• ই-পেপার

সরকারের ১০০ দিন : প্রধানমন্ত্রীর অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

জিল্লুর রহমান
শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়

বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।

বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?

আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।

বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।

দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।

২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান

বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?

আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?

বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।

বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।

৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।

অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?

৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন

রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।

পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।

কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।

দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?

বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে।  আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।

বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।

কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন

মো. নুরে আলম
শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন
সংগৃহীত ছবি

গত ৯ মে শপথ নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। কথাগুলো খুব ছকে বাঁধা ছিল না, বরং ছিল উসকানিমূলক—‘অনুপ্রবেশকারীদের’ পুলিশ বা আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়ার বদলে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মঞ্চের সেই হুংকারের প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি। মে মাসের শেষ সপ্তাহ পেরোতেই আমরা দেখলাম, বিএসএফ নারী-শিশুসহ নানা বয়সের মানুষকে দল বেঁধে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘শূন্যরেখা’য় ঠেলে দিচ্ছে। রাতারাতি যেন শুরু হলো মানুষ খেদানো উৎসব।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, যশোর, মহেশপুর থেকে শুরু করে উত্তরের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় কিংবা লালমনিরহাটের সীমান্তগুলোতে এখন টানটান উত্তেজনা। তবে এবার একটা নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিজিবি কেবল কড়া নজরদারিই করছে না, স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে অভেদ্য এক প্রতিরোধ। গত কয়েক দিনেই, বিশেষ করে জুনের প্রথম সপ্তাহে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বড় ধরনের পুশ ইনের অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি। শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা হতভাগ্য মানুষগুলোকে হয় বিএসএফ বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে নিয়েছে, নয়তো বিজিবির ‘পুশ ব্যাক’-এর মুখে পড়েছে।

কিন্তু এই ‘পুশ ইন’ তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ এক পুরোনো রাজনৈতিক ব্যাধির পুনরাবৃত্তি। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট যখন ক্ষমতায় এলো, তখন থেকেই এই অমানবিক খেলা শুরু। ২০০২-০৩ সালে সেটা রূপ নিয়েছিল চরম উন্মাদনায়, জন্ম হয়েছিল ‘পুশ ইন’ শব্দটির। সেবার রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শূন্যরেখায় পড়ে থাকা মানুষের ছবিগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঝড় তুলেছিল। এরপর ২০০৪ সালে ইউপিএ জোট আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু ২০১৪ সালে এনডিএ এবং ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি ক্ষমতায় ফেরার পর এই ছাইচাপা আগুন আবার জ্বলে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে পুশ ইন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে দেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিলেন জন্মসূত্রে খাঁটি ভারতীয় নাগরিক!

ঘটনা শুধু সংখ্যায় আটকে নেই, মানুষের পরিচয়ের ধরনও পাল্টেছে। গত বছরের মে মাসে পুশ ইনের যে ‘নতুন মাত্রা’ দেখা গেল, তা রীতিমতো ভয়াবহ। আগে সাধারণত বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ঠেলে দেওয়া হতো। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা এবং খোদ ভারতের গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে আনা হতভাগ্য মানুষেরা।

এসব মানুষের পেছনের গল্পগুলো শুনলে সভ্যতার মাথা হেঁট হয়ে আসে। ওড়িশার ৭৩ বছর বয়সী হিন্দিভাষী শেখ আবদুর জব্বার। গত ২৫ ডিসেম্বর কনকনে শীতের রাতে পরিবারের ১৪ জন সদস্যসহ তাকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। একইভাবে গত বছর ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিকে স্বামী-সন্তানসহ রাতের আঁধারে পুশ ইন করা হয়। পরে খোদ ভারতীয় আদালতের নির্দেশে ৫ ডিসেম্বর তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ভারত। আর আসামের নলবাড়ীর ৭০-ঊর্ধ্ব সাকিনা বিবির ঘটনা তো পুরো বিশ্বের সামনে ভারতের চরম অমানবিক রূপটা উন্মোচন করে দিয়েছে। থানায় ‘একটা সই’ করার কথা বলে তাকে তুলে নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। এই ৪ জুন (২০২৬) ভারতের ‘স্ক্রোল’ পত্রিকাও প্রতিবেদন ছেপেছে—এক বছর পার হলেও সাকিনা বিবি এখনো ঢাকার কোনো এক বস্তিতে আটকে আছেন, নিজের ভিটামাটিতে ফিরতে পারেননি।

কী অদ্ভুত এক রাষ্ট্রযন্ত্র! নিজের দেশের নাগরিককে কেবল ধর্মীয় বা ভাষাগত পরিচয়ের কারণে রাতের অন্ধকারে অন্য দেশের ঘাড়ের ওপর ফেলে দিচ্ছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রাকৃতিকভাবে কোনো দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর দিয়ে বিভক্ত নয়। একই পরিবারের এক ভাইয়ের বাড়ি ভারতে, অন্য ভাইয়ের বাংলাদেশে—এমন জনপদ এখানে ভূরি ভূরি। সেখানে কেউ অবৈধ যাতায়াত করলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বদলে রাষ্ট্র যখন নিজেই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে আইনি নয়, বরং ঘোরতর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।

ভারতের এই আচরণের কঠোর সমালোচনা করে খোদ তাদেরই স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘ফ্রন্টলাইন’ লিখেছে, ‘সীমান্ত নিয়ে বাগাড়ম্বর নির্বাচনে জয় এনে দিতে পারে এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের জন্য জনদাবিকে তুষ্ট করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ নিছক প্রতিবেশী নয়। দেশের অভ্যন্তরে হাততালি কুড়ানোর জন্য প্রান্তজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির এই সীমান্তনীতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষার ঝুঁকি তৈরি করে।’

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য। পুশ ইনের নামে ভারত আসলে দ্বিগুণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান অনুযায়ী, ‘কোনো মানুষকে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা বা সন্দেহবশত তার ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করে শূন্যরেখায় ফেলে রাখা চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ; রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও সম্মান কেড়ে নিতে পারে না।’

তাহলে সমাধান কোথায়? অতীত বলছে, কেবল সামরিক প্রতিরোধ দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, অর্থাৎ বিজিবির কড়া নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা—অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং এটি চালিয়ে যেতে হবে। তবে ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য আমাদের কূটনৈতিক টেবিলে শক্তভাবে বসতে হবে।

আন্তর্জাতিক মহলকে তথ্য-প্রমাণসহ জানাতে হবে, ভারত কিভাবে দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। পুশ ইনের শিকার হওয়া প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বলি যেন বাংলাদেশকে হতে না হয়, সে জন্য ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানজনক, গায়ের জোরের নয়। রাতের অন্ধকারে নিরীহ নারী-শিশু আর বৃদ্ধদের সীমান্তে ঠেলে দিয়ে কেউ যদি ভাবে এটা বীরত্ব, তবে বলতে হয়, সেই রাষ্ট্র তার মানবতার শেষ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অমানবিক পুশ ইন অবিলম্বে বন্ধ হোক, সেটাই এখন ভূ-রাজনৈতিক এবং মানবিক—উভয় দিক থেকেই সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক

প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই

হাসান আলী
প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রবীণ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরো বাড়বে। সাধারণত আমরা প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করি তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়—প্রবীণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা। আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ চাকরি বা পেশাগত জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েন। অথচ তাদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ, কর্মক্ষম এবং কাজ করার আগ্রহ রাখেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ কিংবা দক্ষ কারিগর তাঁর কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে ঘরে বসে থাকেন। এই অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার জন্যই এক ধরনের ক্ষতি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় দেশে “এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল” নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সার্ভার গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আগ্রহী প্রবীণরা সেখানে নিজেদের তথ্য নিবন্ধন করবেন। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, বিশেষ দক্ষতা, কাজের ধরন, সময়ের প্রাপ্যতা এবং প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক উল্লেখ থাকবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী সেই প্ল্যাটফর্ম থেকে দক্ষ মানুষ খুঁজে নিতে পারবে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে দক্ষ জনশক্তির অপচয় রোধ করা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত কারণে কয়েক দিনের জন্য ছুটিতে গেলেন। প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্রুত একজন বিকল্প শিক্ষক প্রয়োজন হলো। “এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল” থেকে আশেপাশে বসবাসকারী একজন অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষককে অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হবে না এবং প্রবীণ শিক্ষকও তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন।

একইভাবে একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময়ে পরামর্শ সেবা দিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী আইনি পরামর্শ দিতে পারেন। কর বিশেষজ্ঞ কর-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিতে পারেন। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার বা কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনভিত্তিক সেবা প্রদান করতে পারেন। এমনকি প্রবীণ কেয়ারগিভার বা কাউন্সেলরও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বর্তমান সময়ে আমরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ডাকি, খাবার অর্ডার করি কিংবা বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করি। একইভাবে “এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল” একটি অনলাইন সেবামাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতার মানুষ খুঁজবে, আর প্ল্যাটফর্মটি কাছাকাছি অবস্থানরত উপযুক্ত প্রবীণ বিশেষজ্ঞের তথ্য দেখাবে। অনেকটা উবারে গাড়ি ডাকার মতোই সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা।

এই উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্বও অনেক। কর্মক্ষম প্রবীণদের একটি বড় অংশ অবসর জীবনে একাকীত্ব, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার অনুভূতিতে ভোগেন। তারা যখন তাদের অভিজ্ঞতা সমাজের কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন, তখন আত্মমর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে বাস্তব জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি লাভজনক হতে পারে। দেশের বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ প্রবীণ মানুষ আবার আংশিকভাবে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলে তাদের ব্যক্তিগত আয় বাড়বে, পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণেও এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আজকের বাংলাদেশে যখন দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তখন প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে অবহেলা করা নয়, বরং যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং প্রবীণ সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে “এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল” বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

প্রবীণ মানুষ সমাজের বোঝা নন; তারা অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারকে কাজে লাগাতে পারলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাই উপকৃত হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অপচয় নয়, বরং তার সর্বোত্তম ব্যবহারই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিন

বাংলাদেশের সাড়ে তিন মাস বয়সি সরকারের কার্যকাল দেখে সামনে পড়ে থাকা অবশিষ্ট চার বছর সাড়ে আট মাস মেয়াদে তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, তা সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত অল্প সময়। শেখ হাসিনার অধীনে কার্যত ব্যক্তিনির্ভর বাংলাদেশে নতুন একটি সরকার যত বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তাদের যদি মেয়াদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলীয়, প্রশাসনিক ও বিরোধীদলীয় চাপের মধ্যে কাটাতে হয়, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। অতএব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নিয়ে যে সামান্য সময় কাটিয়েছে, এর মধ্যে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়নের চেষ্টা অযৌক্তিক। তবে ক্ষমতায় যাওয়ামাত্র সরকার কী করবে, তার বড় ধরনের পূর্বাভাস দেওয়ার উদ্দেশ্যে জনগণের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টির কাজটি প্রায় প্রতিটি দেশে প্রতিটি নতুন সরকারই করে। চমক দেখাতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেই ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে অতীতে শেখ হাসিনা তা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অনেকটা প্রথামত ‘১০০ দিনের কর্মসূচি’ ঘোষণা করে তা শেষও করেছেন।

বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র আয়তনের স্বল্পোন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনে  মহাশক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতো চমক দেখানো সম্ভব নয় এবং তারেক রহমানও তা দেখাননি। তবে এ সময়ে তিনি বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিছু কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ড্রেস বিতরণসহ আর্থিক প্রণোদনা, স্নাতক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ, খাল খননসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। কিন্তু এসব কি উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা? এ কথা বললে বোধ হয় দোষণীয় হবে না যে সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান তাঁর ‘প্রথম ১০০ দিনে’ উল্লেখ করার মতো কিছু দেখাতে পারেননি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবস্থা শোচনীয়, ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। শিশুহত্যা ও শিশু-ধর্ষণের ঘটনা ভয়াবহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে উচ্চফলনশীল ফসলের উৎপাদনের মতো কয়েক গুণ বেড়েছে চাঁদাবাজি। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য পরিবহনকারী ট্রাক এবং বাজারে বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে এত ক্ষোভ বিরাজ করছে, এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু খোলস থেকে কচ্ছপ মাথা বের করার মতো গলা বাড়িয়ে এমনও বলার চেষ্টা করছে, ‘আওয়ামী আমলেই ভালো ছিলাম।’

তারেক রহমান দীর্ঘ সতেরো বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, জনগণ আশায় ছিল, তিনি তাঁর স্বপ্ন তুলে ধরবেন প্রথম ১০০ দিনে। তারা আশাহত হয়েছে তাদের নেতার স্বপ্নের ব্যাখ্যা না পেয়ে।

কথিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ অনুকরণের মাঝে যদি চমক দেখানোর মতো কিছু না থাকে, তাহলে অর্থহীনভাবে অন্য কারও দেখাদেখি তা অনুকরণ করা কোনোভাবে সংগত হতে পারে না। আমাদের সরকারগুলো যেখান থেকে এসব অনুকরণ করতে শেখে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে ১৪৩টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যা এই সময়সীমার মধ্যে অতীতের যেকোনো প্রেসিডেন্টের জারি করা নির্বাহী আদেশসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। ট্রাম্পের এসব আদেশের কোনো কোনোটি ছিল দুনিয়াকাঁপানো আদেশ, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিকারক বিশ্বের প্রায় সব দেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর বর্ধিত শুল্কহার আরোপ; অভিবাসননীতি সংস্কার এবং অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢালাওভাবে বহিষ্কার; বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা; বহু দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা প্রদানে কঠোর যাচাইবাছাই পদ্ধতি চালু; ফেডারেল ব্যয়সংকোচননীতির আওতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর তৃতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে অনেকগুলো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, কৃষি সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে মেগা বন্দর স্থাপন প্রকল্প; বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দরের একটি গভীর-ড্রাফট বন্দর প্রকল্প; ২৫ হাজার গ্রামকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করতে ৬২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প; আটটি নতুন রেললাইন স্থাপন, মেট্রো সম্প্রসারণসহ অসংখ্য প্রকল্প। বাংলাদেশ ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশ হোক, লক্ষ্য যদি সুদূরপ্রসারী না হয়, তাহলে শুধু বিভিন্ন ধরনের কার্ড ইস্যু করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না।   

বিশ্বজুড়ে প্রায় সব দেশে সরকার ও রাজনীতিবিদদের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা কমে গেছে। একধরনের ঘৃণাও জন্মেছে। এজন্য রাজনীতিবিদরাই দায়ী। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হয়ে তা ভুলে যান। তাঁরা সরকারি দায়িত্ব পেয়ে অবাধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করেন, নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্যের ডালপালা সম্প্রসারণ করেন এবং যত্রতত্র তাঁদের পদের দাপট দেখিয়ে জনগণকে তটস্থ রাখেন। ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাঠে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদ তো বটেই, আওয়ামী লীগ বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত সাধারণ নাগরিকদের জমিজমা, ব্যবসা, এমনকি ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করাকে তাদের অধিকারে পরিণত করেছিল। ২০২৪-এর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের অন্যায়গুলো জনগণের সামনে আসতে শুরু করে। আওয়ামী সুবিধাভোগীরা পালিয়ে বাঁচলেও দখল-লুণ্ঠনের যে ঐতিহ্য তারা রেখে গেছে, তার ওপর এখন যারা জাঁকিয়ে বসেছে সম্ভবত তারা নতুন সরকারেরই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। তাদের ওপর সরকারের প্রশ্রয় থাকলে আরও অনেকে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণে উৎসাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারের গলার কাঁটায় পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পরিণতিই বর্তমান সরকারের জন্য উত্তম শিক্ষা ও সতর্কতা।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলোর জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড যখনই সীমা ছাড়িয়ে গেছে, জনগণ তাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-মস্তানদের নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তাদের অসহায়ত্বের ফরিয়াদ আর কারও কাছে জানাতে পারেনি, তখন সংবিধানবহির্ভূত সরকারের আগমনকেও তারা অন্তত স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক দলনপীড়ন থেকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি লাভ করায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হবে। ইতোমধ্যে জনগণ কোনো কোনো মন্ত্রীর অতিকথনে বিরক্ত। তাঁদের মুখের লাগাম টেনে না ধরলে তাঁরাই সরকারের প্রতি এখন পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও জন-আস্থায় ফাটল ধরাতে ভূমিকা পালন করবেন।

সাড়ে তিন মাস দীর্ঘ কোনো সময় নয়। তবু সবাই দেখতে চায়, সূচনাটা কীভাবে হলো। কোনো কিছুর শুরু প্রায়ই ইঙ্গিত দেয়, দিনের বাকি অংশ কীভাবে যাবে। সেদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘প্রথম ১০০ দিন’ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত, যদি এ সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারের পক্ষে প্রকৃত অর্থেই জাতীয় পর্যায়ে চমক সৃষ্টির মতো কোনো ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হতো। দুঃখজনকভাবে তা হয়নি। একটি রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগ, আইনের শাসনের প্রতি নিষ্ঠা, জনগণের কাছে ভালো থাকা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতা ব্যাপকভাবে নির্ভর করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর। বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে দৃশ্যত প্রশাসনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা শুভ আলামত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারকে বাংলাদেশে চিরস্থায়ী সরকার ভেবে আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত আমলারা প্রশাসনকে যেভাবে দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বা আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক দলদাসে পরিণত করেছিল, তার চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে শেখ হাসিনাসহ তার দলের সর্বস্তরের নেতাদের। বিএনপির ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটুক।

সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তাঁর ওপর আস্থা না রাখা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাঝে ছিলেন গুম-খুন-নিপীড়ন চালিয়ে ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে আটক রাখার ভীতি সৃষ্টি করে এবং আত্মবিরোধী প্রচারণায় নিজেকে সন্তুষ্ট রেখে। যেকোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতো শেখ হাসিনাও তাঁর ওপর জনগণের নিঃশর্ত আস্থা কামনা করতেন। তাঁর মরহুম পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও তা চাইতেন। এই অগণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা পিতা ও কন্যার ভাগ্যে নির্মম পরিণতি ডেকে এনেছে। অতএব ইতিহাসই বাংলাদেশের জনগণকে শিখিয়েছে, ক্ষমতাসীন কারও ওপর আস্থা স্থাপন করা উচিত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার সীমা ও মেয়াদের মধ্যে থেকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করেন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন, দুর্নীতিপরায়ণদের বিচারের আওতায় আনেন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন।  বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে বারবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসে, তা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে আইনের শাসনের পথে জবাবদিহিমূলক সরকার নিশ্চিত করা। নতুন সরকারের কাছে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক