• ই-পেপার

বাজেট : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রত্যাশা

করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির আড়ালে ব্যক্তির করভার বৃদ্ধি

ড. মো. মিজানুর রহমান
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির আড়ালে ব্যক্তির করভার বৃদ্ধি
সংগৃহীত ছবি

প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও বেতনভোগী শ্রেণি, সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে যে বিষয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন, তার মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর অন্যতম। কারণ করনীতি কেবল রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সঞ্চয়, ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন করদাতার কাছে বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় মাস শেষে তার হাতে কত টাকা অবশিষ্ট থাকছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রথম দৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। তবে করদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো, এই করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কতটুকু এবং এর আড়ালে করদাতার মোট করভার সত্যিই কমছে, নাকি ভিন্ন উপায়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে—সেই বিষয়টিই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে করস্ল্যাব ও করহার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সামান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে, উচ্চতর আয়ের স্তরে নতুন স্ল্যাব ও করহারের কারণে তা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তির বার্তা না দিয়ে বরং অনেক করদাতাদের মোট করভার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
করনীতির মূল্যায়নে নামমাত্র আয় (Nominal Income) ও প্রকৃত আয় (Real Income)-এর পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে কমে যায়। ধরা যাক, গত তিন বছরে গড় মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৯ শতাংশ ছিল। সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় প্রায় ২৯.৫ শতাংশ।

এই বাস্তবতায় করমুক্ত সীমা মাত্র ৭ শতাংশ বৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, পূর্বের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত সীমার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে বর্তমান সীমা মূল্যস্ফীতির হার অনুযায়ী কমপক্ষে ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া উচিত ছিল। সেই হিসাবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার নতুন সীমা বাস্তবে পূর্বের সীমার সমতুল্যও নয়। বরং ক্রয়ক্ষমতার বিচারে করমুক্ত আয়ের প্রকৃত পরিসর সংকুচিত হয়েছে বলেই যুক্তি দেওয়া যায়।

করদাতার চূড়ান্ত করদায় শুধু করমুক্ত সীমা দ্বারা নয়, পুরো করকাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অনেক সময় করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি করা হলেও পরবর্তী স্ল্যাবের হার বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার আরো বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারে। অর্থনীতিতে এই ঘটনাকে “ফিসকাল ড্র্যাগ” বা নীরব করবৃদ্ধি বলা হয় অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি বা নামমাত্র আয় বৃদ্ধির কারণে করদাতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর করস্ল্যাবে প্রবেশ করেন, যদিও তাদের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না। এর ফলে দৃশ্যমান করহার অপরিবর্তিত থাকলেও কার্যকর করভার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।

এই প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে। প্রথমত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের নামমাত্র আয় বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো কর্মচারীর মাসিক বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৮ হাজার টাকা হয়, তাহলে কাগজে-কলমে তার আয় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে মনে হবে। কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বরং কমে যেতে পারে। অর্থাৎ আয়ের বৃদ্ধি বাস্তব সমৃদ্ধির প্রতিফলন নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

দ্বিতীয়ত, করস্ল্যাব যদি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত সমন্বয় করা না হয়, তাহলে করদাতারা ধীরে ধীরে উচ্চতর করহারের আওতায় চলে যান। ফলে যে আয় বৃদ্ধি মূলত মূল্যস্ফীতির কারণে হয়েছে, সেটিকেও অতিরিক্ত আয় হিসেবে গণ্য করে বেশি কর আরোপ করা হয়। অর্থাৎ করদাতার প্রকৃত আর্থিক অবস্থার উন্নতি না ঘটলেও তার করদায় বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, এই অতিরিক্ত করের ফলে করদাতার হাতে অবশিষ্ট ব্যয়যোগ্য আয় (Disposable Income) কমে যায়। একদিকে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের একটি বড় অংশ কর হিসেবে চলে যাচ্ছে। ফলে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য উপলব্ধ অর্থ ক্রমশ সংকুচিত হয়।

ফিসকাল ড্র্যাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি দৃশ্যমান করহার পরিবর্তন ছাড়াই সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে করহার না বাড়িয়েও বেশি কর আদায় করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে এটি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক, কারণ করদাতারা সরাসরি করবৃদ্ধির কোনো ঘোষণা দেখতে পান না; কিন্তু বছরের শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, তাদের কর পরিশোধের পর হাতে অবশিষ্ট অর্থ আগের তুলনায় কমে গেছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে করস্ল্যাব মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হয় না, সেখানে ফিসকাল ড্র্যাগের প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এর প্রধান ভুক্তভোগী। কারণ তাদের বেতন সাধারণত মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে কিছুটা বাড়ে, কিন্তু করসীমা সেই হারে সমন্বিত হয় না। ফলে তারা এমন আয়ের ওপর কর প্রদান করেন, যা প্রকৃত অর্থে তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটায়নি।

উদাহরণস্বরূপ, একজন করদাতার বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা হলে নতুন কাঠামোতে তার করযোগ্য আয় হবে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু এখানে শুধু করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির দিকটি নয়, করস্ল্যাবের হার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম করযোগ্য ১ লাখ টাকার ওপর করহার ছিল ৫ শতাংশ, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী স্ল্যাবে করহার ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে করযোগ্য আয়ের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পুরোনো কাঠামোতে ৫ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে করযোগ্য আয় ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর হতো ৫ হাজার টাকা, এবং অবশিষ্ট ৫০ হাজার টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর হতো ৫ হাজার টাকা। ফলে মোট কর দাঁড়াত প্রায় ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে নতুন কাঠামোতে করযোগ্য আয় কমে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা হলেও প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকা, এবং অবশিষ্ট ২৫ হাজার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। ফলে মোট কর দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৭৫০ টাকা।

অর্থাৎ করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি পেলেও এবং করযোগ্য আয় কমলেও করহার বৃদ্ধির কারণে একজন ৫ লাখ টাকার করদাতার মোট কর প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা বেড়ে যায়। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির ঘোষণার পরও বাস্তবে করদাতার করভার কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট যে করনীতিতে নামমাত্র পরিবর্তন এবং প্রকৃত করভার পরিবর্তন এক বিষয় নয়। করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি করদাতার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু যদি সেই বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি এবং করস্ল্যাবের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তার প্রকৃত সুফল সীমিত থেকে যায়।

এখানেই মধ্যবিত্তের প্রকৃত সংকট। করব্যবস্থা নামমাত্র আয়ের ওপর কর নির্ধারণ করে, প্রকৃত আয়ের ওপর নয়। ফলে মূল্যস্ফীতিজনিত আয়বৃদ্ধির ওপরও কর আরোপিত হয়, যদিও বাস্তবে জীবনমানের কোনো উন্নতি ঘটে না। এর ফলে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে করযোগ্য আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ তাদের হাতে অবশিষ্ট ব্যয়যোগ্য আয় ক্রমেই সংকুচিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় ও আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

করনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর যোগাযোগ বা “পলিসি ন্যারেটিভ”। কোনো বাজেট শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি বার্তাও বহন করে। সরকার যখন করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করে, তখন সেটি সাধারণত জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা করদাতাদের মধ্যে ধারণা তৈরি করে যে করের চাপ কমছে। কিন্তু প্রকৃত প্রভাব বুঝতে হলে কেবল ঘোষণার ভাষা নয়, পুরো করকাঠামো, করস্ল্যাব, করহার এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, করমুক্ত সীমা বাড়লেও স্ল্যাব কাঠামো বা মূল্যস্ফীতির কারণে সেই সুবিধা বাস্তবে সীমিত হয়ে যায়।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—করনীতির উদ্দেশ্য কি সত্যিকারের আর্থিক স্বস্তি দেওয়া, নাকি স্বস্তির একটি ধারণা তৈরি করা? যখন ঘোষিত সুবিধা এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, তখন নীতিগত স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ করদাতা শেষ পর্যন্ত বাজেটের ঘোষণার চেয়ে নিজের বাস্তব আর্থিক অবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। সরকারের জন্য করনীতি কেবল জনসন্তুষ্টির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রয়োজন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সময় সরকারি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে সরকারকে একদিকে জনমুখী করনীতি গ্রহণ করতে হয়, অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহও নিশ্চিত করতে হয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন জনস্বস্তি ও রাজস্ব সংগ্রহের এই ভারসাম্য করদাতার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারায়। যদি করদাতা অনুভব করেন যে তার ব্যয় বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং করদায়ও অপরিবর্তিত থাকছে, অথচ তাকে কর-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলা হচ্ছে, তাহলে করব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণেই করনীতিকে আরও ন্যায্য ও টেকসই করতে হলে কেবল নামমাত্র পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে করস্ল্যাবের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, যাতে বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে করদায় নির্ধারিত হয়।

একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়—যেমন খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা—বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয়ের সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ আয়ের বড় অংশ যদি মৌলিক চাহিদা পূরণেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে সেই আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ মধ্যবিত্তের ওপর অযথা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

কর ব্যবস্থার আরেকটি অপরিহার্য দিক হলো স্বচ্ছতা। করদাতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন আয়ের অংশে কত কর আরোপ হচ্ছে, করস্ল্যাব পরিবর্তনের ফলে তার মোট করদায় কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সরকারের রাজস্ব নীতির মূল উদ্দেশ্য কী। এই স্বচ্ছতা না থাকলে করদাতার মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে কর-অনুবর্তিতা (Tax Compliance) কমিয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সবশেষে বাংলাদেশের ব্যক্তিশ্রেণির করনীতির সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির আড়ালে করভার পরিবর্তনের প্রশ্নটি কেবল সংখ্যাগত হিসাব নয়; এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। মুদ্রাস্ফীতি, করস্ল্যাব পুনর্বিন্যাস এবং মধ্যবিত্তের আয় কাঠামোর চাপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঘোষিত “স্বস্তি” অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবে সীমিত বা প্রতীকী হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে কার্যকর করভার প্রত্যাশিত হারে কমে না, বরং স্থিতিশীল থাকে বা কিছু ক্ষেত্রে বাড়তেও পারে। বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত বাজেটের করমুক্ত সীমা বাস্তব অর্থে করদাতার স্বস্তি বাড়ায়নি বরং কমিয়েছে। বিশেষ করে নীতিগত ঘোষণার স্তরের একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন বাস্তব জীবনে মধ্যবিত্ত করদাতার চাপ বারিয়েছে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

এক টুকরো নিজস্ব মাটি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অনলাইন ডেস্ক
এক টুকরো নিজস্ব মাটি

সেদিন বৃষ্টির ভিতর রিকশাওয়ালা বলল, তার গাড়িটা ভারি ডিস্টার্ব করছে, একে বদলে নেবে পথে। রিকশার মালিকের আস্তানায় গেল, না পেয়ে মালিকের স্ত্রীকে বলে এলো, ‘বলবেন রিকশায় ডিফেক্ট আছে, রিটার্ন করতে হবে।’ নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল যে সে একেবারে অশিক্ষিত নয়, কিছুটা লেখাপড়া আছে তার। কিন্তু একে কি উন্নতি বলবেন আপনি? বলবেন কি যে নবযুগ এসে গেছে বাংলাদেশে? শিক্ষিত লোকেরা এখন রিকশা চালাচ্ছে। রিকশাচালকরা শিক্ষিত হচ্ছে- এমন হলে তা-ও বুঝতাম কিন্তু শিক্ষিতরা অন্য কোনো কাজ না পেয়ে রিকশাচালক হচ্ছে- এ খবরে উল্লসিত হব কেন?

যথার্থ উন্নতি হচ্ছে বুঝতাম, যদি দেখতাম শহর থেকে রিকশা উঠে গেছে, মিনিটে মিনিটে পাওয়া যাচ্ছে বাস এবং এককালে যারা রিকশা চালাত তাদের বিকল্প ও মানবিক কর্মের সংস্থান হয়ে গেছে। চমৎকার!

তা তো হবে না। তা তো হওয়ার নয়। সংগ্রাম চলছে। চলবে। তা, চলতে থাকুক সংগ্রাম, কিন্তু ইতোমধ্যে মানুষ বসবাস করছে কোথায়? কোথায় তারা থাকে? থাকবে? বাংলা ভাষায় আমরা ঘর ও বাড়ির মধ্যে তেমন একটা তফাত করি না। যা ঘর তা-ই বাড়ি। অনেকটা ঘর নিয়ে একটা বাড়ি- এমন একটা সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারি হয়তো কিন্তু তা ঠিক দাঁড়িয়ে থাকে না। ঘরবাড়ি ও বাড়িঘর একাকার হয়ে যায়। ঘরের বদলে বাড়ি এবং বাড়ির বদলে ঘর ব্যবহার করা যায় খুব সহজে। বাড়িওয়ালাকে কিছুতেই ঘরওয়ালা বলা যাবে না। ভয়ে। পাছে উচ্ছেদ করে দেয়। এর বাইরে ঘরই বাড়ি হয়ে যাবে। মেয়েরা স্বামীর ঘর করে, বাড়ি করে না। মানুষের ঘরই পোড়ে, বাড়ি পোড়ে না। বাড়িটা অস্পষ্ট হতে পারে, ঘরটা খুবই নির্দিষ্ট।

‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ শেখ মুজিব বলেছিলেন একাত্তরে। বাড়িতে বাড়িতে দুর্গ গড়ার কথা বলেননি। বললে কথাটার তেমন জোর থাকত না, কথাটা যেন বাস্তবসম্মতও হতো না। না, ঘর হলেই চলে, চলে যায়, বাড়ির দরকার নেই। আমরা ঘর বাঁধতে চাই, ঘর ভাঙাকে ভীষণ ডরাই, ঘর পুড়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে এসে দাঁড়াই। ঘরই বাড়ি আমাদের জন্য, কোনোমতে একটা ঘর হলেই বেঁচে যাই। তার চেয়ে বড় কিছু দরকার নেই। আমরা লোভী নই। আমরা বড়ই সংযমী জাতি।

কী অসম্ভব সামান্য আমাদের বাসগৃহগুলো। টিন দিয়ে বানিয়েছে যারা, তারা মহা সৌভাগ্যবান। লাখ লাখ মানুষ হোগলাপাতা, মুলিবাঁশ, নারকেলের ডাল- এসব দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকে। অনেকের তা-ও নেই। খোলা আকাশের নিচে প্রকাশ্য বসবাস। একে কি স্বাধীনতা বলে? ওই স্বাধীনতা উপলক্ষে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে এ দেশের। সাতচল্লিশে একবার, একাত্তরে একবার। ভয়াবহ ছিল সেই দুটি ঘটনা। কিন্তু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া তো কেবল ওই বিশেষ দুটি সময়ের ঘটনা নয়, প্রতিনিয়ত উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। প্রতিদিন। গ্রাম থেকে শহরে আসছে কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে। কচুরিপানারও একটা সৌন্দর্য আছে, মানুষের এই অন্তহীন শোভাযাত্রায় সেই সৌন্দর্যটুকুও নেই। কোথায় যায় এত মানুষ? কোথায় থাকে? ঘরবাড়ি আছে কি? জিজ্ঞেস করার লোক নেই। উত্তর দেওয়ার লোক আরো কম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বলছে, প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিজ নিজ গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে। অত্যন্ত সুন্দর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আছে কি? নিরাপত্তা পরে হবে, গৃহ আছে কি? সুন্দর, অসুন্দর, সুশ্রী, কুশ্রী, সংস্কৃতিবান, সংস্কৃতিহীন, যা-ই হোক ঠাঁই আছে কি মাথা গোঁজার? মূল প্রশ্ন তো সেটাই।

সংবিধান বলছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধির সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’ তালিকায় আরও বিষয় আছে সেগুলো থাক, প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো মিটেছে কি? রাষ্ট্রের যাত্রা সমাজতন্ত্রাভিমুখী হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। আমরা জানি, আমরা এখন পুঁজিবাদী। কিন্তু এমনকি ঘোরতর পুঁজিবাদী দেশও তো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য অনেক রকম পদক্ষেপ নেয়। আমাদের এখানে নেওয়া হচ্ছে কি? অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা সবই প্রয়োজন, কিন্তু বাসস্থানও তো প্রয়োজন মানুষের। সে মানুষ তো মানুষ নয়, যার কোনো আশ্রয় নেই। মানুষ পাখি হতে চায় ঠিকই, কিন্তু পাখি তো মানুষ নয়। ছিল না, হবে না কখনো। না, ঘর নেই মানুষের। ভূমিহীনের নেই, ভিক্ষুকের নেই, রোজগেরে বালকদের নেই। এমন কি সেই সরকারি কর্মচারীটিরও নেই- আগামীকাল যিনি অবসর নেবেন চাকরি থেকে। অবসর তাঁকে ব্যস্ত করবে। এমন ব্যস্ত, যা তিনি কর্মজীবনে কোনো দিন ছিলেন না। আগামীকাল অস্থির, বিপন্ন, দিগ্ভ্রান্ত হবেন তিনি, ঘরের অভাবে। ঘরের খোঁজে।

 গাড়িকেউ কেউ করেছে। ঘর নয়, বাড়িই করেছে বড় বড়। এক পুরুষের বাড়িঘর সেসব। সাতচল্লিশের আগে এই ঢাকা শহরে কারোই উল্লেখযোগ্য বাড়িঘর ছিল না। মা-বাবা গ্রামে থাকতেন, বড়জোর টিনের ঘরে। সাতচল্লিশের পর বাড়ি হলো কারও কারও। কারও কারও একাত্তরের পরে। সে-ও এক পুরুষের কারবার। আগের পুরুষের খোঁজ করুন, খবর পাবেন না। এসি দূরের কথা, টেলিফোনই দেখেনি আগের পুরুষ। বলা বাহুল্য এসব বাড়িঘর ইট দিয়ে যতটা গড়া নয়, প্রতারণা দিয়ে গড়া তার চেয়ে বেশি। পরিশ্রমের জোরে ধনী হবে- এ যদি সম্ভব হতো বাংলাদেশে তাহলে এখানে ধনীর সংখ্যা হতো কয়েক কোটি। আর যদি উত্তরাধিকার ধনী হওয়ার পথ হতো, তাহলে এ দেশে ধনী খুঁজে পাওয়া ভার হতো।

স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষকে কিছু সুযোগ অবশ্যই এনে দিয়েছে। যেমন বিদেশে যাওয়া। আগে এমন সুযোগ ছিল না। বড়জোর করাচি-লাহোর-পিন্ডি যেত কেউ কেউ। এখন যাচ্ছে লন্ডন, ওয়াশিংটনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু যেখানেই যাক, কেবল যে পাসপোর্ট নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে তা নয়, গৃহের স্বপ্ন ও স্মৃতিও নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে। ঘড়বাড়ি থাকে সঙ্গেই; বহন করে চলে শামুকের মতো পিঠে না হলেও ক্যাঙারুর মতো বুকের ভিতর বটে। বিদেশের উপার্জন দিয়ে দেশে একটি ঘর তৈরি করব- এই থাকে স্বপ্ন। করেও। ওভাবেই বেশ কিছু বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে। বাড়ি না থাকার স্মৃতিটা থাকে, একেবারে অনিবার্যভাবে। তাড়া করে। স্মৃতিই স্বপ্নকে প্রবল করে। এ তো খুবই সত্য কথা যে গৃহহীনরাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গৃহী। কেননা তারা ঘর খোঁজে এবং ঘর নেই যেহেতু, তাই দুয়ার দিয়ে শোয়। বিদেশিরা আমাদের মিসকিন বলে, ঘৃণা করে, সর্বনিম্ন বেতন দেয় কিন্তু আমরা পড়ে থাকি সেখানেই। পাসপোর্ট হয়তো ভুয়া কারও, কারও ভিসা হয়তো ঠিক নেই। ভয়ে ভয়ে থাকি কখন না জানি তাড়িয়ে দেয়। তাড়িয়ে দিলেই সর্বনাশ। আমাদের ঘর নেই। আমরা ঘর করব কী দিয়ে? বিদেশিরা জানে, আমাদের ঘরের খবর। তাই বেতন দেয় সবচেয়ে কম। পরিশ্রম করিয়ে নেয় সবচেয়ে বেশি। জানে, যা-ই দিক আমরা রাজি হয়ে যাব। যে মুসলিম উম্মাহর সদস্য আমরা, তারাও মুসলমান ভাই বলে এতটুকু খাতির করে না। বিধর্মী আমেরিকানদের বেতন দেয় সর্বোচ্চ, স্বধর্মী বাংলাদেশিদের দেয় সর্বনিম্ন। দেশে যদি ঘর থাকত তাহলে ওই দশা হতো না। আমরা দর-কষাকষি করতাম। বলতাম, ‘না, পোষাবে না, মাফ করবেন, অন্য লোক দেখুন।’ আমরা পারি না। বিদেশে পারি না, দেশেও পারি না। যুগ যুগ ধরে আমরা নিরাশ্রয়ী গৃহী। আউলবাউলরা ওই পথে গেছেন বুঝি ঘর পাননি বলেই। অনেকেই আধ্যাত্মিক হয়েছেন সংসার থেকে পলায়নের অভিপ্রায়ে। ঘর নেই, সংসার করেন কী করে? এখনো সেই গৃহহীন দশাই আমাদের। আমাদের কে মর্যাদা দেবে? অথচ বিদেশিরা যখন আসে এ দেশে-কোথায় রাখব তাদের, ভেবে পাই না। কেননা তারা আশ্রয়দাতা, আমরা নিরাশ্রয়।

সামগ্রিকভাবে বঙ্গভূমি আগেও পশ্চাদপদই ছিল। পূর্ববঙ্গ ছিল জঙ্গলের ভিতরে জঙ্গল। বঙ্গ গেছে, পূর্ব পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ হয়েছে, বদল হয়েছে রাষ্ট্রের; কিন্তু মানুষ এখনো এখানে তার ঘর খুঁজে পায়নি। বাঙালি মুসলমান আগে বাঙালি, না আগে মুসলমান- এই বিতর্ক একসময় ছিল আজও যে নেই তা-ও নয়। আজ সে বাঙালিই হতে চায়, নাগরিকত্বে বাংলাদেশি। কিন্তু তার যে ঘর নেই তার কী হবে? একসময় সরকারি উদ্যোগে কেবল তার কর্মচারীদের জন্য হলেও কিছু আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছিল। আজ সেই উদ্যোগটিও সেভাবে নেই। গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থা ঋণ দেয় অল্প কয়েকজনকে। তা-ও বন্ধ করে দেয় মাঝেমধ্যেই। সমবেত উদ্যোগ ছাড়া ঘর হবে না। ঘর ব্যক্তির, কিন্তু বাঁধতে হবে অপরের সাহায্যে, নইলে নয়। কিন্তু সমবেত উদ্যোগের ঐতিহ্য তো আমাদের নেই। একসঙ্গে কাজ করা অসম্ভব। সমবায় সমিতিগুলো অনেক দিন ধরেই আছে। তবে নামেই প্রধানত শুধু, কাজে নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগ করতে যে চায় না তা নয়, খুবই চায়। কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ করবে খুঁজে পায় না। সমাজ সাহায্য করে না, রাষ্ট্র যে এগিয়ে আসবে তা আসে না। উল্টো বরং বাধা দেয়। শিল্পে বিনিয়োগ বিপজ্জনক, দোকানপাটেই তাই টাকা খাটে। কিন্তু কয়টা আর দোকান চলবে? কিনবে কে? সন্তানসন্ততিতে বিনিয়োগ করে লোকে। আর করে বাড়িতে। বাড়ি তৈরির আগ্রহ খুবই প্রবল। কিন্তু ওই তো সমস্যা। তৈরি থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ পর্যন্ত কোনো পর্যায়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। অন্তরায় পাওয়া যায় বরং পদে পদে। ফলে ঘরের সমস্যা মেটে না কিছুতেই। 

প্রয়োজন গৃহায়নের ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। গ্রামের মানুষ যাতে উচ্ছেদ হয়ে শহরে এসে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সেটা দেখা দরকার। গ্রামে থেকেই যাতে তারা শহরের সুযোগসুবিধা পায়, বিশেষভাবে পায় উপার্জনের পথ- সেদিকটায় দৃষ্টি দেওয়া অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে গ্রামীণ গৃহায়নের কর্মসূচি নেওয়া চাই। অনুরূপভাবে শহরের মানুষের জন্যও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। লোকে যাতে থাকার জায়গা পায় এবং থাকার জায়গা যাতে ঝুপড়ি না হয়ে ঘর হয়। রাষ্ট্র এমনি এমনি এ কাজ করবে না। চাপ দিতে হবে। সেই চাপ রাজনৈতিক চাপ। নইলে ভবিষ্যৎ কী? উন্নতি তো দূরের কথা।

আশার বিষয় যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য, সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে সবার জন্য উন্নয়ন ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।  এর মধ্যে কি মানুষের ন্যূনতম বাসস্থানের প্রশ্নটি আসবে না? পায়ের নিচে এক টুকরো নিজস্ব মাটি, মাথার ওপর নিরাপত্তার ছাউনি মানুষের মৌলিক অধিকার। নতুন বাজেটে সরকার নিশ্চয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

খেতাবের আড়ালে রাজনীতি

ড. মো: মিজানুর রহমান
খেতাবের আড়ালে রাজনীতি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নীরব কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত সমস্যা হলো নামের আগে-পরে বিভিন্ন খেতাব ব্যবহারের প্রবণতা। নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সভা-সমাবেশের পরিচিতিপর্বে আমরা প্রায়ই দেখি—ডক্টর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, আইনজীবী, প্রকৌশলী, আলহাজ্ব, মাওলানা, শায়খ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক কিংবা আরো নানা বিশেষণযুক্ত পরিচয়। এসব খেতাবের একটি অংশ নিঃসন্দেহে যথাযথ শিক্ষা, পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণা, ধর্মীয় সাধনা কিংবা কর্মজীবনের অর্জনের মাধ্যমে প্রাপ্ত। সেসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে সেই যোগ্যতার অধিকারী নন, অথচ জনসমক্ষে বা রাজনৈতিক পরিচয়ে সেই উপাধি ব্যবহার করেন, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জনবিশ্বাস, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক সততার প্রশ্নে পরিণত হয়।

আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, এই প্রবণতার পেছনে শুধু মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাই নয়, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সংকটও কাজ করে। যেসব মানুষ নিজেদের প্রকৃত কাজ, যোগ্যতা, জ্ঞান, নেতৃত্ব বা জনসেবার মাধ্যমে সমাজে পরিচিতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন, তাদের একটি অংশ খেতাবকে শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তারা মনে করেন, নামের আগে ডক্টর কিংবা অধ্যাপক লিখে দিলে মানুষ তাদের বেশি সম্মান করবে, বেশি শিক্ষিত ভাববে কিংবা অধিক যোগ্য মনে করবে। অর্থাৎ প্রকৃত যোগ্যতার পরিবর্তে একটি প্রতীকী পরিচয়কে সামনে এনে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মপ্রবঞ্চনা, আবার অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।

প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হওয়ার কথা তার কর্ম দ্বারা। একজন শিক্ষক শিক্ষকতার মাধ্যমে পরিচিত হবেন, একজন আইনজীবী তার পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে, একজন চিকিৎসক তার চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে এবং একজন রাজনীতিবিদ তার জনসেবার মাধ্যমে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নিজের কাজ ও অবদানের পরিবর্তে একটি খেতাবকে সামনে এনে সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে চান, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট নন? তিনি কি তার বাস্তব যোগ্যতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন? তিনি কি জনগণকে এমন একটি ধারণা দিতে চাইছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?

উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত তাদের উপাধির চেয়ে কর্মকে বেশি গুরুত্ব দেন। অ্যাঞ্জেলা মের্কেল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। বারাক ওবামা আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। মার্গারেট থ্যাচার রসায়নে শিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু তারা জনগণের কাছে পরিচিত হয়েছেন তাদের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতার মাধ্যমে। ভোটাররা তাঁদের সামনে ডক্টর বা প্রফেসর শব্দটি শুনে মুগ্ধ হননি; তারা মূল্যায়ন করেছেন তাদের কর্মফল।

অনেক উন্নত দেশে ভুয়া ডিগ্রি বা বিভ্রান্তিকর উপাধি ব্যবহার রাজনৈতিক জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সেখানে জনগণ মনে করে, যে ব্যক্তি নিজের পরিচয় সম্পর্কে পুরো সত্য বলেন না, তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পুরো সত্য বলবেন—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? ফলে উপাধি নিয়ে মিথ্যাচারকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, নেতৃত্বের অযোগ্যতার লক্ষণ হিসেবেও দেখা হয়।

বাংলাদেশে অবশ্য সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে মানুষ এখনও নামের আগে-পরে যুক্ত বিশেষণ ও খেতাব দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়। ফলে অনেকেই রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় এসব উপাধি ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা কতটা বাস্তব? একজন ব্যক্তি হয়তো কিছু মানুষের কাছে নিজেকে বেশি শিক্ষিত বা অভিজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু যখন তার পরিচয়ের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তখন সেই সাময়িক লাভ বহু গুণ বেশি ক্ষতিতে পরিণত হবে। কারণ মানুষের বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করে সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা। বিভিন্ন ব্যক্তি দেশি-বিদেশি অস্বীকৃত, অননুমোদিত বা তথাকথিত ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পিএইচডি সনদ সংগ্রহ করে নিজেদের নামের আগে ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করছেন বলে নানা সময়ে অভিযোগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং কখনো কখনো চাকরি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও এসব উপাধি ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে একদিকে প্রকৃত গবেষণা ও দীর্ঘ একাডেমিক সাধনার মাধ্যমে অর্জিত ডক্টরেট ডিগ্রির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে সমাজে যোগ্যতা ও অর্জন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণার জন্ম দেয়। যে ডিগ্রি অর্জনের জন্য সাধারণত বছরের পর বছর গবেষণা, তত্ত্বাবধান, মূল্যায়ন ও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, সেটিকে যদি অর্থ, প্রভাব বা কৃত্রিম উপায়ে অর্জিত বলে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা শুধু একাডেমিক অসততাই নয়; বরং সমাজে সত্য, মেধা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কোনো সমাজে যখন প্রতীক বাস্তবতার চেয়ে বেশি মূল্য পেতে শুরু করে, তখন সেই সমাজে মেধা, পরিশ্রম ও সততার গুরুত্ব কমতে থাকে। মানুষ তখন বাস্তব অর্জনের চেয়ে বাহ্যিক সাজসজ্জাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ভুয়া কিংবা অতিরঞ্জিত খেতাবের সংস্কৃতি ঠিক এই বিপজ্জনক প্রবণতাকেই উৎসাহিত করে।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বহু বছর ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করেছেন। এলাকাবাসী স্নেহবশত তাকে ডাক্তার সাহেব বলে ডাকে। এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু তিনি যদি নিজের ভিজিটিং কার্ড, রাজনৈতিক পোস্টার বা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে ডাক্তার লিখতে শুরু করেন, তাহলে তিনি কেবল একটি জনপ্রিয় ডাকনাম ব্যবহার করছেন না; বরং এমন একটি যোগ্যতার দাবি করছেন, যা হয়তো তার নেই। একইভাবে কেউ স্বল্প সময় শিক্ষকতা করেছেন বলে সমাজ তাকে অধ্যাপক বলে সম্বোধন করতে পারে। কিন্তু সেই সামাজিক সম্বোধনকে আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এ বিষয়ে গভীর শিক্ষা রয়েছে। ইসলামে সততা শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনে নয়, পরিচয়ের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য। একজন মানুষ যা নন, নিজেকে তা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামনে নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করা, অহংকার করা এবং মিথ্যা মর্যাদা দাবি করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। ইসলামী ঐতিহ্যে প্রকৃত জ্ঞানীরা নিজেদের মর্যাদা প্রচার না করে বরং বিনয় প্রদর্শন করতেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের মতো মনীষীরা তাঁদের জ্ঞান ও চরিত্রের কারণে সম্মানিত হয়েছেন; নিজেদের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ পরিচয় নির্মাণ করে নয়।

আজকের বাস্তবতায় খেতাবের অপব্যবহার কেবল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক আস্থার সংকট তৈরি করে। কারণ সমাজে যখন মানুষ দেখতে পায় যে প্রকৃত যোগ্যতা ছাড়াও নানা উপাধি ব্যবহার করে মর্যাদা অর্জন সম্ভব, তখন তারা কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা, শিক্ষা ও আত্মোন্নয়নের পরিবর্তে শর্টকাট খোঁজার দিকে ঝুঁকে পড়ে। একজন তরুণ ছাত্র তখন ভাবতে পারে—ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে ডিগ্রির ভাবমূর্তি অর্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদীয়মান রাজনীতিক ভাবতে পারে—জনসেবার চেয়ে পরিচয়ের অলংকারই বেশি কার্যকর। এটি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর মানসিকতা।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার সামাজিক পার্থক্যকে ক্ষয় করে। মানুষ যখন প্রতিদিন অসত্য, অতিরঞ্জন ও কৃত্রিম পরিচয় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সততা আর বিশেষ কোনো গুণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। মিথ্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় সাধারণত এভাবেই শুরু হয়—বড় অপরাধ দিয়ে নয়, ছোট ছোট অসততাকে স্বাভাবিক করে তোলার মাধ্যমে।

অথচ একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার খেতাব নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ শেষ পর্যন্ত তার নামের আগে কী লেখা আছে তা মনে রাখে না; তারা মনে রাখে তিনি মানুষের জন্য কী করেছেন। দুর্যোগে তিনি কোথায় ছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার ছিলেন, জনগণের সমস্যা সমাধানে কতটা আন্তরিক ছিলেন—এসবই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয়।

যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হন, তবে তার জ্ঞানই তাকে পরিচিত করবে। যদি তিনি সত্যিকারের আইনজীবী হন, তবে তার পেশাগত সাফল্যই তাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। যদি তিনি প্রকৃত শিক্ষক হন, তবে তার ছাত্ররাই তার সম্মানের সাক্ষ্য দেবে। আর যদি তিনি সত্যিকারের জননেতা হন, তবে জনগণের ভালোবাসাই হবে তার সবচেয়ে বড় খেতাব। সেখানে কৃত্রিম উপাধির কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা নিজেদের অর্জনের চেয়ে বেশি বড় পরিচয় প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন, তারা শেষ পর্যন্ত সম্মানের চেয়ে সমালোচনাই বেশি অর্জন করেছেন। কারণ মানুষ ভুলে যেতে পারে একজন ব্যক্তি কত বড় ডিগ্রিধারী ছিলেন, কিন্তু মানুষ কখনো ভুলে যায় না কে সৎ ছিল আর কে ছিল অসৎ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরো পরিণত করতে হলে এই খেতাবনির্ভর মর্যাদাবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রার্থীদের পরিচয় ও যোগ্যতার বিষয়ে কঠোর যাচাই-বাছাই করা। গণমাধ্যমের উচিত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জনগণকে সত্য জানানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তরুণদের শেখানো যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার চরিত্র। আর নাগরিক সমাজের উচিত খেতাব নয়, কাজকে মূল্যায়ন করা।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নামের আগে ডক্টর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ বা আইনজীবী লেখা যতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যক্তি সত্যবাদী কি না। কারণ খেতাব সম্মান দাবি করতে পারে, কিন্তু সততা সম্মান অর্জন করে। খেতাব মানুষকে সাময়িকভাবে বড় দেখাতে পারে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে প্রকৃত অর্থে বড় করে তোলে।

অতএব, খেতাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মর্যাদার এই সংস্কৃতিকে পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ পরিচয়ের সাজসজ্জা দিয়ে বড় হয়; নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ সত্য, যোগ্যতা, শ্রম ও সততার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান অনেকাংশে নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে

আহসান হাবিব বরুন
সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা, প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রের সীমান্ত একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা তারও ঊর্ধ্বে। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক রীতিনীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ ইন’ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সীমান্ত সংকট নতুন নয়। ভারতের তরফে সীমান্ত হত্যা, গুলি, আটক, নির্যাতন এবং বিভিন্ন সময়ে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পুশ ইন বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এখানে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, সরাসরি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠ। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব মানুষ মর্যাদা ও অধিকারে সমান। ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে খামখেয়ালি গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করতে হলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

আবার আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি নন-রিফাউলমেন্ট (Non-Refoulement) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যায় না, যেখানে তার নিরাপত্তা, অধিকার বা আইনগত অবস্থান মারাত্মকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সমাধান হতে হবে যৌথ যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; সীমান্তে একতরফাভাবে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বর্তমান অবস্থানকে আরো বিব্রতকর করে তুলেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সমালোচনা শুধু বাংলাদেশ থেকে আসছে না; ভারতের ভেতর থেকেও আসছে। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Association for Protection of Democratic Rights (APDR) প্রকাশ্যে বিএসএফের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে এবং একে মানবাধিকারবিরোধী ও অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটি ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রশ্ন তুলেছে—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়?

এই সমালোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কারণ অভিযোগগুলো কোনো বিদেশি সরকার বা ভারতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে আসেনি; এসেছে ভারতের নিজস্ব নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর কাছ থেকে। ফলে এটি আর কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

এদিকে ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু সীমান্তে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, যা সেই মূল্যবোধের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—ভারত কি তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারছে?

এখানে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশ এখন আর নব্বই দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই বাংলাদেশ নয়, যাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুর্বল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। গত দুই দশকে অর্থনীতি, অবকাঠামো, মানবসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নৌ-বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। ফলে ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুরোনো মানসিকতা বা একতরফা প্রভাব বিস্তারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালনার চেষ্টা করে তবে তা কৌশলগতভাবে কখনোই ফলপ্রসূ হবে না।

ভারতের উপলব্ধি করে জরুরি যে,প্রতিবেশী সম্পর্ক কখনো আধিপত্যের ভিত্তিতে টিকে থাকে না। ইতিহাস বলে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সমতা। সুতরাং ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীল নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক নীতিগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির আরেকটি দিক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সীমান্তে ভারতের অস্বাভাবিক তৎপরতা এমন এক সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে।

সময়গত এই মিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। যদিও কোনো কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সমার্থক নয়। আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব।

যদি ভারতে সত্যিই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো অসন্তোষ থেকে থাকে, তাহলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও  সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র। তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হবে ঢাকার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাজধানীর প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়।

এখানে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও উপেক্ষা করা যায় না। বিগত সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতরে বিস্তর বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, তৎকালীন সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন এক নীতি অনুসরণ করেছিল, যেখানে পারস্পরিকতার তুলনায় একতরফা ছাড় ও সুবিধা প্রদানের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সেই বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অধিক ভারসাম্য ও বহুমাত্রিকতার প্রত্যাশা ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে—এটাই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পথ।

এখানে আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্যও সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্মম শিক্ষা। তাই শুধু প্রতিরোধ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তথ্য-প্রমাণসহ বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ নথিভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগ নয়, তথ্যই শক্তি। অভিযোগ নয়, প্রমাণই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আর নীরবতা কখনো মর্যাদা রক্ষা করে না; বরং অনেক সময় অন্যায়কে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশ সংঘাত চায় না, উত্তেজনাও চায় না। বাংলাদেশ চায় একটি মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ কখনো নীরব আনুগত্য নয়। বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

আজকের বাস্তবতায় ভারতের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করা। কারণ ইতিহাসের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো—যে রাষ্ট্র সময়মতো পরিবর্তনকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই কৌশলগত ক্ষতির মুখোমুখি হয়।


পরিশেষে বলা যায়, পুশ ইন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল সীমান্তের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে শক্তির প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের করণীয়ও স্পষ্ট। সীমান্তে সতর্কতা ও প্রতিরোধ যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয়, সুসংগঠিত এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু তার ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান গ্রহণের মধ্যেও নিহিত। সুতরাং পুশ ইনের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিরোধ নয়, প্রতিবাদও করতে হবে; এবং সেই প্রতিবাদ হতে হবে যুক্তি, প্রমাণ, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় আত্মমর্যাদার দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব যেকোনো মূল্যে সীমান্ত সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করতেই হবে। 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]