• ই-পেপার

বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত ও অনুমতি প্রসঙ্গ

মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষ ব্যক্তির জন্য পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

একজন মুমিন সুস্থতা, দীর্ঘ জীবন ও নেক আমলের তাওফিক কামনা করে। তবে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় এবং দুনিয়ার সব সম্পর্ক, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ব্যস্ততা তার কাছে ম্লান হয়ে যায়। সেই সংকটময় সময়ে একজন ঈমানদার বান্দার সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে ওঠে আল্লাহর ক্ষমা, রহমত এবং তাঁর নৈকট্য লাভ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে পঠিতব্য হৃদয়স্পর্শী এমন দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে দুনিয়ার প্রতি মোহ নয়; বরং মহান রবের সান্নিধ্য ও আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তা হলো-

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَالْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ারহামনী ওয়া আলহিক্বনী বির রফিক্কিল আলা।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমাকে সর্বোচ্চ বন্ধুর সঙ্গ পাইয়ে দিন।’

হাদিস : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুল (সা.)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় এই দোয়া পড়তে শুনেছি। তখন তিনি আমার ওপর ভর করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৭৪)

অন্য হাদিসে আরেকটি দোয়ার কথা এসেছে। তা হলো- 

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।


অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাঁর জন্য সব ক্ষমতা এবং তার জন্য সব প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই। 


হাদিস : আবু সায়িদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ মহান) তখন মহান রব তার কথা সত্যায়ন করে বলেন, ‘আমি ছাড়া উপাস্য নেই এবং আমিই মহান।’

অতঃপর যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’

যখন সে বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ (একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই) তখন আল্লাহ বলেন, ‘একমাত্র আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ও আমার কোনো অংশীদার নেই।’

আর সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ (তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর জন্য সব ক্ষমতা, তাঁর জন্য সব প্রশংসা) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমার জন্য সব ক্ষমতা ও প্রশংসা।

সে যখন বলে, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই) তখন আল্লাহ বলেন, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি ছাড়া কারো কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় এ দোয়াটি পড়বে অতঃপর মারা যাবে তাকে জাহান্নাম স্পর্ষ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৩০)

মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইসলাম ও আরব সভ্যতার প্রদর্শনী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইসলাম ও আরব সভ্যতার প্রদর্শনী
সংগৃহীত ছবি

বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সভ্যতার মিলনমেলায় পরিণত হওয়া মেক্সিকো বিশ্বকাপ ঘিরে ইসলাম ও আরব সভ্যতার সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ’। সংস্থাটি ‘অনুপ্রেরণাদায়ক সভ্যতা’ শীর্ষক এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছে, যার মূল লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে আগত দর্শনার্থীদের কাছে ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ, আরব সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং মুসলিম সভ্যতার অবদানকে পরিচিত করে তোলা।

প্রদর্শনীটি বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এতে রয়েছে ১১টি বিশেষায়িত প্যাভিলিয়ন, যেখানে মডেল, বই, প্রকাশনা, তথ্যচিত্র ও স্মারক উপহারের মাধ্যমে ইসলামী ও আরব সভ্যতার ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়েছে।

দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে নানা ইন্টারেক্টিভ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। তারা আরববিশ্বের ঐতিহ্যবাহী পোশাক—থোব, শেমাগ ও বিশত পরিধান করে ছবি তুলতে পারবেন। পাশাপাশি মেহেদির নকশা, হিজাব পরিধানের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আরব ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো, দুই পবিত্র মসজিদকে নিবেদিত বিশেষ প্যাভিলিয়ন। এখানে দর্শনার্থীরা মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর মডেল, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র এবং আধুনিক সম্প্রসারণ কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন। বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবছর লাখো হাজি ও ওমরাহ পালনকারীর জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র।

আরব আতিথেয়তার অনন্য ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ঐতিহ্যবাহী আরবীয় তাঁবু। সেখানে আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হচ্ছে আরবি কফি, খেজুর ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী দিয়ে। ফলে দর্শনার্থীরা শুধু তথ্যই পাচ্ছেন না, বরং আরব সংস্কৃতির আন্তরিকতা ও অতিথিপরায়ণতার স্বাদও গ্রহণ করছেন। প্রদর্শনীর পরিধি আরো বিস্তৃত করতে মেট্রো টানেলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ তথ্যকেন্দ্র। সেখানে হাজার হাজার বিনামূল্যে মেট্রো মানচিত্র বিতরণের পাশাপাশি ইসলাম ও আরব সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ প্রকাশনাও সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সাতটি সাংস্কৃতিক তথ্যকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি দর্শনার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং ইসলামী সভ্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরছেন।

মরুর বুকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
মরুর বুকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম
সংগৃহীত ছবি

সভ্যতার ইতিহাসে কিছু দৃশ্য আছে, যা শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। পৃথিবীর নানা প্রাচীন সমাজে নারীর অবস্থান ছিল এমনই এক প্রশ্ন। কোথাও তিনি উত্তরাধিকারবঞ্চিত, কোথাও সামাজিক মর্যাদাহীন, কোথাও বা শুধু পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছার সম্প্রসারিত ছায়া। মানবসভ্যতা যখন নিজের শক্তি ও সাম্রাজ্যের অহংকারে মগ্ন, তখনো নারীকে মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সে ছিল বিস্ময়করভাবে কৃপণ। এই বাস্তবতার ভেতরেই ইসলামের আবির্ভাব হয়। ইসলাম প্রথমেই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দেয়নি, কোনো সামাজিক আন্দোলনের ভাষাও ব্যবহার করেনি।

সে মানুষের পরিচয় নতুন করে নির্ধারণ করেছে। বলেছে, মানুষ তার লিঙ্গের কারণে মর্যাদাবান নয়; মর্যাদাবান তার মানবত্বের কারণে। এই একটি ধারণা আরবের মরুভূমিতে যেমন নতুন ছিল, তেমনি মানবসভ্যতার বৃহত্তর ইতিহাসেও ছিল অসাধারণ। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে মর্যাদার ভিত্তি নারী কিংবা পুরুষ হওয়া নয়; মানুষ হওয়া। ইসলামের নারী-দর্শনের শিকড় তাই কোনো বিশেষ সুবিধা বা দয়ার দর্শনে নয়, বরং মানবমর্যাদার দর্শনে প্রোথিত। কোরআনের আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৫)

এই আয়াত ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের আধ্যাত্মিক মর্যাদার এক অনন্য ঘোষণা। মানুষের মূল্যায়ন এখানে লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়, ঈমান, চরিত্র ও আমলের ভিত্তিতে।

ইসলাম নারীকে করুণা করেনি; তাকে সম্মান করেছে। এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য আছে। করুণা আসে শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে, সম্মান আসে যথামর্যাদার স্বীকৃতি থেকে।
ভাবলে বিস্ময় জাগে, যে সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম অনেকের কাছে অপমানের কারণ ছিল, সেই সমাজেই কোরআন মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ‘জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮-৯)

ইতিহাসে অনেক আইন এসেছে, অনেক শাস্তি এসেছে; কিন্তু মানুষের মানসিকতা বদলে দেওয়ার জন্য কখনো কখনো একটি প্রশ্নই যথেষ্ট হয়। ইসলামের সেই প্রশ্ন আরবের বুকে কন্যাশিশুর জন্য নতুন ভোরের সূচনা করেছিল। কন্যার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু একটি সামাজিক সংস্কার ছিল না; এটি ছিল মূল্যবোধের পুনর্নির্মাণ। যে শিশুর জন্ম একসময় লজ্জার কারণ বলে বিবেচিত হতো, ইসলাম তাকে জান্নাতের পথের সহযাত্রীতে পরিণত করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তানের যথাযথ লালন-পালনকে পরকালের মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইতিহাসের ভাষায় এটি ছিল এক নীরব, কিন্তু গভীর বিপ্লব।

মানুষের জীবনে প্রথম আশ্রয় হলো মায়ের কোল। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় ‘মা’ শব্দটির সঙ্গে এক ধরনের কোমলতা জড়িয়ে আছে। ইসলাম এই কোমলতাকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেনি; একে সামাজিক দর্শনের অংশে পরিণত করেছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এই হাদিসের ভেতরে শুধু আবেগ নয়, একটি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে। যে জাতি মাকে সম্মান করতে শেখে, সে জাতি তার ভবিষ্যেক সম্মান করতে শেখে। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একটি প্রজন্ম নির্মাণ করেন। ইতিহাসের অনেক মহান মানুষের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁদের চরিত্রের প্রথম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে মায়ের স্নেহ, ত্যাগ ও শিক্ষার মাধ্যমে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ইসলামের অবস্থান ছিল যুগান্তকারী। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক সমাজ ছিল, যেখানে শিক্ষা ছিল একটি বিশেষ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার। ইসলাম সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল। কোরআনের প্রথম আহবানই ছিল—‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)

এই আহবান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের উদ্দেশে ছিল না; ছিল সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে। তাই ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, নারীরা শুধু জ্ঞানের গ্রহীতা ছিলেন না; তাঁরা জ্ঞানের ধারক ও বাহকও ছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, গবেষণা ছিল, শিক্ষা ছিল, অবদান ছিল। জ্ঞানের জগৎ কোনো লিঙ্গের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ইসলাম কখনো কল্পনা করেনি। ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানের অঙ্গনে নারীর উপস্থিতি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না; বরং ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞানচর্চার অঙ্গন নারী-পুরুষ উভয়ের পদচারণে সমৃদ্ধ ছিল। এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য। সে নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বানাতে চায়নি, আবার পুরুষের অধীনস্থ ছায়াও বানায়নি। সে নারীকে সমাজের সহযাত্রী হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)

এই একটি আয়াত ইসলামী সমাজদর্শনের গভীরতম সত্যগুলোর একটি ধারণ করে। এখানে সম্পর্কের ভাষা আধিপত্যের নয়, সহযোগিতার; প্রতিযোগিতার নয়, অংশীদারির। পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিও একই রকম মানবিক। কোরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি)

আবার বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি নারীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করার এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম)

এই বক্তব্যগুলোকে শুধু পারিবারিক নীতিকথা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আসলে একটি সভ্যতার নৈতিক মানদণ্ড। কারণ যে সমাজ দুর্বলকে সম্মান করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।

আজকের পৃথিবীতে নারী অধিকার নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়। আইন বদলায়, স্লোগান বদলায়, তত্ত্ব বদলায়। কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন খুব বেশি বদলায় না। মানুষ সম্মান চায়, নিরাপত্তা চায়, ভালোবাসা চায়, স্বীকৃতি চায়। অতএব ১৪ শ বছরেরও বেশি সময় আগে মরুর বুকে আবির্ভূত সেই সভ্যতাই আমাদের ভিত্তি, যা নারীকে তার যথাযথ মূল্যায়ন করেছে।

পাপ সংঘঠিত হলে অনুতপ্ত হওয়া জরুরি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
পাপ সংঘঠিত হলে অনুতপ্ত হওয়া জরুরি
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহর মনোনীত বিশেষ বান্দা নবী-রাসুলরা ছাড়া মানুষ মাত্রই গুনাহগার। তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে গুনাহ করে ফেলে। কিন্তু একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো, সে ভুল বুঝতে পারলে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে কিছু মানুষ পাপ করার পর অনুশোচনা তো করেই না, বরং যারা তাকে সত্যের দিকে আহবান করে তাদেরই দোষারোপ করে, অপমান করে, এমনকি হুমকি দেয়। কোরআনের ভাষ্য মতে, এটি অহংকার, হৃদয়ের কঠোরতা এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের মতো গুরুতর আত্মিক রোগের লক্ষণ। কারণ অধিক পরিমাণ আত্মাভিমান বা আত্মমুগ্ধতার কারণে মানুষ হেদায়েত থেকে দূরে সরে যায়।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় করো, তখন অহংকার তাকে গুনাহর দিকে আকর্ষণ করে, জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট আর তা কতই না জঘন্য আবাসস্থল!’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০৬)

এই আয়াতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যাকে তার ভুলের ব্যাপারে সতর্ক করা হলে সে তা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে আরো বেশি গোঁড়ামি ও পাপাচারে লিপ্ত হয়। অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে সে নিজের অবস্থানকে জোরদার করার চেষ্টা করে, যা বান্দার জন্য ধ্বংসাত্মক। কেননা শয়তান এ রকম অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল, সে অমান্য করল ও অহংকার করল, কাজেই সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩৪)

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার না করে উল্টো অন্যদের দোষারোপ করে, তখন সে মূলত শয়তানি চরিত্রের অনুসরণ করছে। কারণ অহংকার মানুষকে আত্মসমালোচনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যা তাকে কখনোই হেদায়েতের আলো দেখতে দেয় না। বরং তার অহংকারের অন্ধকার তাকে আরো বিভ্রান্তির দিকে ধাবিত করে। সে সত্যের পক্ষে ডাকা মানুষগুলোকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। যেমনটা করেছিল  ফেরাউন।

মুসা (আ.) তাকে সত্যের দাওয়াত দিলে সে নিজের ভুল তো স্বীকার করেইনি; বরং মুসা (আ.)-কেই দোষারোপ করেছে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। পরবর্তীতে যখন মুসা (আ.) সত্যতা প্রকাশ পেয়েছে, তখনো সে সবকিছু বুঝেও ফিরে আসেনি; বরং উল্টো হুমকি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ফেরাউন বলল, ‘আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রধান যে তোমাদের জাদু শিখিয়েছে। কাজেই আমি অবশ্য অবশ্যই তোমাদের হাত আর পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব আর খেজুরগাছের শাখায় তোমাদের অবশ্য অবশ্যই শূলে চড়াব আর তখন তোমরা অবশ্য অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার আজাব বেশি শক্ত আর বেশি স্থায়ী।’
(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৭১)

এমনিভাবে শুআইব (আ.)-কেও তার জনপদের লোকেরা সত্য গ্রহণ না করে উল্টো জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৮)। নুহ (আ.)-কে  তার জাতি প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল। (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১১৬)

এ থেকে বোঝা যায়, সত্যের মুখোমুখি হয়ে হুমকি দেওয়া অত্যাচারী ও পথভ্রষ্টদের পুরনো স্বভাব। বর্তমান যুগেও কেউ এ রকম করলে বুঝে নিতে হবে, সেও তাদের অনুসরণ করছে। পাপ হয়ে যাওয়ার পর তাওবা না করে উল্টো তার ওপর অহংকার করা বা মিথ্যা ও ভ্রান্ত যুক্তি দিয়ে তা বৈধ করার অপচেষ্টা করা জঘন্য অপরাধ। এই প্রবণতার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। কারণ তারা মিথ্যা বলত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০)

যখন মানুষ বারবার পাপ করে এবং অনুতপ্ত না হয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে যায়। একসময় সে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখতেও অক্ষম হয়ে পড়ে। পাপের পর অনুশোচনা না করে উল্টো দোষারোপ করে, উপদেশদাতাকে অপমান করে কিংবা হুমকি দেয়। এটা কোনো সাধারণ দুর্বলতা নয়; এটি অহংকার, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং হৃদয়ের কঠিনতার ভয়াবহ লক্ষণ। একজন মুমিনের করণীয় হলো নিজের ভুল স্বীকার করা, তওবা করা এবং সত্যকে গ্রহণ করার বিনয় অর্জন করা। কারণ আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের ভালোবাসেন, কিন্তু অহংকারী ও জালিমদের ভালোবাসেন না।