• ই-পেপার

সাহসী হোন—আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বার্ধক্য বরণ করুন

জাতীয় প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক বাজেটের বাস্তবতা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
জাতীয় প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক বাজেটের বাস্তবতা
প্রতীকী ছবি

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা বাজেটের গুরুত্ব দিনে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ নিরাপত্তা এখন আর কেবল প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি প্রযুক্তি, তথ্য, সাইবার সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আজ আর কেবল একটি স্থির ধারণা নয়; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রভাবাধীন একটি গতিশীল বাস্তবতা। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং সামুদ্রিক শক্তির পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন।

ভারত, মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামুদ্রিক রুটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই কৌশলগত অবস্থান যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ায়। বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয়। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রাখাইনের অস্থিরতা এবং রোহিঙ্গা সংকট অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সীমান্ত সংযোগ ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের অন্যতম কেন্দ্র। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, ভারতের ‘সাগর’ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরো বাড়িয়েছে। ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি অনুসন্ধান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। সার্বিকভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই বৃদ্ধি কতটা কার্যকরভাবে সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে, সেটিই আজ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ২০১৬–১৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুযায়ী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত এক দশকে প্রতিরক্ষা বাজেটের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সংযত।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত এক দশকে বাজেট পরিমাণগতভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার এবং গুণগত রূপান্তর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সামরিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও পরিচালন ব্যয় একটি বড় অংশ দখল করে। তবে পার্থক্য হলো উন্নত দেশগুলো একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে উচ্চ অনুপাত বজায় রাখতে সক্ষম হয়, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।

বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে গত দুই দশকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও ফ্রিগেট সংযোজন, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধবিমান উন্নয়ন, এবং স্থলবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। তবে এই অগ্রগতিকে যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তাহলে দেখা যায় একই সময়ে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও বহুমুখী আধুনিকায়ন কৌশল অনুসরণ করেছে, বিশেষ করে সমুদ্র নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতা ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা যথেষ্ট।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করেছে। সেখানে দেখা গেছে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রচলিত ভারী সামরিক শক্তির সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই ধরনের বাস্তবতা ইসরায়েল-হামাস সংঘাত এবং আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যেখানে ড্রোন ও তথ্যযুদ্ধ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই তুলনায় ন্যাটো দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখন 'ডিজিটাল ডিফেন্স', এআই-ভিত্তিক সিস্টেম এবং স্পেস টেকনোলজিতে ব্যয় করছে, যা বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কাঠামোগত ভারসাম্য। ভারতের উদাহরণ এখানে উল্লেখযোগ্য—যেখানে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ নতুন অস্ত্র ক্রয়, গবেষণা এবং দেশীয় উৎপাদন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। একইভাবে তুরস্ক গত এক দশকে 'Bayraktar' ড্রোনসহ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েলও উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলে আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। দক্ষিণ চীন সাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ভারতের SAGAR নীতি একত্রে এই অঞ্চলকে একটি প্রতিযোগিতামূলক কৌশলগত মঞ্চে পরিণত করেছে। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট দেখিয়েছে যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য হারালে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো 'balanced engagement strategy' অনুসরণ করতে হয়, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয় না।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু সরঞ্জাম ক্রয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও শিল্পভিত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তুরস্কের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ধারাবাহিক ১০–২০ বছরের ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ছাড়া টেকসই আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করতে হলে কেবল বাজেট বৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কৌশলগত নীতি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটি এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি একত্রে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন আর কেবল সামরিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা বাজেটকে শুধুমাত্র একটি বার্ষিক ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যেভাবে বাজেট প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা পরিমাণগত অগ্রগতি নির্দেশ করলেও এর কাঠামোগত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ বাজেটের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। এসব ব্যয় অপরিহার্য হলেও এগুলোর ওপর অতিনির্ভরতা থাকলে আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নতুন সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে অংশটি প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে বাজেট বৃদ্ধি পেলেও তার প্রভাব সরাসরি যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমানুপাতিকভাবে প্রতিফলিত হয় না।

আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রচলিত অস্ত্রশক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর ফলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রযুক্তিগত ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা শুধুমাত্র প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটের পাশাপাশি এর গুণগত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজেট কতটা বৃদ্ধি পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থের বিনিময়ে কী ধরনের কৌশলগত সক্ষমতা অর্জিত হলো। নতুন প্রযুক্তি কতটা যুক্ত হলো, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা কতটা তৈরি হলো, এবং আধুনিক যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তুতি কতটা গড়ে উঠল—এই প্রশ্নগুলোই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হওয়া উচিত। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ধীরে ধীরে বিকাশ। বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামোতে রূপান্তর করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে যেসব দেশ ধাপে ধাপে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের শিল্পভিত্তি তৈরি করেছে, তারা কেবল ব্যয় নিয়ন্ত্রণেই সফল হয়নি বরং কৌশলগত স্বাধীনতাও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ধীরে অগ্রসরমান শিল্পায়ন কৌশল ভবিষ্যৎ নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা কৌশলে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য থাকবে এবং কোনো একক নির্ভরতা তৈরি হবে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি কেবল বাজেট বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত কৌশলগত কাঠামো, যেখানে বাজেট, প্রযুক্তি, শিল্প উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের উপযোগী করে তোলা কঠিন হবে। তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই নীতি, পরিকল্পনা এবং সক্ষমতার মধ্যে একটি গভীর কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করবে। বাজেট বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং বাস্তব কৌশলগত সক্ষমতায় রূপান্তরিত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

সম্পর্কের উত্থান-পতনেও বাংলাদেশের শক্ত উন্নয়ন অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
সম্পর্কের উত্থান-পতনেও বাংলাদেশের শক্ত উন্নয়ন অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পরবর্তী বছরগুলোতে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী ও মানবিক সহায়তাদাতা দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশকে সর্বাধিক উন্নয়ন সহায়তা (বিদেশি অনুদান ও ঋণ) প্রদানকারী দেশগুলোর তালিকা, পরিসংখ্যান ও সময়সীমার ওপর কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বিবেচনা করলে বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে রেখেছে। আর প্রথম ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে, যথাক্রমে জাপান ও যুক্তরাজ্য। এখানে উল্লেখ্য, যদি দেশ নয়, বরং সব ধরনের দাতা সংস্থা (যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে তালিকা ভিন্ন হবে এবং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক শীর্ষ সহায়তাদাতাদের মধ্যে অন্যতম থাকবে। তবে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো এই যে এ দুটি ব্যাংকের সর্বাধিক তহবিলের জোগানদার আবারও সেই যুক্তরাষ্ট্র।

গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতা প্রদান করেছে। পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখা যায়, ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন সরকার ১০ বিলিয়ন ডলারের অধিক সাহায্য বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন এবং সামাজিক খাতে প্রদান করেছে। এর মধ্যে ইউএসএইড একাই বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে খরচ করেছে ৮ বিলিয়ন ডলার আর ২ বিলিয়নের অধিক ডলার প্রদান করা হয়েছে অন্যান্য সহযোগিতা খাতে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খাদ্য সহায়তা, ত্রাণ, শরণার্থী পুনর্বাসন এবং বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগে জরুরি সহায়তা। মার্কিন সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই সহায়তা গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উপযোগী অবদান রেখেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দখলদার বাহিনী গণহত্যা, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসন ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের প্রতি সহায়তা বজায় রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কূটনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং কংগ্রেসমেন বাঙালি শরণার্থীদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ কারণে তৎকালীন মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রায় নব্বই থেকে একশত মিলয়ন ডলার মানবিক ত্রাণ সহায়তা ১৯৭১ সালে ভারতে অবস্থিত বাঙালি শরণার্থীদের জন্য প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল খাদ্যশস্য ও খাদ্য সহায়তা, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, তাঁবু ও আশ্রয়সামগ্রী, শিশু পুষ্টি কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ। মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে, ১৯৭১ সালের এই নব্বই থেকে একশত মিলয়ন ডলার সহায়তার বর্তমান মূল্যমান কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে দেশকে পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এই সময় অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং লাখ লাখ মানুষ ছিল বাস্তুচ্যুত। অবস্থা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশকে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করা শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে মার্কিন সরকার খাদ্য-শস্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং জরুরি অন্যান্য ত্রাণ সহায়তা পাঠায়। এসব সহায়তা যুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভোগ লাঘব এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্নয় করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণ এবং অর্থনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশের জুন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশ কিউবাকে সে দেশের ওপর মার্কিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাট জাতীয় পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ খোদ মার্কিন সরকারকে নাখোশ করে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পিএল ৪৮০-এর আওতায় বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে গম সরবরাহ করার স্কিমটি যুক্তরাষ্ট্র বন্ধ করে দেয় হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মূল কারণগুলোর মধ্যে মার্কিন এই পদক্ষেপটি অন্যতম। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এই ঘটনার জন্য দেশের অর্থমন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে এবং বাংলাদেশ আমেরিকার রোষানল থেকে মুক্তি পায়। সেই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয়, সে সময়ে মার্কিন সাহায্য বাংলাদেশের জন্য কতটা অপরিহার্য ছিল।
বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতির সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সহায়তা এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে সমর্থন করে। ইউএসএইডের মাধ্যমে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল বীজ, সেচ ব্যবস্তা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব উদ্যোগের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। কৃষি, গবেষণা, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই খাতগুলোতে গত পাঁচ দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের আর্থিক অনুদান ও কমডিটি সাহায্য এসেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের ইতিবাচক সমর্থন এ খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মসূচি সার্থক ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ছাড়া যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে মার্কিন সহায়তায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল। এই খাতে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন, শিক্ষার মান বৃদ্ধি, নারীর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে মার্কিন সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন বৃত্তি, একাডেমিক বিনিয়োগ কর্মসূচি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগের মাধ্যমে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে গত পাঁচ দশকে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা প্রদান করে আসছে। দুর্যোগ পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ভালো অবদান আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন প্রকল্প, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচিতেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা প্রদান করছে। এসব উদ্যোগ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সয়াহক হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সয়াহক দাতা দেশ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশিদারও বটে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটা বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পোন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই সম্পর্ক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বেসরকারি খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং আশ্রয়ব্যবস্তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এনজিওগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য অর্থ সহায়তা প্রদান করে চলেছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শান্তি রক্ষা কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও প্রদান করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিনিদের সরকারি নীতিকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। মানবিক সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলাসহ বিভিন্ন অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমরা দেখতে পাই, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং এই অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আশা করা যায় ভবিষ্যতেও পারস্পরিক স্বার্থ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারি আরো অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

বাজেট : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রত্যাশা

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
বাজেট : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রত্যাশা

বিএনপি সরকার তাদের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯.৩৮ লাখ কোটি ডলারের ব্যয় বরাদ্দসংবলিত বিশাল এক বাজেট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। এই বিপুল অর্থের মধ্যে কর রাজস্ব থেকে ৬.০৪ ট্রিলিয়ন টাকা, ৯১ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে করবহির্ভূত রাজস্ব থেকে। বাজেটের অবশিষ্ট ২.৪৩ ট্রিলিয়ন টাকার মধ্যে ১.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকার উৎস বৈদেশিক ঋণ এবং ১.২৭ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে বিভিন্ন দেশীয় উৎস থেকে। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩.১৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা পূর্ববর্তী উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।

যেকোনো সরকারের ঘোষিত বাজেট জনগণকে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা। নতুন রাজনৈতিক সরকারের ঘোষিত বাজেটেও তা প্রতিফলনের চেষ্টায় তারা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার তাদের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে : ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে অগ্রযাত্রা।’ জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য যা যা প্রয়োজন সবই বাজেটে রয়েছে। কোন সরকারের বাজেটে তা থাকে না? স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫৫ বছর যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা দেশ গড়তে, জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন করতে একই ধরনের অর্থনৈতিক রূপরেখা দিয়েছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জিত হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনমুক্ত বাংলাদেশ্বে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাংকের ওই সময়ের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডাইরেক্টর বাংলাদেশ্বের উন্নয়ন স্থবিরতার কারণ ব্যাখ্যা করে এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, ‘উন্নয়ন কি চুইয়ে পড়ে?’ কথাটি তিনি রূপক অর্থে বললেও বাংলাদেশ্বের মন্থর উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন আরেক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ভিয়েতনামের গতিশীল উন্নয়নের। ভিয়েতনাম বাংলাদেশ্বের স্বাধীনতা লাভের চার বছর পর নিজেদের দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে মুক্ত হয়ে দুই দশকের মধ্যে যেভাবে দেশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছিল, বাংলাদেশ তার ধারেকাছেও ছিল না। এখনো নেই। ভিয়েতনামের উন্নয়ন চুইয়ে পড়েনি। তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পেছন ফিরে তাকায়নি।

উন্নয়ন আসলেও চুইয়ে পড়ে না। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যেতে যত আগ্রহী, ক্ষমতায় গিয়ে তারা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা অধিক জটিল। প্রতিশ্রুতি পূরণের চেয়ে তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে যেকোনোভাবে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা অথবা দুঃশাসনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে দীর্ঘ বা স্থায়ী করার ফন্দিফিকির করা। দুঃশাসন যত প্রচণ্ড হয়, মানুষের ক্ষোভ তত বাড়ে। সরকার মানুষের ধূমায়মান ক্ষোভ প্রশমন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের উপায় হিসেবে প্রয়োগ করে রাষ্ট্রীয় শক্তি। কিন্তু তাতে দেশ্বে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে না। বাংলাদেশ তার ৫৫ বছর সময়ের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে প্রতিটি শাসকের এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ। অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণের দেশ্বে বিনিয়োগচিত্র হতাশাজনক হবে-এটাই স্বাভাবিক। দুঃশাসন অথবা দুর্বল শাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত বাধার কারণে বাংলাদেশ্বে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ দুটোই নিরুৎসাহিত হয়েছে। বাংলাদেশ্বের উন্নয়নচিত্র সম্পর্কে তিন দশক আগে যে মন্তব্য করেছিলেন, এখনো বাংলাদেশ্বের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাংলাদেশ ভিয়েতনামের কত পেছনে, তা উন্নয়নের বুলিতে মুখে ফেনা তোলা রাজনীতিবিদদের জানা উচিত। নীতিনির্ধারকদেরও জানা উচিত। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সাকল্যে ১.৫ বিলিয়ন ডলার এফডিআই আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল, যা ছিল জিডিপির মাত্র ০.৩৩ শতাংশ; অন্যদিকে ভিয়েতনাম এনেছিল এফডিআই ২০.২ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল তাদের জিডিপির ৪.২ শতাংশ। ২০২৪-এর পূর্ববর্তী ২৪ বছরে বাংলাদেশ্বে এফডিআই বৃদ্ধির পরিমাণ যেখানে ৫.৪ গুণ ছিল, ওই সময়ে ভিয়েতনামের বৃদ্ধি ছিল ১৫.৬ গুণ। ফেলে আসা এই ২৪ বছরের মধ্যে ১৮ বছরই ক্ষমতায় ছিল দেশ্বের স্বাধীনতার একচেটিয়া অধিকারী হওয়ার দাবিদার, মুক্তিযুদ্ধের সব কৃতিত্বের মালিক-মোক্তার ভারতে আশ্রিত শ্বেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থিত ১/১১-এর সরকার।

আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ এফডিআই দেশ্বে এসেছিল ২.৮৩ বিলিয়ন ডলার। আবারও যদি ভিয়েতনামের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, কেবল দুই বছরে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ভিয়েতনামে মোট ৩৮.৬৭ ডলার এফডিআই এসেছিল। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী রবিন খুদা ভারতের ডেটা সেন্টার প্রকল্পের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির বিভিন্ন স্থানে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোষ্ঠিনামা বের করে তার সম্পর্কে কথাবার্তা বলা শুরু হয়েছে। কোনো ব্যক্তি তার জন্মভূমিতে হোক, অথবা অন্য কোনো দেশ্বে হোক, তিনি তো তার বিনিয়োগ থেকে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে মুনাফা অর্জনের দিকটি আগে দেখবেন, দুনিয়ার কোথায় কোন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী আছেন, যিনি এমন একটি দেশ্বে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন, যে দেশ্বে বিনিয়োগ করলে মুনাফা আহরণ তো দূরের কথা, রাজনৈতিক দলের নেতাদের মাসোহারা দিতে হয়, গুন্ডা-মাস্তানদের চা-পানির খরচ দিতে হয়, বিদ্যুৎ থাকে না, যখনতখন ধর্মঘটের কারণে বন্দরে যথাসময়ে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছানো যায় না, এমনকি নিরাপত্তাবলয়ে ঘেরা গুলশান আবাসিক এলাকার হলি আর্টিজানের মতো অভিজাত রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে বেঘোরে বিদেশিদের প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটে? 

রবিন সাহেব যেহেতু বাংলাদেশ্বে জন্মগ্রহণ করেছেন, মাটির প্রতি তার টান থাকবে। দেশ্বে নিশ্চয়ই তার আত্মীয়স্বজনও আছেন এবং যেহেতু দেশ্বের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবও আছেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বিদেশ্বে গিয়ে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও পরিশ্রমে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। বিভিন্ন দেশ্বে তার বিনিয়োগ থাকলেও এবং তিনি বাংলাদেশ্বে কোনো বিনিয়োগ না করে কেন ভারতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, এ ঘটনা দেখেও যদি বাংলাদেশ্বের বিনিয়োগ পরিস্থিতির ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের কোনো হুঁশ না হয়, তাহলে কার কি বলার থাকতে পারে? দেশপ্রেমে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি,’ অথবা ‘ও আমার দেশ্বের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গাওয়া যায়, জীবনও দেওয়া যায়। কিন্তু নিজের অর্থ, এমনকি পিতার অর্থও অন্যের দ্বারা লুণ্ঠিত দেখতে চায় না। মানুষের এই চরিত্র সম্পর্কে হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেউ তার পিতার ঘাতককে ক্ষমা করতে পারে, পিতার অর্থ আত্মসাৎকারীকে ক্ষমা করতে পারে না।’ অতএব রবিন খুদা যদি তার বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে চান, তা দোষণীয় বা নিন্দনীয় হতে পারে না। 

রবিন খুদা একমাত্র দৃষ্টান্ত নন। বিপুল বিত্তের মালিক বাংলাদেশি-আমেরিকান ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীর বিনিয়োগ আছে ভারতসহ বহু দেশ্বে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তার ‘কেপিসি গ্রুপ’-এর বিনিয়োগের ক্ষেত্র পাওয়ার প্ল্যান্ট, বায়োটেকনোলজি, শিক্ষা, হাসপাতাল, হোটেল, রিয়েল এস্টেট, চা-বাগানসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত। জন্মভূমি বাংলাদেশ্বেও বিনিয়োগ করতে গিয়েছিলেন এখন থেকে দশ বছর আগে, ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কারিগরদের সরকারের আমলে। পূর্বাচলে ৬০ একর জমির ওপর ১৪২ তলাবিশিষ্ট ‘আইকনিক টাওয়ার’ এবং স্পোর্টস কমপ্লেক্সসহ আরও কিছু স্থাপনায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক কালী বাবুর আশা পূরণ হয়নি। তিনি এক বুক হতাশা নিয়ে তার ‘ধনধান্য পুষ্পেভরা’ দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে বলেছেন, ‘দেশ্বে কিছু করতে চাই, তাই “আইকনিক টাওয়ার” করার ইচ্ছা। এই চেষ্টা করতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক হয়রানির শিকার হয়েছি। বহুবার দেশ্বে গেছি, দেশ থেকে ফিরে এসেছি। জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি (তৎকালীন) ড. মোমেন, অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমি আশাবাদী যে আমার স্বপ্নের টাওয়ার বাংলাদেশ্বে নির্মিত হবে।’ বাংলাদেশকেন্দ্র্রিক আরও কিছু পরিকল্পনা ছিল ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীর। কে জানে এখন তার পরিকল্পনাগুলো কী অবস্থায় আছে।

বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা পরিবেশ মূল্যায়ন ‘বি-রেডি (বিজনেস রেডি) সূচক ২০২৪’ অনুযায়ী ৫০টি দেশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ্বের স্থান ২৯তম এবং ‘বি-রেডি সূচক’-এর পূর্বসূরি বিশ্বব্যাংকের ‘ব্যবসা সহজীকরণ’ রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী ১৯০টি দেশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ্বের অবস্থান ১৬৮তম। যে দিকগুলো বিশ্লেষণ করে এই সূচকগুলো নির্ধারণ করা হয়, সেগুলো বাংলাদেশ্বে সুশাসনের অভাব, জনসেবার অনুপস্থিতি, নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোর দুর্বলতা, বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ্বেই সামনে আনে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতির এই চিত্র থেকেও আমরা যদি আমাদের দেশ্বের অর্থনীতির চালচিত্র সম্পর্কে ধারণা না করতে পারি এবং পদ্মা সেতু, সুড়ঙ্গপথ, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল স্থাপনা দেখিয়ে জনগণকে বুঁদ করে রাখার চেষ্টা করি, তাতে ভালো কিছু হবে না। তা যে হয়নি, তা এসব মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী সরকারের দম্ভের ওপর নির্মিত কাচের প্রাসাদ অল্প আঘাতেই খান খান হয়ে যাওয়াই প্রমাণ। অতএব বাজেটে বর্তমান ব্যয় বরাদ্দের কয়েক গুণ বেশি বরাদ্দ করা হলেও দেশ অর্থনৈতিক দুরবস্থার যে খাদে পড়ে আছে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

এ পরিস্থিতি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। বিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কবল থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা কি সুখ নিশ্চিত করে? উন্নয়নের গ্যারান্টি দেয়? স্বাধীনতা একটি নীতি, নিজস্ব শাসনের অধিকার, মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা, আইনের শাসন লাভের অধিকার। কোনো স্বাধীন দেশ্বের প্রাথমিক দিনগুলোতে সব ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা কাটিয়ে ওঠা অনেক দেশ্বের জন্যই সহজ ছিল না। কারণ যারা সদ্য স্বাধীন দেশ্বের ক্ষমতায় আসীন হন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না। স্বাধীন দেশ্বের সরকারের কাছে জনগণ যে পর্বতপ্রমাণ আশা করে, তারা তা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কার্যকর কাঠামোর অনুপস্থিতিতে সর্বস্তরে দুর্নীতি ও লুণ্ঠন নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশ্বের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। বিধ্বস্ত দেশ গড়তে, ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ এবং গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর ছাউনির ব্যবস্থা করতে সারা বিশ্ব থেকে যা আসছিল, তা হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল। চুরিচামারি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অভিধা দিয়েছিলেন।  ওই সময় থেকে বাংলাদেশ পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ভিন্ন আদলে তলাবিহীন ঝুড়িই রয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে, তাদের একটি অংশ এবং তাদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যাংকের অর্থ লুট, জাতীয় সম্পদ বিদেশ্বে পাচার করার মাধ্যমে দেশকে ফতুর করে ফেলেছে। এই প্রবণতা বন্ধ না করতে পারলে বছর বছর স্ফীত ব্যয় বরাদ্দসংবলিত বাজেট উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে? উন্নয়নের আবশ্যিক শর্ত হলো : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এসব নিশ্চিত করার ওপরই দেশ পরিচালনার সাফল্য নির্ভর করে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির আড়ালে ব্যক্তির করভার বৃদ্ধি

ড. মো. মিজানুর রহমান
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির আড়ালে ব্যক্তির করভার বৃদ্ধি
সংগৃহীত ছবি

প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও বেতনভোগী শ্রেণি, সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে যে বিষয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন, তার মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর অন্যতম। কারণ করনীতি কেবল রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সঞ্চয়, ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন করদাতার কাছে বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় মাস শেষে তার হাতে কত টাকা অবশিষ্ট থাকছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রথম দৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। তবে করদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো, এই করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কতটুকু এবং এর আড়ালে করদাতার মোট করভার সত্যিই কমছে, নাকি ভিন্ন উপায়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে—সেই বিষয়টিই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে করস্ল্যাব ও করহার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সামান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে, উচ্চতর আয়ের স্তরে নতুন স্ল্যাব ও করহারের কারণে তা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তির বার্তা না দিয়ে বরং অনেক করদাতাদের মোট করভার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
করনীতির মূল্যায়নে নামমাত্র আয় (Nominal Income) ও প্রকৃত আয় (Real Income)-এর পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে কমে যায়। ধরা যাক, গত তিন বছরে গড় মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৯ শতাংশ ছিল। সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় প্রায় ২৯.৫ শতাংশ।

এই বাস্তবতায় করমুক্ত সীমা মাত্র ৭ শতাংশ বৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, পূর্বের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত সীমার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে বর্তমান সীমা মূল্যস্ফীতির হার অনুযায়ী কমপক্ষে ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া উচিত ছিল। সেই হিসাবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার নতুন সীমা বাস্তবে পূর্বের সীমার সমতুল্যও নয়। বরং ক্রয়ক্ষমতার বিচারে করমুক্ত আয়ের প্রকৃত পরিসর সংকুচিত হয়েছে বলেই যুক্তি দেওয়া যায়।

করদাতার চূড়ান্ত করদায় শুধু করমুক্ত সীমা দ্বারা নয়, পুরো করকাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অনেক সময় করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি করা হলেও পরবর্তী স্ল্যাবের হার বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার আরো বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারে। অর্থনীতিতে এই ঘটনাকে “ফিসকাল ড্র্যাগ” বা নীরব করবৃদ্ধি বলা হয় অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি বা নামমাত্র আয় বৃদ্ধির কারণে করদাতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর করস্ল্যাবে প্রবেশ করেন, যদিও তাদের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না। এর ফলে দৃশ্যমান করহার অপরিবর্তিত থাকলেও কার্যকর করভার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।

এই প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে। প্রথমত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের নামমাত্র আয় বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো কর্মচারীর মাসিক বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৮ হাজার টাকা হয়, তাহলে কাগজে-কলমে তার আয় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে মনে হবে। কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বরং কমে যেতে পারে। অর্থাৎ আয়ের বৃদ্ধি বাস্তব সমৃদ্ধির প্রতিফলন নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

দ্বিতীয়ত, করস্ল্যাব যদি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত সমন্বয় করা না হয়, তাহলে করদাতারা ধীরে ধীরে উচ্চতর করহারের আওতায় চলে যান। ফলে যে আয় বৃদ্ধি মূলত মূল্যস্ফীতির কারণে হয়েছে, সেটিকেও অতিরিক্ত আয় হিসেবে গণ্য করে বেশি কর আরোপ করা হয়। অর্থাৎ করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার উন্নতি না ঘটলেও তার করদায় বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, এই অতিরিক্ত করের ফলে করদাতার হাতে অবশিষ্ট ব্যয়যোগ্য আয় (Disposable Income) কমে যায়। একদিকে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের একটি বড় অংশ কর হিসেবে চলে যাচ্ছে। ফলে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য উপলব্ধ অর্থ ক্রমশ সংকুচিত হয়।

ফিসকাল ড্র্যাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি দৃশ্যমান করহার পরিবর্তন ছাড়াই সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে করহার না বাড়িয়েও বেশি কর আদায় করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে এটি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক, কারণ করদাতারা সরাসরি করবৃদ্ধির কোনো ঘোষণা দেখতে পান না; কিন্তু বছরের শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, তাদের কর পরিশোধের পর হাতে অবশিষ্ট অর্থ আগের তুলনায় কমে গেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে করস্ল্যাব মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হয় না, সেখানে ফিসকাল ড্র্যাগের প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এর প্রধান ভুক্তভোগী। কারণ তাদের বেতন সাধারণত মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে কিছুটা বাড়ে, কিন্তু করসীমা সেই হারে সমন্বিত হয় না। ফলে তারা এমন আয়ের ওপর কর প্রদান করেন, যা প্রকৃত অর্থে তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটায়নি।

উদাহরণস্বরূপ, একজন করদাতার বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা হলে নতুন কাঠামোতে তার করযোগ্য আয় হবে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু এখানে শুধু করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির দিকটি নয়, করস্ল্যাবের হার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম করযোগ্য ১ লাখ টাকার ওপর করহার ছিল ৫ শতাংশ, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী স্ল্যাবে করহার ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে করযোগ্য আয়ের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পুরোনো কাঠামোতে ৫ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর হতো ৫ হাজার টাকা, এবং অবশিষ্ট ৫০ হাজার টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর হতো ৫ হাজার টাকা। ফলে মোট কর দাঁড়াত প্রায় ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে নতুন কাঠামোতে করযোগ্য আয় কমে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা হলেও প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকা, এবং অবশিষ্ট ২৫ হাজার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। ফলে মোট কর দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৭৫০ টাকা।

অর্থাৎ করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি পেলেও এবং করযোগ্য আয় কমলেও করহার বৃদ্ধির কারণে একজন ৫ লাখ টাকার করদাতার মোট কর প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা বেড়ে যায়। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির ঘোষণার পরও বাস্তবে করদাতার করভার কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট যে করনীতিতে নামমাত্র পরিবর্তন এবং প্রকৃত করভার পরিবর্তন এক বিষয় নয়। করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি করদাতার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু যদি সেই বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি এবং করস্ল্যাবের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তার প্রকৃত সুফল সীমিত থেকে যায়।

এখানেই মধ্যবিত্তের প্রকৃত সংকট। করব্যবস্থা নামমাত্র আয়ের ওপর কর নির্ধারণ করে, প্রকৃত আয়ের ওপর নয়। ফলে মূল্যস্ফীতিজনিত আয়বৃদ্ধির ওপরও কর আরোপিত হয়, যদিও বাস্তবে জীবনমানের কোনো উন্নতি ঘটে না। এর ফলে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে করযোগ্য আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ তাদের হাতে অবশিষ্ট ব্যয়যোগ্য আয় ক্রমেই সংকুচিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় ও আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

করনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর যোগাযোগ বা “পলিসি ন্যারেটিভ”। কোনো বাজেট শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি বার্তাও বহন করে। সরকার যখন করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করে, তখন সেটি সাধারণত জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা করদাতাদের মধ্যে ধারণা তৈরি করে যে করের চাপ কমছে। কিন্তু প্রকৃত প্রভাব বুঝতে হলে কেবল ঘোষণার ভাষা নয়, পুরো করকাঠামো, করস্ল্যাব, করহার এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, করমুক্ত সীমা বাড়লেও স্ল্যাব কাঠামো বা মূল্যস্ফীতির কারণে সেই সুবিধা বাস্তবে সীমিত হয়ে যায়।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—করনীতির উদ্দেশ্য কি সত্যিকারের আর্থিক স্বস্তি দেওয়া, নাকি স্বস্তির একটি ধারণা তৈরি করা? যখন ঘোষিত সুবিধা এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, তখন নীতিগত স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ করদাতা শেষ পর্যন্ত বাজেটের ঘোষণার চেয়ে নিজের বাস্তব আর্থিক অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। সরকারের জন্য করনীতি কেবল জনসন্তুষ্টির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রয়োজন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সময় সরকারি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে সরকারকে একদিকে জনমুখী করনীতি গ্রহণ করতে হয়, অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহও নিশ্চিত করতে হয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন জনস্বস্তি ও রাজস্ব সংগ্রহের এই ভারসাম্য করদাতার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারায়। যদি করদাতা অনুভব করেন যে তার ব্যয় বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং করদায়ও অপরিবর্তিত থাকছে, অথচ তাকে কর-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলা হচ্ছে, তাহলে করব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণেই করনীতিকে আরও ন্যায্য ও টেকসই করতে হলে কেবল নামমাত্র পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে করস্ল্যাবের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, যাতে বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে করদায় নির্ধারিত হয়।

একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়—যেমন খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা—বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয়ের সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ আয়ের বড় অংশ যদি মৌলিক চাহিদা পূরণেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে সেই আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ মধ্যবিত্তের ওপর অযথা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

কর ব্যবস্থার আরেকটি অপরিহার্য দিক হলো স্বচ্ছতা। করদাতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন আয়ের অংশে কত কর আরোপ হচ্ছে, করস্ল্যাব পরিবর্তনের ফলে তার মোট করদায় কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সরকারের রাজস্ব নীতির মূল উদ্দেশ্য কী। এই স্বচ্ছতা না থাকলে করদাতার মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে কর-অনুবর্তিতা (Tax Compliance) কমিয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সবশেষে বাংলাদেশের ব্যক্তিশ্রেণির করনীতির সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির আড়ালে করভার পরিবর্তনের প্রশ্নটি কেবল সংখ্যাগত হিসাব নয়; এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। মুদ্রাস্ফীতি, করস্ল্যাব পুনর্বিন্যাস এবং মধ্যবিত্তের আয় কাঠামোর চাপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঘোষিত “স্বস্তি” অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবে সীমিত বা প্রতীকী হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে কার্যকর করভার প্রত্যাশিত হারে কমে না, বরং স্থিতিশীল থাকে বা কিছু ক্ষেত্রে বাড়তেও পারে। বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত বাজেটের করমুক্ত সীমা বাস্তব অর্থে করদাতার স্বস্তি বাড়ায়নি বরং কমিয়েছে। বিশেষ করে নীতিগত ঘোষণার স্তরের একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন বাস্তব জীবনে মধ্যবিত্ত করদাতার চাপ বারিয়েছে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]