• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৮ ‍জুলাই ২০২৬

কোরআন অনুধাবনে যে সাতটি বিষয় প্রতিবন্ধক

আলেমা হাবিবা আক্তার
কোরআন অনুধাবনে যে সাতটি বিষয় প্রতিবন্ধক
সংগৃহীত ছবি

মুমিনের জন্য কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করা আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে সেসব মানুষের নিন্দা করা হয়েছে, যারা কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে অভিনিবেশসহকারে চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)

কিন্তু কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলেই সবাই কোরআন অনুধাবন করতে পারে? না, পারে না। কেননা মানুষের কোরআন অনুধাবনে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। নিম্নে এমন সাতটি প্রতিবন্ধক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

কোরআন অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতাসমূহ 
কোরআনের অর্থ বোঝা ও মর্ম অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সাতটি বিশেষ প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হলো—
১. অবিরাম পাপ করা : কোরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবিরাম পাপ করে যাওয়া। কেননা কোরআন হলো জ্যোতি আর পাপ হলো অন্ধকার। তাই পাপে আচ্ছন্ন হৃদয় কোরআন অনুধাবন করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে পাপীদের অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল; সুতরাং তুমি তোমার কাজ করো এবং আমরা আমাদের কাজ করি।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৫)

আল্লামা জারকাশি (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই কোরআনের সেই পাঠক ওহির প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করতে পারে না এবং কোরআনের ভেদ-রহস্য উন্মোচন করতে পারে না যার অন্তরে দুনিয়ার মোহ ও অহংকার আছে, যে বিদআত করে, যে প্রবৃত্তির অনুসারী, যে অবিরাম পাপ করে, যে ঈমানের দাবিতে মিথ্যাবাদী বা দুর্বল।’ (আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮০)

২. অমনোযোগ ও উদাসীনতা : কোরআন আদর, যত্ন ও মনোযোগের দাবিদার। তার প্রতি অমনোযোগীদের অন্তরে কোরআন প্রবেশ করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই কোরআন সংরক্ষণে তোমরা যত্নবান হও। কেননা যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ! নিশ্চয়ই তা রশি ছিঁড়ে পলায়নরত উটের তুলনায় অধিক পলায়নপর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৩৩)

৩. আরবি ভাষা না জানা : আল্লাহ আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কোরআন জগত্গুলোর প্রতিপালক থেকে অবতীর্ণ। জিবরাইল তা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পারো। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১৯২-১৯৫)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘এটা আমিই অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হলো আরবি ভাষাগুলোর ভেতর সবচেয়ে অলংকারপূর্ণ, সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে বিস্তৃত এবং অন্তরের অভিব্যক্তি প্রকাশে সবচেয়ে সক্ষম ভাষা। অর্থাৎ সবচেয়ে সম্মানিত ভাষায় সবচেয়ে সম্মানিত কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৪৬৭)

সুতরাং যে পাঠক আরবি ভাষা সম্পর্কে জানে না এবং তাদের বাচনভঙ্গি সম্পর্কে অবগত নয়, সে কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে পারবে না এবং আল্লাহর কথার মর্মও বুঝতে পারবে না। ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির আরবি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান নেই সে কোরআনের ব্যাখ্যা করলে অবশ্যই ব্যর্থ হবে।’ (শুআবুল ঈমান : ২/৪২৫)

৪. পূর্বসূরিদের কিতাব থেকে বিমুখতা : রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় ইলমে ওহির চর্চা হয়ে আসছে। ইসলামী জ্ঞানচর্চায় এই পরম্পরা রক্ষা করা জরুরি। সুতরাং কোরআনের মর্ম অনুধাবনে পূর্বসূরিদের কিতাব পাঠ ও মতামত অবগত হওয়া অপরিহার্য। পূর্বসূরিদের কিতাব ও ব্যাখ্যা থেকে বিমুখতা কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ। ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘আমি আশ্চর্য হই সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে কোরআন পাঠ করে, অথচ তার ব্যাখ্যা জানে না। সে কিভাবে কোরআন তিলাওয়াতের স্বাদ পাবে।’ (মুজামুল উদাবা : ৫/২৫৬)

৫. কোরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানা : কোরআনের ভাষা ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে শানে নুজুল বা নাজিলের প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। ইমাম শাতেবি (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আরবদের উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে সংবোধনকারী ও সংবোধিত ব্যক্তির অবস্থা জানার ওপর নির্ভরশীল। কেননা একই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে যায় দুটি প্রেক্ষাপট ও সংবোধিত ব্যক্তির বিবেচনায়। যদি এগুলো জনা না যায়, তবে সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতগুলো নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানলে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়।’ (আল মুওয়াফিকাত : ৪/১৪৬)

৬. কোরআনের আংশিক পাঠ : কোরআন যথাযথভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আল-কোরআনের সামগ্রিক পাঠ জরুরি। আংশিক পাঠ কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে যেমন প্রতিবন্ধক, তেমনি তা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আল্লামা ইবনে হাজম (রহ.) বলেন, ‘খারেজিদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো কোরআনের একাংশ আঁকড়ে ধরা এবং অন্য অংশ ছেড়ে দেওয়া। আর তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক কোরআনের ব্যাখ্যাও ত্যাগ করেছে, অথচ এই দায়িত্ব আল্লাহই তাদের দিয়েছিলেন। যদি তারা সমগ্র কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিপূর্ণ বক্তব্য আঁকড়ে ধরত, একই হুকুমের অধীন মনে করত, পুরোপুরি আমল করত, তবে তারা অবশ্যই হেদায়েত পেত।’ (আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম : ৩/৪০)

৭. আল্লাহভীতি ও বিনয়হীন পাঠ : যারা অন্তরে আল্লাহভীতি ও বিনয় নিয়ে কোরআন পাঠ করে না, আল্লাহ তাদেরকে কোরআনের হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘কোরআন তিলাওয়াতকারীর উচিত হলো আল্লাহভীতি, বিনয় ও চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে তা পাঠ করা। আর এটা আল্লাহর প্রত্যাশিত ও উদ্দিষ্টও বটে। এর মাধ্যমে হৃদয় প্রশস্ত হয়, অন্তর আলোকিত হয়। এর স্পবক্ষে এত বেশি ও বিখ্যাত বিখ্যাত প্রমাণ রয়েছে যে তা বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না।’ (আল আজকার : ১/৮৭)

আল্লাহ সবাইকে কোরআন অনুধাবন করার তাওফিক দিন। আমিন।

কারো বদনজর লাগছে কিভাবে বুঝবেন? করণীয় কী?

অনলাইন ডেস্ক
কারো বদনজর লাগছে কিভাবে বুঝবেন? করণীয় কী?
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন মুমিনের জন্য পরীক্ষার হলের মতো। চিরসত্য মৃত্যুর মধ্যদিয়ে প্রত্যেককেই অনন্তকালের জীবনে প্রবেশ করতে হবে। তবে পরকালে সফল হতে অবশ্যই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তবেই আখিরাতে মিলবে কাঙ্ক্ষিত জান্নাত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, ‘জমিনের ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোর শোভাবর্ধন করেছি, যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করতে পারি যে, আমলের ক্ষেত্রে কারা উত্তম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ৭)

এ জন্য অনেক সময় দুনিয়াতে নানা ধরনের বিপদ-আপদের মাধ্যমেও মহান রাব্বুল আলামিন বান্দার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। কখনো এটি হতে পারে শারীরিক কোনো রোগ-ব্যাধি দিয়ে, আবার কখনো জীবন বা সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে বদনজর লাগাও আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য একটি পরীক্ষা। কারণ, বদনজর যেমন সত্য, তেমনি এর খারাপ প্রভাবও রয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর লাগা সত্য (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৯)। এ ছাড়া আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন- তোমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা বদনজর সত্য বা বাস্তব ব্যাপার। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৩৫০৮)

এমনকি পবিত্র কোরআনেও বদনজরের বিষয়টি এসেছে, ইরশাদ হয়েছে- ‘কাফিররা যখন কোরআন শুনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়ে ফেলবে। আর তারা বলে, সে তো অবশ্যই পাগল।’ (সুরা কলম, আয়াত : ৫১)।

মূলত বদনজর হলো কারো হিংসাত্মক দৃষ্টির কুফল। এ ক্ষেত্রে কারো হিংসাত্মক দৃষ্টির ফলে কোনো ব্যক্তির বা বিষয়ের ভালো অবস্থা থেকে ব্যত্যয় ঘটলে এমনটা বদনজরের কারণে হয়ে থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভালোমতো খাওয়া-দাওয়া করা কোনো শিশুকে কেউ যদি হিংসাত্মক দৃষ্টিতে দেখে, সে ক্ষেত্রে প্রায়ই ওই শিশুর খাবার খেতে অনীহার মতো বিষয় দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে কারো মধ্যে বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেলে তার ওপর কারো বদনজর লেগেছে কি না, সেটি বোঝা যায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো চেহারায় কালিমা পড়া (চেহারার স্বাভাবিক নূর বা উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাওয়া)। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) তার ঘরে এমন একটি মেয়েকে দেখলেন যে, তার চেহারায় কালিমা রয়েছে। তখন নবীজি (সা.) বললেন তাকে ঝাড়-ফুঁক করাও, কেননা তার ওপর (বদ) নজর লেগেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৫৩৭; সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩২৮)

এ ছাড়া বিনা কারণেই শরীর অতিরিক্ত দুর্বল ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়াও বজনজরের কারণে হতে পারে। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযম পরিবারকে সাপের ছোবলে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করার অনুমতি দেন এবং আসমা বিনতু উমায়স (রা.) কে বললেন, আমার ভাই জাফার (রা.) এর ছেলে-মেয়েদের কী হলো যে, তাদের শরীর আমি দুর্বল দেখতে পাচ্ছি? তাদের কি অভাব দেখা দিয়েছে? জবাবে আসমা (রা.) বললেন, না। কিন্তু তাদের ওপর তাড়াতাড়ি কুনজর লেগে যায়। এরপর নবীজি (সা.) বললেন, তুমি তাদের ঝাড়-ফুঁক করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৬১৯)

তবে বদনজর লাগা নিয়ে প্রচলিত একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, বদনজর লাগলে সোনা বা রূপা ধৌত করা পানি খেলে বা সেই পানি দিয়ে গোসল করলে বদনজর কেটে যায়। আবার কেউ কেউ বদনজর কাটাতে পশুর হাড় ঝুলিয়ে রাখেন। তবে শরিয়তে এমন সবকিছুর ভিত্তি নেই।

ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, কারও বদনজর লেগেছে এমনটা নিশ্চিত হলে দুইভাবে মূলত বদনজর কাটানো যায়। এর মধ্যে একটি হলো যার বদনজর লেগেছে কোনোভাবে তার শরীর নিসৃত পানি (হাত ধোয়, গোসল করা পানি ইত্যাদি) সংগ্রহ করে যার ওপর বদনজর লেগেছে তার ওপর প্রয়োগ করা। অর্থাৎ, সেই পানি দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়া বা গোসল করা। এছাড়া অন্যটি হলো- বিশেষ কোনো দোয়া বা কোরআনের আয়াত পাঠ করা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটি করা যেতে পারে সেটি হলো- সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা। এ ক্ষেত্রে কোনো পানিতে এই দুই সুরা পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই পানি দিয়ে যার ওপর বদনজর লেগেছে তার শরীর ধুয়ে নেয়া যেতে পারে।

এর বাইরেও বদনজর কাটাতে বিভিন্ন দোয়া পড়া যেতে পারে। সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এমন একটি দোয়ার কথা এসেছে। যার মাধ্যমে জিবরিল (আ.) নবীজিকে (সা.) ঝাড়ফুঁক করেছিলেন। সহিহ মুসলিমে আসা হাদিসটি হলো- একবার জিবরিল (আ.) রাসুল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ইয়া মুহাম্মদ! (সা.) আপনি কি অসুস্থতা বোধ করছেন? জবাবে নবীজি বললেন, হ্যাঁ। পরে জিবরিল (আ.) বললেন-

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

বাংলা : বিসমিল্লাহি আরক্বিকা মিন কুল্লি শাইয়্যিন ইয়্যুজিকা মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসাদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।

অর্থ : আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি- সেসব জিনিস থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, সব প্রাণের অনিষ্ট কিংবা হিংসুকের বদনজর থেকে আল্লাহ আপনাকে শিফা দিন, আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৫১২)

এছাড়া কারও বদনজর লাগলে যে ঝাড়-ফুক করা যায় হাদিসে সে বিষয়টিও এসেছে। উবাইদ ইবনু রিফাআ আয-যুরাকী (রাহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার আসমা বিনতু উমাইস (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), জাফরের সন্তানদের তাড়াতাড়ি বদনজর লেগে যায়। আমি কি তাদের ঝাড়-ফুঁক করতে পারি? জবাবে নবীজি (সা.) বলেন, হ্যাঁ। কেননা, কোনো জিনিস যদি ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারত তাহলে বদনজরই তা অতিক্রম করতে পারত। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ২০৫৯)

জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ

মুফতি ওমর বিন নাছির
জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন পৃথিবী জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। আরব উপদ্বীপের সেই সময়টিই ইতিহাসে 'জাহেলিয়াতের যুগ' নামে পরিচিত। 'জাহেলিয়াত' শব্দের অর্থ শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুতি, নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধের পতন। সে যুগে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মানদণ্ড, নারীরা ছিল অবহেলিত, দুর্বলরা ছিল নির্যাতিত এবং সমাজজুড়ে ছিল শিরক, মূর্তিপূজা, মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার ও গোত্রবাদ। তবে জাহেলি যুগের সেই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সমাজের অনেক সংকটেরও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।

১. হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি ও শিরকে অবাধ বিস্তার
জাহেলি সমাজের সর্ববৃহৎ অবক্ষয়ের কারণ ছিল আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হওয়া। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করলেও ইবাদতে বহু দেব-দেবীকে শরিক করত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই শিরক এক মহা জুলুম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)
শিরক মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং সব ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে।

২. অজ্ঞতা ও ওহির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া
জাহেলি সমাজে মানুষের জীবন পরিচালিত হতো কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ ও মনগড়া বিশ্বাসের মাধ্যমে। আল্লাহর কিতাব ও নবীদের শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তারা হারিয়ে ফেলেছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৬)

৩. অহংকার ও গোত্রবাদ
বংশ, গোত্র ও জাতিগত অহংকার ছিল জাহেলি সমাজের অন্যতম বড় ব্যাধি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি... নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

৪. নারীর প্রতি অবিচার
জাহেলি যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাদেরকে সম্পদের মতো বিবেচনা করা হতো এবং কন্যাসন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে— কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮–৯)

৫. মদ, জুয়া ও অশ্লীলতার প্রসার
মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা ছিল জাহেলি সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি। এসব অপরাধ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৯০)

৬. সুদ ও অর্থনৈতিক শোষণ
ধনীরা সুদের মাধ্যমে গরিবদের শোষণ করত। ফলে সমাজে বৈষম্য ও অন্যায় বেড়ে যেত। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

৭. ন্যায়বিচারের অভাব
ক্ষমতাবানরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। বিচার হতো প্রভাব ও শক্তির ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত।’ (বুখারি)

৮. নৈতিকতা ও আখিরাতের জবাবদিহিতার অভাব
আখিরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস দুর্বল হওয়ায় মানুষ পাপকে ভয় করত না। ফলে অন্যায়, প্রতারণা ও অপরাধ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭–৮)

হাদিসের বাণী

দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাতের এক-তৃতীয়াংশ হলে মহানবী (সা.) উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানুষসকল, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। কম্পনকারী এবং তার সহযোগী (কিয়ামতের আগে শিঙ্গার ফুঁৎকার) চলে এসেছে এবং মৃত্যুও তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। 
(এ ঘোষনা শুনে একবার) আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনার ওপর দরুদ পাঠ করি। তাই আমি আপনার ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করার জন্য কোন সময় নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তোমার সময় অনুযায়ী করতে পারো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক সময়ে? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে পারলে যদি বেশি করো, তাহলে তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় করব? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমি আমার সম্পূর্ণ সময় দরুদের জন্য নির্দিষ্ট করব? এবার মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে এই দরুদ তোমার চিন্তা দূর করে দেবে এবং তোমার সব গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১২৪১)

শিক্ষা ও বিধান
1. রাতের শেষাংশ ইবাদতের সর্বোত্তম সময়। মহানবী (সা.) রাতের এক-তৃতীয়াংশে জেগে আল্লাহর জিকির করতেন এবং উম্মতকে ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
2. মৃত্যু ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করা ঈমানকে শক্তিশালী করে। তাই মানুষের উচিত সব সময় মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া এবং আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলা।
3. আল্লাহর জিকির মুমিনের সর্বোত্তম আমল। বিপদ-আপদ, গাফেলতি ও পাপ থেকে বাঁচতে নিয়মিত জিকির করা জরুরি।
4. মহানবী (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত।
5. দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী যত ইচ্ছা সম্ভব দরুদ পড়তে পারে।
6. দরুদ দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা দরুদের বরকতে বান্দার দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন।
৭. দরুদ গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যমও বটে। তাই আন্তরিকভাবে দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার পাপ ক্ষমা করে দেন।