে। ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সৌহার্দের এক অসাধারণ বন্ধন তৈরি করে। ধনী-গরিব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ উপডে ফেলে ক্রীড়া। আমাদের একাত্ম করে। নেইমারের অশ্রুসিক্ত চোখ আমাদের কাঁদায়। মেসির সাফল্যে আমরা উচ্ছ্বসিত হই। রোনালদোর বিদায় আমাদের আবেগতাড়িত করে। ফুটবল বা যেকোনো পছন্দের খেলা আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, শুধু বেদনায় সিক্ত করে না, আমাদের ভালোবাসা শেখায়। খেলা আমাদের মানবিক, সংবেদনশীল করে। একজন খেলোয়াড় যখন আত্মমানবতার জন্য কাজ করে তখন আমরা অনুপ্রাণিত হই। খেলা তাই কেবল জয়ী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, মানবিক মূল্যবোধের বিশ্ব গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। অন্ধ উন্মাদনা যেন ক্রীড়াঙ্গনের সেই স্পিরিটকে নষ্ট না করে সেটা নিশ্চিত করা ফিফার মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধান কাজ। এবারের বিশ্বকাপে ফিফা সেই লক্ষ্য থেকে কিছুটা হলেও দূরে সরে গেছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবলের জয় হয়েছে। এটাই ফুটবলের শক্তি। এই বিশ্বকাপে কে বিজয়ী হবে সেটা পরের বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন খেলার আসল লক্ষ্য জয়ী হয়। ফুটবল এবং সব খেলাধুলা যেন বিশ্ব রাজনীতির হাতিয়ার না হয় সেটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]

জুলাই অভ্যুত্থান ও জানাজার রাজনীতি

সুমন পালিত
জুলাই অভ্যুত্থান ও জানাজার রাজনীতি

জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলা হয়, ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। জুলাই নামের সঙ্গে রয়েছে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত এক স্বৈরাচারের সম্পর্ক। জুলাই রোমান স্বৈরশাসক জুলিয়াস সিজারের জন্ম মাস। যিনি ছিলেন প্রতাপশালী শাসক। তার জন্ম কুইন্টিলিস মাসে। লাতিন ভাষায় যার অর্থ পঞ্চম মাস। রোমান সিনেট জুলিয়াস সিজারের জন্ম মাসকে অমরত্ব দানে কুইন্টিলিস মাসের নাম পাল্টিয়ে জুলাই করে। জুলিয়াস সিজার ছিলেন একজন অসামান্য রোমান জেনারেল ও রাজনীতিবিদ। তিনি রোম প্রজাতন্ত্রকে একনায়কতন্ত্রে রূপান্তর করেন। সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে একের পর এক দেশ অধীনে আনেন। জয় করেন সে সময়ের প্রভাবশালী ‘গল’ অঞ্চল। যেটি বর্তমানে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম নামে পরিচিত। জুলিয়াস সিজারের আগে প্রায় ৫০০ বছর রোম ছিল নগররাষ্ট্র। সিনেট বা পার্লামেন্টে শাসক নির্বাচন করা হতো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। সিজার নিজেও সিনেটের দ্বারা রোমের শাসক নির্বাচন হন। একের পর এক দেশ জয় করে রোম নগররাষ্ট্রকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করেন।

ঐতিহাসিকদের অভিমত, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে টাইবার নদীর তীরবর্তী রোমে নগররাষ্ট্র গড়ে ওঠে। সাতটি পাহাড়বেষ্টিত রোম নগররাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার মূলমন্ত্র ছিল প্রজাতন্ত্র। শুরুতে রোম রাষ্ট্রের পরিধি ছিল ইতালিতেই সীমাবদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব শত শত বছর আগে টাইবার নদীর তীরে গড়ে ওঠে রোমান সভ্যতা। ইতালিজুড়ে অনেক নগররাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। পরবর্তীতে তা কনফেডারেশনে রূপ নেয়। ইতিহাসে যা রোমান রিপাবলিক নামে পরিচিত। যে যুগে রোমে প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠে, সেটি ছিল রাজতন্ত্রের যুগ। প্রজাতন্ত্রের ধারণা ছিল দুনিয়াজুড়ে অনুপস্থিত। তারপরও রোমে প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ৫০০ বছর। শেষ পর্যন্ত রোম প্রজাতন্ত্র রাজতন্ত্রে রূপ নেয় জুলিয়াস সিজারের আমলে। যা টিকে ছিল পনের শ বছর ধরে। এই ২ হাজার বছরে মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রোমান সাম্রাজ্য। একবিংশ শতাব্দীতেও যার প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

রোম বা ইতালিতে যে রোমান রিপাবলিকের অভ্যুদয় ঘটে, এর ব্যপ্তি ভূমধ্যসাগরের ওপারে উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। মরক্কো ও আলজেরিয়ার উত্তর উপকূল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। একের পর এক যুদ্ধবিগ্রহ, অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে রোমান রিপাবলিক। সে প্রজাতন্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঘটে। পরাক্রমশালী স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হন জুলিয়াস সিজার। তিনি সমৃদ্ধ দেশ মিসর জয় করেন। মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় রোমান স্বৈরশাসকের জন্য প্রণয়ের ফাঁদ পাতেন। যে কাহিনিও অনেকের জানা।

সিজারের সময় রোমানরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে রোমানদের দাপট। জুলিয়াস সিজারের স্বৈরাচারী মনোভাবে রোমের সিনেট সদস্যদের অনেকেই তার প্রতি রুষ্ট হন। সিনেটের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জুলিয়াস সিজার। যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রুটাস। বলা হয়ে থাকে, গণতন্ত্র রক্ষায় ব্রুটাস বন্ধুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সিজারের মৃত্যুর পর তার পালকপুত্র অগাস্টাস সিজার রোমের শাসক হন। তিনি রিপাবলিকানদের পরাজিত করে রোম প্রজাতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটান। সে অর্থে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস সিজার। প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে রোমে যে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তা টিকে থাকে ১৫ বছর ধরে।

পঞ্চদশ শতকে ক্ষীয়মাণ রোমান তথা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য শুধু কনস্টান্টিনোপল নগরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৪৫৩ সালে তাদের ওপর আঘাত হানেন ওসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ বিন ফতেহ। ওসমানীয়রা কনস্টান্টিনোপলের নাম বদলে ইসলামবুল রাখে। উসমানীয় খেলাফতের পতন ঘটে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে। তুরস্ককে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ইসলামবুল নগরীর নতুন নামকরণ হয় ইস্তাম্বুল। একসময়ের কনস্টান্টিনোপল এখন দুনিয়াজুড়ে পরিচিত নতুন নামে। জুলিয়াস সিজার ও পরাক্রমশালী রোমানরা আজ নেই। তারা এখন ইতিহাসের অংশ। জুলিয়াস সিজার না থাকলেও রোমান ক্যালেন্ডারের পর গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারেও রয়ে গেছে রোমের স্বৈরশাসকে স্মৃতিজড়িত মাস জুলাই। যা এক স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসকের প্রতিনিধিত্ব করছে। জুলাই এক জঘন্য স্বৈরাচারের নাম বুকে ধারণ করলেও বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন পতনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মাসের নাম। জুলাই মাস ৩১ দিনের। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনবিরোধী যে আন্দোলন শুরু হয়, তার সমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের মাধ্যমে। জুলাই অভ্যুত্থানকারীরা তাদের আন্দোলনে বিজয়ের এই দিনটিকে চিহ্নিত করেন ৩৬ জুলাই হিসেবে।

॥দুই॥

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা দুনিয়ার দুই পরাশক্তির একটিতে পরিণত হয়। আরেক পরাশক্তি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর ৪৪ বছর পর ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। তারপর থেকে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকা নামের শ্যাম চাচার আধিপত্য। পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর গত ৭৫ বছরে শতাধিক দেশের সরকার পতনে ভূমিকা রেখেছে দেশটি। এজন্য তারা বেছে নিয়েছে কার্যকর বলে বিবেচিত এক কৌশল। সে কৌশলের প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা যুদ্ধবিগ্রহের পথে না হেঁটেও হাজার ভাগের এক ভাগ খরচ করে অর্জন করছে সাফল্য। ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা যে দেশের সরকারকে অবাধ্য ভাবেন, সে দেশের জনগণ আর বিভিন্ন সংগঠনকে দিয়েই কাক্সিক্ষত কাজটি করিয়ে নেন খুব সহজে। যেখানে সরকার পতনে মীরজাফর, উমি চাঁদ, রায় দুর্লভ, খন্দকার মোশতাকদের খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে তারা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতেও পিছপা হয় না। তাতে সাফল্য এলেও বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। আমেরিকার মানুষ এমন অপচয়কে ভালো চোখে দেখে না। আর তাই সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে কম খরচের পদ্ধতি অনুসরণ করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার খরচ হয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর ফলে ইরাক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ৪ লাখ ৩২ হাজার ইরাকি প্রাণ হারায় সে যুদ্ধে। প্রায় ৮ লাখ শিশু এতিম হয়ে যায় ভয়ংকর সেই সামরিক হস্তক্ষেপে। সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে আমেরিকা মুক্তি পেলেও একসময়ের সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ইরাক এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ। আফগানিস্তান যুদ্ধে আমেরিকার খরচের পরিমাণ ছিল ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকা দুনিয়ার যেকোনো দেশের অবাধ্য সরকার পতনে পদ্ধতি হিসেবে যুদ্ধের বদলে বেছে নেয় যে পদ্ধতি তার নাম ঘরশত্রু বিভীষণদের পক্ষে আনা। এ পদ্ধতি প্রথম সফলভাবে ব্যবহৃত হয় ইরানে ১৯৫৩ সালে। সে দেশের সেনাবাহিনী, আয়াতুল্লাহ এবং শাহেনশাহ রেজা শাহ পাহলভিকে ব্যবহার করে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে অপসারণ করা হয়। একই কলাকৌশলে ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় সরকার পতন ঘটায় গণতন্ত্রের অবতার আমেরিকা। ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতা সুকর্ণের স্বাধীনচেতা মনোভাবকে আমেরিকা পছন্দ করেনি। ১৯৭১ সালে বলিভিয়ায় সরকার পতনে তারা সামরিক বাহিনীর পেছনে অর্থ ঢালে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিলিতেও ঘটে পুতুল নাচের ইতিকথা। মহান কবি পাবলো নেরুদার দেশ চিলির জনপ্রিয় নেতা আলেন্দেকে হটিয়ে বসানো হয়েছিল ভয়ংকর স্বৈরশাসক খুনি জেনারেল অগাস্ত পিনোশেকে।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিল। কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন জনদাবিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু রটনা রয়েছে আন্দোলনের ফসল নিজেদের ঘরে আনতে আওয়ামী লীগের লুঙ্গির নিচে লুকানো গুপ্ত ও সুপ্তরা ভূমিকা পালন করেছে। আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনি প্রচারণায় এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। জনগণের কাছে গুপ্ত ও সুপ্তদের বিরুদ্ধে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বলা হয়, গুপ্ত ও সুপ্ত নামধারীদের পেছনে দুনিয়ার একমাত্র পরাশক্তির আশীর্বাদ ছিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এজন্য তাঁর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দোষারোপ করেছেন।

ইসলামি পরিভাষায়, কোনো মুসলমানের মৃত্যুর পর তার মাগফেরাত ও সম্মানের জন্য মৃতদেহ সামনে রেখে যে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়, তা ‘জানাজার নামাজ’।  জানাজা একটি বিশেষ প্রার্থনা, যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেওয়ার আগে অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এর সঙ্গে দৃশ্যত রাজনীতির দূরতম সম্পর্ক নেই। কিন্তু কখনো কখনো জানাজার নামাজ রাজনীতির জন্যও মূলধন হয়ে ওঠে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দেশের স্থিতিশীলতা ও সাংবিধানিক শাসন হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু শহীদ জিয়ার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ এবং তাঁর প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা সাময়িকভাবে হলেও ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দেয়। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতিষ্ঠিত ও বেগম খালেদা জিয়ার  নেতৃত্বে পুনর্জীবিত বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বেগম জিয়ার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ সব প্রশ্নকে উড়িয়ে দেয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কোন দল নির্বাচিত হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায় দেশনেত্রীর প্রতি লাখো মানুষের ভালোবাসায়।

জানাজা যে শোকের বদলে শক্তির প্রতীক হতে পারে তা প্রমাণিত হয়েছে ইরানের প্রয়াত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। ২ কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে সর্বোচ্চ নেতার জানাজায়। এতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১০০ দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি যা সতর্কবার্তা হিসেবে      বিবেচিত হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সি খামেনি নিহত হন। ওই দিনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে আগ্রাসন শুরু হয়, সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন তার প্রধান টার্গেট।। ইরান যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। গত শুক্রবার রাজধানী তেহরানে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে শোক ও দাফন অনুষ্ঠান। টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোকযাত্রা শেষে আগামী শুক্রবার তাঁকে দাফন করা হবে নিজের জন্মভূমি পবিত্র শহর মাশদাহে।

আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠান আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান বলে বিবেচিত হচ্ছে। যা ১৯৮৯ সালে ইরানের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শোকানুষ্ঠানকেও ছাড়িয়ে গেছে। খোমেনির শেষযাত্রায় প্রায় ১ কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। নিরাপত্তার কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি শোকানুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকছেন। সম্প্রতি মোজতবা খামেনিকে হত্যার হুমকি দেয় ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের এত সতর্কতা।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

ইমেইল : [email protected]

গ্রীষ্মকালীন মহড়া : সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তা

আহসান হাবিব বরুন
গ্রীষ্মকালীন মহড়া : সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তা
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে রাষ্ট্র তার সশস্ত্র বাহিনীকে দক্ষ, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং সর্বদা প্রস্তুত রাখতে সক্ষম হয়, সে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত যেকোনো সংকট মোকাবেলায় অধিক কার্যকর সক্ষমতা অর্জন করে। এই বাস্তবতায় কোনো সরকারপ্রধানের সামরিক প্রশিক্ষণ বা মহড়া সরাসরি পরিদর্শন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনকে অনেকেই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। মাঠ পর্যায়ে সেনা সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ, বাঙ্কারে নেমে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা, ছদ্মবেশে অবস্থানরত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের সঙ্গে খাবার ও চা ভাগ করে নেওয়া—এসব কর্মকাণ্ড একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীর পেশাদার প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য দেশের জন্য গৌরবের বিষয়। সেই অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীকে শুধু একটি যুদ্ধক্ষম বাহিনী নয়, বরং বহুমাত্রিক জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা আরো জটিল।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক—প্রতিটি অঞ্চলেই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা এবং হাইব্রিড যুদ্ধের ধারণা আজ প্রতিটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ আর শুধু অস্ত্র পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তথ্যযুদ্ধ, সমন্বিত অভিযান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়।

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি দক্ষ ও পেশাদার সেনাবাহিনী অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—‘জনগণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে।’ বাস্তবে এই আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর পেশাদারি, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার, শৃঙ্খলা এবং জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একদিনে গড়ে ওঠে না; দীর্ঘদিনের কর্মদক্ষতা, আত্মত্যাগ এবং সুশৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়।

গ্রীষ্মকালীন মহড়ার মতো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাস্তবধর্মী মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সদস্যরা প্রতিকূল আবহাওয়া, সীমিত সম্পদ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। আন্তর্জাতিক মানের সামরিক বাহিনীগুলো নিয়মিত এ ধরনের অনুশীলনের মাধ্যমেই নিজেদের সক্ষমতা উন্নত করে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই সমর্থনের সঙ্গে একটি মৌলিক নীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সেনাবাহিনীর পেশাদার ও অরাজনৈতিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বেসামরিক নেতৃত্বের অধীনে একটি দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সামরিক বাহিনীই দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক কার্যকর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং যৌথ বাহিনীগত সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। কেবল নতুন অস্ত্র সংগ্রহ নয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং নেতৃত্ব বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শক্তিশালী সেনাবাহিনী মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; বরং যুদ্ধ প্রতিরোধের সক্ষমতা। একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক বাহিনী সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে শক্তিশালী প্রতিরোধের বার্তা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতেও ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামো নির্মাণ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি কেবল প্রতিরক্ষা খাতের বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি অঙ্গীকারও সমানভাবে অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে যেমন আধুনিক সেনাবাহিনী দরকার, তেমনি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও দরকার। এই দুইয়ের ভারসাম্যই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করে।

পরিশেষে বলা যায়, গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা যদি ধারাবাহিকভাবে পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগকে এমনভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকা, পেশাদারি এবং জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হয়। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অর্থনীতি বা কূটনীতিতে নয়; তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতেও নিহিত। আর সেই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি আধুনিক, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনগণের আস্থাভাজন সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নিয়মিতভাবে সেই সক্ষমতা উন্নয়নে আন্তরিক মনোযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে বাহিনীর পেশাদার স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক দায়িত্বকে সম্মান করে, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল : [email protected]

রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

অনলাইন ডেস্ক
রাষ্ট্রের বিনিয়োগ যথাযথ হচ্ছে কী?

সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এসেছে, কেন বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসন ক্যাডার প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন? চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আর্থিক বিনিয়োগের পরও তাদের একটি বড় অংশ নিজ নিজ পেশায় না গিয়ে প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন।

বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের নয়, এটি মানবসম্পদ পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রীও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করছে, তাদের বড় অংশ যদি অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। উন্নত ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাসুবিধা, দক্ষ শিক্ষক এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হয়। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গবেষণায় অবদান রাখবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার আকর্ষণ এবং কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসনে চলে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল খাতে অনেক সময় জনবল সংকট, কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার স্বল্প সুযোগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জও তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে এটি একটি যৌক্তিক ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সামষ্টিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য এটি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্টিমাল ব্যবহারের প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বিগত কয়েক বছরের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে (যেমন  ৪০তম থেকে ৪৩তম বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট কর্মকর্তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩০-৩২%) ছিলেন চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। যেমন ৪৩তম বিসিএসে শুধু প্রশাসন ক্যাডারে ১৮৩ জন প্রকৌশলী এবং ২৫ জন চিকিৎসক সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

এর আগের ৪০তম বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র, এই তিন সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট ৩৪২ জনের মধ্যে ১০২ জনই ছিলেন চিকিৎসক ও প্রকৌশলী। তবে বিষয়টিকে একপক্ষীয়ভাবে দেখা উচিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী প্রশাসনে গিয়েও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

স্বাস্থ্যনীতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো ক্ষেত্রে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরো কার্যকর করতে পারে। তাই তাদের প্রশাসনে প্রবেশকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো—সংখ্যাটি কতটা হওয়া উচিত। যদি অধিকাংশ মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিজ নিজ পেশা ছেড়ে প্রশাসনে চলে যান, তাহলে হাসপাতাল, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দক্ষ জনবলসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে; চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়, গবেষণার গতি কমে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয় না।

উদ্বেগের বিষয় যে, এই প্রতিযোগিতায় সফল হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাইব্রেরিতে একটি আসন দখল করাকে কেন্দ্র করেও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে বিসিএস ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইডবই, নোট কিংবা প্রশ্নব্যাংক পড়ায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিগুলোতে নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক অসংখ্য মূল্যবান বই, গবেষণা জার্নাল ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা রয়েছে, যা গভীর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য।

এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে চাকরিমুখী প্রস্তুতির কাছে আড়াল হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণা সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রশাসন ক্যাডারের সুযোগসুবিধা দেশের অধিকাংশ সরকারি পেশার তুলনায় বেশি। সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চালক, সুসজ্জিত অফিস, সহায়ক কর্মচারী, দেশবিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা, এসব কারণে প্রশাসন ক্যাডার চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফলে অনেক মেধাবী চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাও প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রশাসন ক্যাডার নির্বাচন করেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ জরুরি। প্রথমত চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের নিজ নিজ পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য বেতন, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, আধুনিক কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। দ্বিতীয়ত সরকারি অর্থায়নে উচ্চব্যয়ের পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ পরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত, যাতে দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি ও ধরে রাখা যায়।

তৃতীয়ত প্রশাসনে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে স্বাস্থ্য প্রশাসন, প্রকৌশল প্রশাসন বা প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণী পদ আরো সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যেখানে তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা সরাসরি কাজে লাগবে। পাশাপাশি দক্ষতা, মেধা ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল তখনই নিশ্চিত হবে, যখন একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেবেন, একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এবং যারা প্রশাসনে যাবেন, তারা তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে নীতিনির্ধারণকে আরো কার্যকর করবেন। তাই এটি কোনো ব্যক্তি বা পেশার সমালোচনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ পরিকল্পনা, শিক্ষায় বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়