মুমিনের জন্য কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করা আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে সেসব মানুষের নিন্দা করা হয়েছে, যারা কোরআন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে অভিনিবেশসহকারে চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)
কিন্তু কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলেই সবাই কোরআন অনুধাবন করতে পারে? না, পারে না। কেননা মানুষের কোরআন অনুধাবনে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। নিম্নে এমন সাতটি প্রতিবন্ধক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
কোরআন অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতাসমূহ
কোরআনের অর্থ বোঝা ও মর্ম অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সাতটি বিশেষ প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হলো—
১. অবিরাম পাপ করা : কোরআনের অর্থ ও মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবিরাম পাপ করে যাওয়া। কেননা কোরআন হলো জ্যোতি আর পাপ হলো অন্ধকার। তাই পাপে আচ্ছন্ন হৃদয় কোরআন অনুধাবন করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে পাপীদের অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল; সুতরাং তুমি তোমার কাজ করো এবং আমরা আমাদের কাজ করি।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৫)
আল্লামা জারকাশি (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই কোরআনের সেই পাঠক ওহির প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করতে পারে না এবং কোরআনের ভেদ-রহস্য উন্মোচন করতে পারে না যার অন্তরে দুনিয়ার মোহ ও অহংকার আছে, যে বিদআত করে, যে প্রবৃত্তির অনুসারী, যে অবিরাম পাপ করে, যে ঈমানের দাবিতে মিথ্যাবাদী বা দুর্বল।’ (আল বোরহান ফি উলুমিল কোরআন : ২/১৮০)
২. অমনোযোগ ও উদাসীনতা : কোরআন আদর, যত্ন ও মনোযোগের দাবিদার। তার প্রতি অমনোযোগীদের অন্তরে কোরআন প্রবেশ করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই কোরআন সংরক্ষণে তোমরা যত্নবান হও। কেননা যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ! নিশ্চয়ই তা রশি ছিঁড়ে পলায়নরত উটের তুলনায় অধিক পলায়নপর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৩৩)
৩. আরবি ভাষা না জানা : আল্লাহ আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কোরআন জগত্গুলোর প্রতিপালক থেকে অবতীর্ণ। জিবরাইল তা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পারো। অবতীর্ণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১৯২-১৯৫)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘এটা আমিই অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হলো আরবি ভাষাগুলোর ভেতর সবচেয়ে অলংকারপূর্ণ, সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে বিস্তৃত এবং অন্তরের অভিব্যক্তি প্রকাশে সবচেয়ে সক্ষম ভাষা। অর্থাৎ সবচেয়ে সম্মানিত ভাষায় সবচেয়ে সম্মানিত কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৪৬৭)
সুতরাং যে পাঠক আরবি ভাষা সম্পর্কে জানে না এবং তাদের বাচনভঙ্গি সম্পর্কে অবগত নয়, সে কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে পারবে না এবং আল্লাহর কথার মর্মও বুঝতে পারবে না। ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির আরবি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান নেই সে কোরআনের ব্যাখ্যা করলে অবশ্যই ব্যর্থ হবে।’ (শুআবুল ঈমান : ২/৪২৫)
৪. পূর্বসূরিদের কিতাব থেকে বিমুখতা : রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় ইলমে ওহির চর্চা হয়ে আসছে। ইসলামী জ্ঞানচর্চায় এই পরম্পরা রক্ষা করা জরুরি। সুতরাং কোরআনের মর্ম অনুধাবনে পূর্বসূরিদের কিতাব পাঠ ও মতামত অবগত হওয়া অপরিহার্য। পূর্বসূরিদের কিতাব ও ব্যাখ্যা থেকে বিমুখতা কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ। ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘আমি আশ্চর্য হই সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে কোরআন পাঠ করে, অথচ তার ব্যাখ্যা জানে না। সে কিভাবে কোরআন তিলাওয়াতের স্বাদ পাবে।’ (মুজামুল উদাবা : ৫/২৫৬)
৫. কোরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানা : কোরআনের ভাষা ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে শানে নুজুল বা নাজিলের প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। ইমাম শাতেবি (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আরবদের উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে সংবোধনকারী ও সংবোধিত ব্যক্তির অবস্থা জানার ওপর নির্ভরশীল। কেননা একই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে যায় দুটি প্রেক্ষাপট ও সংবোধিত ব্যক্তির বিবেচনায়। যদি এগুলো জনা না যায়, তবে সঠিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতগুলো নাজিলের প্রেক্ষাপট না জানলে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়।’ (আল মুওয়াফিকাত : ৪/১৪৬)
৬. কোরআনের আংশিক পাঠ : কোরআন যথাযথভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আল-কোরআনের সামগ্রিক পাঠ জরুরি। আংশিক পাঠ কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে যেমন প্রতিবন্ধক, তেমনি তা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আল্লামা ইবনে হাজম (রহ.) বলেন, ‘খারেজিদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো কোরআনের একাংশ আঁকড়ে ধরা এবং অন্য অংশ ছেড়ে দেওয়া। আর তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক কোরআনের ব্যাখ্যাও ত্যাগ করেছে, অথচ এই দায়িত্ব আল্লাহই তাদের দিয়েছিলেন। যদি তারা সমগ্র কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিপূর্ণ বক্তব্য আঁকড়ে ধরত, একই হুকুমের অধীন মনে করত, পুরোপুরি আমল করত, তবে তারা অবশ্যই হেদায়েত পেত।’ (আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম : ৩/৪০)
৭. আল্লাহভীতি ও বিনয়হীন পাঠ : যারা অন্তরে আল্লাহভীতি ও বিনয় নিয়ে কোরআন পাঠ করে না, আল্লাহ তাদেরকে কোরআনের হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘কোরআন তিলাওয়াতকারীর উচিত হলো আল্লাহভীতি, বিনয় ও চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে তা পাঠ করা। আর এটা আল্লাহর প্রত্যাশিত ও উদ্দিষ্টও বটে। এর মাধ্যমে হৃদয় প্রশস্ত হয়, অন্তর আলোকিত হয়। এর স্পবক্ষে এত বেশি ও বিখ্যাত বিখ্যাত প্রমাণ রয়েছে যে তা বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না।’ (আল আজকার : ১/৮৭)
আল্লাহ সবাইকে কোরআন অনুধাবন করার তাওফিক দিন। আমিন।