• ই-পেপার

এবার তীব্র গরমে মক্কা ও মদিনায় বিশেষ সতর্কতা

মসজিদে নববীর প্রাচীনতম ঐতিহাসিক ‘সূর্যঘড়ি’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদে নববীর প্রাচীনতম ঐতিহাসিক ‘সূর্যঘড়ি’
সংগৃহীত ছবি

আধুনিক ডিজিটাল ঘড়ি কিংবা উন্নত সময়-পরিমাপ প্রযুক্তির বহু আগে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সময় নির্ধারণের মাধ্যম ছিল সূর্যঘড়ি। আর সেই গৌরবময় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন আজও সংরক্ষিত রয়েছে মসজিদে নববীতে। শতাব্দীপ্রাচীন এই সূর্যঘড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; বরং এটি ইসলামী সভ্যতায় বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ইবাদতের অপূর্ব সমন্বয়ের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

১৩৩৫ হিজরি (১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ) সালে নির্মিত এই সূর্যঘড়িটি এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল, যাতে সূর্যের ছায়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সময় নির্ধারণ করা যায়। মসজিদে নববীর ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিশেষ গাণিতিক হিসাব ও নির্দিষ্ট মাপকাঠি অনুসারে এটি নির্মাণ করা হয়। ফলে যান্ত্রিক ঘড়ির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত নামাজের সময় নির্ধারণে এটি ছিল অন্যতম নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

এটি মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজের নিকটে অবস্থিত। যা আজও ইসলামী ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ইসলামে সময়ের গুরুত্ব কতটা গভীর এবং ইবাদত যথাসময়ে আদায়ের জন্য মুসলিম মনীষীরা কত উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিলেন, এটা দেখে কিছুটা অনুমান করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সূর্যঘড়ি শুধু সময় গণনার একটি যন্ত্র নয়; বরং এটি ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎকর্ষের একটি উজ্জ্বল দলিলও বটে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সূর্যের অবস্থান, ছায়ার দৈর্ঘ্য এবং পৃথিবীর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যা দীর্ঘদিন ধরে নামাজের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মসজিদে নববীর এই সূর্যঘড়ি ইসলামী সভ্যতার বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার এক অনন্য স্মারক হিসেবে প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে।

শরিয়তে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার সাত কারণ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
শরিয়তে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার সাত কারণ
সংগৃহীত ছবি

জুয়া কোরআন ও হাদিসে ‘কিমার/মাইসির’ নামে পরিচিত। ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। ইসলামিক স্কলাররা জুয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে—দুই পক্ষের এমন প্রতিযোগিতা বা লেনদেন, যেখানে প্রত্যেক পক্ষই লাভ বা ক্ষতির অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে এবং প্রবল ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ জুয়াড়ি জানে না সে লাভ করবে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এই অনিশ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনই জুয়ার মূল বৈশিষ্ট্য। সুতরাং জুয়া তার সব ধরনের রূপ নিয়ে হারাম।

অনলাইন, অফলাইন, আধুনিক কিংবা প্রাচীন সব ধরনের জুয়া হারাম। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই এটিকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা বিধান করেন এবং তাঁর বিধানই চূড়ান্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়। সুতরাং, তোমরা কি এখনো বিরত হবে না?’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯০-৯১)

জুয়া হারাম হওয়ার হিকমত ও কারণসমূহ
বিবেকবান মানুষ সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন যে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে বহু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. পরিবার ও সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে : জুয়া সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে, মানুষের সম্পদ অবৈধ পথে নষ্ট করে, ধনী পরিবারকে নিঃস্ব করে এবং সম্মানিত মানুষকে অপমান ও লাঞ্ছনার মুখে ফেলে।

২. শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে : জুয়ার মাধ্যমে মানুষ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে। এর ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা জন্ম নেয়।

৩. আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখে : জুয়া মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে নিকৃষ্ট চরিত্র ও জঘন্য অভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়।

৪. সময় ও শ্রমের অপচয় ঘটায় : জুয়া এমন একটি পাপপূর্ণ বিনোদন, যা মানুষের মূল্যবান সময় ও শক্তিকে গ্রাস করে। এটি অলসতা ও কর্মবিমুখতা সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তি ও জাতিকে উৎপাদনশীল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

৫. অপরাধের দিকে ধাবিত করে : যে ব্যক্তি জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, সে অর্থের জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করতে পারে—যেমন চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, আত্মসাৎ ইত্যাদি।

৬. মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি করে : জুয়া উদ্বেগ, মানসিক চাপ, স্নায়বিক দুর্বলতা ও নানা রোগের কারণ হয়। এটি মানুষের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ, আত্মহত্যা, উন্মাদনা বা কঠিন রোগের দিকেও ঠেলে দেয়।

৭. জুয়া অন্য পাপের দরজা খুলে দেয় : জুয়ার আসরে প্রায়ই মদ, মাদক, ধূমপান, অশ্লীলতা, প্রতারণা ও অসৎ সঙ্গের প্রচলন থাকে। সেখানে খেলোয়াড়রা পরস্পরের বন্ধু নয়; বরং একে অপরের ক্ষতির অপেক্ষায় থাকে। প্রতারণা, ষড়যন্ত্র ও অন্যায় কৌশল সেখানে সাধারণ বিষয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়—কেউ অর্থ হারায়, কেউ চরিত্র, কেউ সম্মান, কেউ বা পরিবার। রাত শেষে তারা হতাশা, লজ্জা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে আসে। বিজয়ীও প্রকৃত অর্থে লাভবান হয় না; কারণ নানা ব্যয় ও পাপের মাধ্যমে তার লাভও প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর পরাজিত ব্যক্তি হারায় তার সম্পদ, মানসিক শান্তি ও আত্মসম্মান। এভাবে জুয়া শুধু অর্থের ক্ষতি করে না; বরং এটি মদ, ধূমপান, অসৎ সঙ্গ, প্রতারণা, অন্ধকার পরিবেশ, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, আত্মসাৎ এবং নানা ধরনের অনৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

এ ছাড়া জুয়া মানুষকে অর্থহীন কাজে ব্যস্ত রাখে। এতে সালাতের সময় নষ্ট হয়, ইবাদতের প্রতি উদাসীনতা আসে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। জুয়াড়ি ব্যক্তি জিতুক বা হারুক—তার মন সর্বদা জুয়াকেই ঘিরে থাকে। হারলে দুশ্চিন্তায় থাকে, আর জিতলে আরো বেশি জেতার লোভে বিভোর হয়ে পড়ে। ফলে সে আল্লাহমুখী হতে পারে না।

জুয়া এমন উপার্জনের পথ, যা সমাজের কোনো উপকার করে না। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের উপার্জন এমন কাজের মাধ্যমে হওয়া উচিত, যা নিজের পাশাপাশি সমাজ ও অর্থনীতিরও কল্যাণ সাধন করে। কিন্তু জুয়া মানুষের কর্মস্পৃহা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে কোনো সম্মানজনক পেশা বা উৎপাদনশীল কাজে আগ্রহী থাকে না। আল্লাহ সবাইকে হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

ফেরেশতাদের দোয়া লাভের সেরা ১০ উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
ফেরেশতাদের দোয়া লাভের সেরা ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অন্যতম উপায় হলো ফেরেশতাদের দোয়া লাভ করা। ফেরেশতারা হলেন আল্লাহর নুর থেকে সৃষ্ট এমন সম্মানিত বান্দা, যারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন এবং তাঁর নির্দেশের বাইরে কোনো কাজ করেন না। তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, রহমতের দোয়া করেন এবং নেক আমলের সাক্ষী হন। কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন বহু আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো করলে ফেরেশতারা বান্দার জন্য দোয়া করেন। 

ফেরেশতাদের দোয়া লাভের সেরা ১০ উপায়
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি অপরিসীম দয়াশীল। তিনি এমন কিছু নেক আমলের ব্যবস্থা রেখেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে ফেরেশতারা মুমিনদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করেন। এসব আমল কেবল আখিরাতের পুঁজি নয়; বরং দুনিয়ার জীবনেও প্রশান্তি, বরকত ও কল্যাণের উৎস।

১. ঈমান ও তওবার ওপর অবিচল থাকা
মুমিনদের জন্য ফেরেশতাদের দোয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ঈমান ও আন্তরিক তওবা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আরশ বহন করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে, তাঁর ওপর ঈমান আনে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। অতএব যারা তওবা করেছে এবং আপনার পথ অনুসরণ করেছে, তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৭)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আন্তরিক তওবাকারী ও আল্লাহর পথে অবিচল বান্দাদের জন্য ফেরেশতারা নিয়মিত দোয়া করেন।

২. নামাজের অপেক্ষায় অজু অবস্থায় বসে থাকা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যতক্ষণ তার নামাজের স্থানে বসে থাকে এবং তার অজু নষ্ট না হয়, ততক্ষণ ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন—‘হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪৫)
এ কারণে ফরজ নামাজের আগে-পরে কিছু সময় মসজিদে বসে জিকির-আজকার করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

৩. প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা প্রথম কাতারের মুসল্লিদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯৯৭)
তাই প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর আগ্রহ মুমিনের ঈমান ও আল্লাহপ্রেমের পরিচায়ক।

৪. অসুস্থ মুসলিমকে দেখতে যাওয়া
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৯৬৯)
তাই অসুস্থকে দেখতে যাওয়া শুধু মানবিক কর্তব্য নয়; এটি ফেরেশতাদের দোয়া লাভেরও একটি মাধ্যম।

৫. মুসলিম ভাইয়ের জন্য অগোচরে দোয়া করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যখন তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করে, তখন একজন নিযুক্ত ফেরেশতা বলেন, ‘আমীন, এবং তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৩২)
এজন্য অন্যের কল্যাণ কামনা করলে নিজের জন্যও একই কল্যাণের দোয়া লাভ হয়।

৬. রোজাদারকে ইফতার করানো
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)
অন্য হাদিসে এসেছে, রোজাদারের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন। তাই ইফতার করানোও রহমত লাভের উত্তম মাধ্যম।

৭. ইলম শিক্ষা ও শিক্ষা দানে নিয়োজিত থাকা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানা বিছিয়ে দেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৪১)
তাই ইসলামের জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করা ফেরেশতাদের সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম পথ।

৮. মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! যে দান করে তাকে আরো দান করুন।’ অন্যজন বলেন, ‘যে কৃপণতা করে তার সম্পদ ধ্বংস করে দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৪২)
এ হাদিস দানশীলতার মর্যাদা ও ফেরেশতাদের দোয়ার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

৯. মহানবী (সা.)-এর ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০৮)
তাই দরুদ পাঠ মুমিনের জন্য ফেরেশতাদের দোয়া লাভের অন্যতম বিশেষ উপায়। 

১০. সর্বদা পবিত্র ও অজু অবস্থায় থাকা
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (অজুসহ) রাত কাটায়, একজন ফেরেশতা তার সঙ্গে রাত যাপন করেন। সে যখন জাগে, ফেরেশতা বলে, ‘হে আল্লাহ! আপনার এই বান্দাকে ক্ষমা করুন, কারণ সে পবিত্র অবস্থায় রাত কাটিয়েছে।’ (ইবনে হিব্বান, আল-মুজামুল কাবির)

সুতরাং ফেরেশতাদের দোয়া লাভ করা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; বরং এটি নেক আমলের স্বাভাবিক প্রতিদান। আর ফেরেশতাদের দোয়া এমন এক অমূল্য নেয়ামত, যা একজন মুমিনের জীবনকে আলোকিত করে এবং আখিরাতের সফলতার পথ সুগম করে। পৃথিবীর কোনো মানুষের দোয়ার চেয়েও ফেরেশতাদের দোয়া অধিক পবিত্র ও বরকতময়, কারণ তারা নিষ্পাপ এবং সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এমন জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন, যাতে আমরা দুনিয়ায় তাঁর রহমত এবং আখিরাতে জান্নাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি। আমিন।

কোরআন অনুধাবনে যে সাতটি বিষয় প্রতিবন্ধক

আলেমা হাবিবা আক্তার
কোরআন অনুধাবনে যে সাতটি বিষয় প্রতিবন্ধক
সংগৃহীত ছবি

মুমিনের জন্য কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করা আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে সেসব মানুষের নিন্দা করা হয়েছে, যারা কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে অভিনিবেশসহকারে চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)

কিন্তু কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলেই সবাই কোরআন অনুধাবন করতে পারে? না, পারে না। কেননা মানুষের কোরআন অনুধাবনে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। নিম্নে এমন সাতটি প্রতিবন্ধক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

কোরআন অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতাসমূহ 
কোরআনের অর্থ বোঝা ও মর্ম অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সাতটি বিশেষ প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হলো—
১. অবিরাম পাপ করা : কোরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবিরাম পাপ করে যাওয়া। কেননা কোরআন হলো জ্যোতি আর পাপ হলো অন্ধকার। তাই পাপে আচ্ছন্ন হৃদয় কোরআন অনুধাবন করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে পাপীদের অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল; সুতরাং তুমি তোমার কাজ করো এবং আমরা আমাদের কাজ করি।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৫)

আল্লামা জারকাশি (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই কোরআনের সেই পাঠক ওহির প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করতে পারে না এবং কোরআনের ভেদ-রহস্য উন্মোচন করতে পারে না যার অন্তরে দুনিয়ার মোহ ও অহংকার আছে, যে বিদআত করে, যে প্রবৃত্তির অনুসারী, যে অবিরাম পাপ করে, যে ঈমানের দাবিতে মিথ্যাবাদী বা দুর্বল।’ (আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮০)

২. অমনোযোগ ও উদাসীনতা : কোরআন আদর, যত্ন ও মনোযোগের দাবিদার। তার প্রতি অমনোযোগীদের অন্তরে কোরআন প্রবেশ করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই কোরআন সংরক্ষণে তোমরা যত্নবান হও। কেননা যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ! নিশ্চয়ই তা রশি ছিঁড়ে পলায়নরত উটের তুলনায় অধিক পলায়নপর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৩৩)

৩. আরবি ভাষা না জানা : আল্লাহ আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কোরআন জগত্গুলোর প্রতিপালক থেকে অবতীর্ণ। জিবরাইল তা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পারো। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১৯২-১৯৫)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘এটা আমিই অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হলো আরবি ভাষাগুলোর ভেতর সবচেয়ে অলংকারপূর্ণ, সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে বিস্তৃত এবং অন্তরের অভিব্যক্তি প্রকাশে সবচেয়ে সক্ষম ভাষা। অর্থাৎ সবচেয়ে সম্মানিত ভাষায় সবচেয়ে সম্মানিত কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৪৬৭)

সুতরাং যে পাঠক আরবি ভাষা সম্পর্কে জানে না এবং তাদের বাচনভঙ্গি সম্পর্কে অবগত নয়, সে কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে পারবে না এবং আল্লাহর কথার মর্মও বুঝতে পারবে না। ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির আরবি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান নেই সে কোরআনের ব্যাখ্যা করলে অবশ্যই ব্যর্থ হবে।’ (শুআবুল ঈমান : ২/৪২৫)

৪. পূর্বসূরিদের কিতাব থেকে বিমুখতা : রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় ইলমে ওহির চর্চা হয়ে আসছে। ইসলামী জ্ঞানচর্চায় এই পরম্পরা রক্ষা করা জরুরি। সুতরাং কোরআনের মর্ম অনুধাবনে পূর্বসূরিদের কিতাব পাঠ ও মতামত অবগত হওয়া অপরিহার্য। পূর্বসূরিদের কিতাব ও ব্যাখ্যা থেকে বিমুখতা কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ। ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘আমি আশ্চর্য হই সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে কোরআন পাঠ করে, অথচ তার ব্যাখ্যা জানে না। সে কিভাবে কোরআন তিলাওয়াতের স্বাদ পাবে।’ (মুজামুল উদাবা : ৫/২৫৬)

৫. কোরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানা : কোরআনের ভাষা ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে শানে নুজুল বা নাজিলের প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। ইমাম শাতেবি (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আরবদের উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে সংবোধনকারী ও সংবোধিত ব্যক্তির অবস্থা জানার ওপর নির্ভরশীল। কেননা একই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে যায় দুটি প্রেক্ষাপট ও সংবোধিত ব্যক্তির বিবেচনায়। যদি এগুলো জনা না যায়, তবে সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতগুলো নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানলে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়।’ (আল মুওয়াফিকাত : ৪/১৪৬)

৬. কোরআনের আংশিক পাঠ : কোরআন যথাযথভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আল-কোরআনের সামগ্রিক পাঠ জরুরি। আংশিক পাঠ কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে যেমন প্রতিবন্ধক, তেমনি তা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আল্লামা ইবনে হাজম (রহ.) বলেন, ‘খারেজিদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো কোরআনের একাংশ আঁকড়ে ধরা এবং অন্য অংশ ছেড়ে দেওয়া। আর তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক কোরআনের ব্যাখ্যাও ত্যাগ করেছে, অথচ এই দায়িত্ব আল্লাহই তাদের দিয়েছিলেন। যদি তারা সমগ্র কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিপূর্ণ বক্তব্য আঁকড়ে ধরত, একই হুকুমের অধীন মনে করত, পুরোপুরি আমল করত, তবে তারা অবশ্যই হেদায়েত পেত।’ (আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম : ৩/৪০)

৭. আল্লাহভীতি ও বিনয়হীন পাঠ : যারা অন্তরে আল্লাহভীতি ও বিনয় নিয়ে কোরআন পাঠ করে না, আল্লাহ তাদেরকে কোরআনের হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘কোরআন তিলাওয়াতকারীর উচিত হলো আল্লাহভীতি, বিনয় ও চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে তা পাঠ করা। আর এটা আল্লাহর প্রত্যাশিত ও উদ্দিষ্টও বটে। এর মাধ্যমে হৃদয় প্রশস্ত হয়, অন্তর আলোকিত হয়। এর স্পবক্ষে এত বেশি ও বিখ্যাত বিখ্যাত প্রমাণ রয়েছে যে তা বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না।’ (আল আজকার : ১/৮৭)

আল্লাহ সবাইকে কোরআন অনুধাবন করার তাওফিক দিন। আমিন।