• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

খ্যাতিহীন সাধারণ মানুষের মর্যাদা ও ফজিলত

মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার, ইসলাম কী বলে

মুফতি আতাউর রহমান
মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার, ইসলাম কী বলে

ইসলামী শরিয়তে মা-বাবার সম্মান, মর্যাদা ও যত্ন অনিবার্য। ইসলাম সন্তানের জন্য মা-বাবাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করেছে। নিষিদ্ধ করেছে তাঁদের প্রতি ন্যূনতম অসদাচরণকে।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে উফ পর্যন্ত বোলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বোলো।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

ভরণপোষণের বিধান

এই বিষয়ে ফকিহরা একমত যে শর্ত সাপেক্ষে সন্তানের জন্য মা-বাবার ভরণপোষণ প্রদান করা ওয়াজিব, যা কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকে কী ব্যয় করবে সে সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে। বোলো, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যা কিছু তোমরা করো না কেন আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২১৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানের উপার্জনে মা-বাবার অধিকার ঘোষণা করে বলেন, ‘মানুষের জন্য উওম খাবার হলো তার নিজের হাতে অর্জিত খাদ্য এবং তার সন্তানের আয়ও নিজের উপার্জনের মতো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫২৮)

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার সম্পদ আছে, সন্তানও আছে। আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি ও তোমার সম্পদ সবই তোমার পিতার।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৯১)

আল্লামা ইবনে মুনজির (রহ.) বলেন, ‘উম্মতের আলেমরা এই বিষয়ে একমত, যে মা-বাবার উপার্জন নেই, সম্পদও নেই তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া সন্তানের জন্য আবশ্যক।’ (আল ইজমা, পৃষ্ঠা-১১০)

কন্যাসন্তান দায়মুক্ত নয়

আমাদের সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদানে কন্যাসন্তানের কোনো দায় নেই। কিন্তু চার মাজহাবের সম্মিলিত মত হলো, পুত্রসন্তানের মতো মা-বাবার দায়িত্ব কন্যাসন্তানের ওপরও বর্তায়। এ ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবের মত হলো, কন্যারা পুত্রসন্তানের সমান দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে হাম্বলি মাজহাবে বলা হয়েছে, পুত্র ও কন্যারা মিরাস অনুপাতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। অর্থাৎ কন্যার দায়িত্ব ছেলের অর্ধেক। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২৩; আল মুগনি : ৮/২১৯)

ভরণ-পোষণ লাভের শর্ত

ইসলামী শরিয়ত দুটি মৌলিক শর্তে সন্তানের ওপর মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদান করা ওয়াজিব করেছে। তা হলো—

১. সন্তান সামর্থ্যবান হওয়া : সর্বসম্মতিক্রমে ভরণ-পোষণ ওয়াজিব হওয়ার জন্য সন্তানের সামর্থ্যবান হওয়া শর্ত। হানাফি মাজহাব অনুসারে সন্তান যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় এবং তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে অথবা সন্তানের সম্পদ নেই, কিন্তু এমন উপার্জন থাকে যা দ্বারা নিজের ও পরিবারের (স্ত্রী ও সন্তান) ব্যয় নির্বাহ করার পরও অর্থ বেঁচে যায়, তবে সন্তান সামর্থ্যবান বলে বিবেচিত হবে। এমন সন্তানের ওপর মা-বাবা ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২২; আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৪)

২. মা-বাবা অভাবগ্রস্ত হওয়া : এই বিষয়েও আলেমরা একমত যে সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ লাভ করার জন্য মা-বাবার অভাবগ্রস্ত হওয়া শর্ত। আর তাদের অভাবগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো তাদের সম্পদ ও উপার্জন না থাকা। চাই তারা উপার্জনে সক্ষম হোক বা না হোক। (আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৩; আল মুগনি : ৮/২১৩)

এ ছাড়া ভরণ-পোষণ আবশ্যক হওয়ার জন্য ফকিহরা আরেকটি শর্তারোপ করেন। তা হলো ব্যয়কারী ব্যয় গ্রহণকারীর ওয়ারিশ হওয়া। কোনো কারণে যদি ব্যক্তি ওরাসাত থেকে বঞ্চিত হয় তবে তার জন্য ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক নয়। যেমন—ইসলামী শরিয়তের আলোকে দাদার আগে পিতা মারা গেলে নাতি দাদার সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়। এমন অবস্থায় নাতির জন্য দাদার ভরণ-পোষণ প্রদান করা আবশ্যক নয়। কিন্তু নাতির যদি কোনো চাচা না থাকে, তখন তার ওপর দাদার দায়িত্ব অর্পিত হবে। কেননা চাচার অনুপস্থিতিতে সে দাদার মিরাস লাভ করে থাকে। (আল মুগনি : ১১/৩৭৪)

মা-বাবা দ্বারা উদ্দেশ্য

ফকিহ আলেমরা বলেন, সন্তানের জন্য মা-বাবার ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক। আর মা-বাবা দ্বারা উদ্দেশ্য ব্যক্তির জন্মদাতা বাবা ও গর্ভধারিণী মা। একইভাবে বাবার সূত্রে দাদা-দাদি এবং মায়ের সূত্রে নানা-নানি ভরণ-পোষণ লাভ করবে। তবে মালেকি মাজহাবের মত হলো, শুধু মা ও বাবাই সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ লাভ করবে, দাদা-দাদি ও নানা-নানি ভরণ-পোষণ লাভ করবে না। (আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৩; আল মাউনা আলা মাজহাবিল মালিক : ১/৯৩৯)

প্রথম মতামতের পক্ষে দলিল হলো, আল্লাহর বাণী—‘উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ দায়িত্ব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

অর্থাৎ যে যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার লাভ করে, সে তার দায়িত্বও গ্রহণ করবে। আর পরোক্ষভাবে ব্যক্তি দাদা-দাদি ও নানা-নানির উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে। (আল মুগনি : ৮/২১৩)

সৎ মা ও বাবার ভরণ-পোষণ দেওয়া ব্যক্তির জন্য আবশ্যক নয়। যদি ব্যক্তির সামর্থ্য থাকে, পিতা সামর্থহীন হন বা মারা যান এবং সৎ মাও নিরুপায় হন তবে আত্মীয় হিসেবে তারকে খরচ দেওয়া মুস্তাহাব।

ভরণপোষণ দ্বারা উদ্দেশ্য

ভরণ-পোষণ দ্বারা সাধারণত প্রয়োজনীয় খরচ বা ব্যয় নির্বাহ করাকে বোঝায়। হানাফি মাজহাব অনুসারে নফকা তথা ভরণ-পোষণ বলতে মানুষের এমন প্রয়োজনকে বোঝায়, যার ওপর তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সে হিসেবে ভরণ-পোষণ দ্বারা খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান উদ্দেশ্য। (হাশিয়াতুল শালাবি : ৩/৫০; আল লুবাব ফি শরহিল কিতাব : ৩/৯০)

মালেকি মাজহাবে ভরণ-পোষণ দ্বারা উদ্দেশ্য অপচয় ছাড়া মর্যাদা ও অভ্যাস অনুসারে জীবন যাপন করতে যা কিছু প্রয়োজন হয়। (হাশিয়াতুদ দাসুকি : ২/৫০৯)

ফকিহ আলেমরা এ বিষয়েও একমত যে মা-বাবা সন্তানের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ গ্রহণ করবে। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেবে না। অন্যদিকে সন্তানও নিজের সামর্থ্য ও মা-বাবার প্রয়োজন বিবেচনা করে খরচ প্রদান করবে। (বাদায়িউস সানায়ে : ৪/৩০)

চিকিৎসা, ঋণশোধ ও সেবক নিয়োগ

মা-বাবা অক্ষম হওয়ার পর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের বাইরে আরো তিনটি প্রয়োজন সামনে আসে। তা হলো মা-বাবার চিকিৎসা করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা ও তাদের জন্য সেবক-সেবিকা নিয়োগ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, সন্তানের জন্য মা-বাবার চিকিৎসার খরচ দেওয়া এবং আবশ্যক হলে সেবক নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক। এই হিসেবে পিতার জীবদ্দশায় যদি তাঁর স্ত্রী (সত্মা) তাঁর সেবা করে, তবে সেই স্ত্রী বা সত্মায়ের ভরণ-পোষণও বহন করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২২; আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৪)

অন্যদিকে মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করা সন্তানের জন্য ওয়াজিব নয়। সন্তানের সামর্থ্য থাকলে পরিশোধ করা উত্তম। কেননা হাদিসে মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। (ফাতহুল বারি : ৪/৭০)

স্ত্রী-সন্তান নাকি মা-বাবা?

ব্যক্তির জন্য স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদান করা আবশ্যক। প্রশ্ন হলো, ভরণ-পোষণ লাভের ক্ষেত্রে কারা অগ্রাধিকার পাবে? ‘আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু’ গ্রন্থে এই বিষয়ে লেখা হয়েছে, ‘যখন ভরণ-পোষণের হকদার একাধিক জন হয় এবং তাদের খরচ প্রদানের মতো নিকটাত্মীয় একজনই হয়, তখন ব্যক্তির সামর্থ্য থাকলে তার ওপর সবার জন্য ব্যয় করা ওয়াজিব। আর সে যদি সামর্থ্যবান না হয়, তবে সে নিজেকে দিয়ে শুরু করবে, অতঃপর তার ছোট, কন্যা ও অক্ষম সন্তান ভরণ-পোষণ পাবে। এরপর পাবে তার স্ত্রী।’ (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৭/৭৮৪)

এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ দরিদ্র হলে সে যেন তার নিজ হতে খরচ করা শুরু করে। তার পরও কিছু উদ্বৃত্ত থাকলে যেন স্বীয় পরিবারের লোকের জন্য খরচ করে। তার পরও কিছু থাকলে তা আত্মীয়-স্বজনের জন্য খরচ করে। তার পরও কিছু বাকি থাকলে এদিক-ওদিক দান করবে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৬৫৩)

অবশ্য আলেমরা বলেন, ‘সন্তান অসচ্ছল হলে অভাবী ও অক্ষম মাতা-পিতাকে নিজের পরিবারে শামিল করে নেওয়া উচিত। কারণ গোটা পরিবারের খাদ্য বস্ত্রে দু-একজন শামিল করা অসম্ভব নয়।’ (আলমুফাসসাল : ১০/১৯৫)

আল্লাহ সবাইকে মা-বাবার উপযুক্ত সেবাযত্ন করার তাওফিক দিন। আমিন।

দুই অঙ্গের নিয়ন্ত্রণে জান্নাতের নিশ্চয়তা

দুই অঙ্গের নিয়ন্ত্রণে জান্নাতের নিশ্চয়তা

মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছেন। তাদের সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। তাদের এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা অন্য সব মাখলুকের ওপর রাজত্ব করতে পারে। মানুষকে মহান আল্লাহ যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করেছেন, তার মধ্যে দুটি অঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১. জিহ্বা ও ২. লজ্জাস্থান। এ দুটি অঙ্গের সঠিক ব্যবহার যেমন মানুষের মর্যাদা, ইজ্জত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম হতে পারে, তেমনি এগুলোর অপব্যবহারে তার দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই ইসলাম এ দুটি অঙ্গ সংরক্ষণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে।

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই ঊরুর মাঝখানের বস্তুর (লজ্জাস্থান) জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জিম্মাদার।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৪)

সাধারণত এই দুটি অঙ্গ দিয়েই মানুষ জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। অথচ মানুষ মুখ দিয়ে যা বলে, সব তাৎক্ষণিক লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে কথাই মানুষ উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার নিকটে একজন সদা তৎপর প্রহরী আছে।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)

অতএব মানুষ তার জিহ্বাকে ব্যবহার করে গিবত, চোগলখুরি, গালিগালাজ, অপবাদ, মিথ্যা কথা, নাশোকরিমূলক উক্তি ও এজাতীয় অন্যান্য যে পাপাচারেই লিপ্ত হয়, সবই সংরক্ষিত হয়ে যায়। যেগুলোর পরিণতি খুবই ভয়াবহ। পবিত্র কোরআন গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছে। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

চোগলখোরদের বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। (সুরা : কলম, আয়াত : ১১)। 

এমনিভাবে মিথ্যা, অপবাদ, গালাগালের  ভয়াবহতা নিয়ে বহু আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে।

মানুষের মুখের কথা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো একটি কথার কারণে মানুষের অনেক বড় বিপদ নেমে আসতে পারে, তার দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন যে নিশ্চয় বান্দা পরিণাম চিন্তা ব্যতিরেকেই এমন কথা বলে, যে কথার কারণে সে ঢুকে যাবে জাহান্নামের এমন গভীরে, যার দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)

এ জন্য আল্লাহ মুখের জোর দিলেই তা দিয়ে মানুষকে হেয় করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ঝগড়া করা, গালাগাল দেওয়া ও মিথ্যা ও কুফরি কথা বলার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে লজ্জাস্থানের পাপ মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। এ জন্য ইসলাম ব্যভিচারকে শুধু হারামই করেনি; বরং তার নিকটবর্তী হওয়ার পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)

মুমিন কখনো এই পথে পা বাড়াতে পারে না। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৫)

কিয়ামতের দিন যেসব অঙ্গের পাপের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ জাহান্নামে যাবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো এই দুটি অঙ্গ। রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিক্ষেপ করে? তিনি উত্তর দেন, ‘মুখ ও লজ্জাস্থান।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৪)

বস্তুত জিহ্বা ও যৌন প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার অন্যতম পরিচায়ক। যে ব্যক্তি গিবত, মিথ্যা, অপবাদ, অশ্লীল ভাষা ও কু-কথা থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং ব্যভিচার ও অশ্লীলতার সব পথ বন্ধ রাখে, সে নিজের ঈমান, সম্মান ও আখিরাতকে নিরাপদ রাখে।

আর যে ব্যক্তি এ দুটি অঙ্গকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়, সে নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। তার পাপে দুনিয়া-আখিরাত ভারী হয়ে ওঠে। যাকে তার উভয় জাহানের লাঞ্ছনাকে ত্বরান্বিত করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো সর্বদা জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করা। কেননা এ দুটির সঠিক ব্যবহার জান্নাতের পথ সুগম করে এবং অপব্যবহার জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৮ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ৮ জুন ২০২৬

আজ সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ২১ জিলহজ ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০১ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৩৭ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৪৮ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৪ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪২ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

মুফতি সাঈদ আহমাদ যশোরী
সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতি মানবজীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। আজ অনেকের দিন শুরু হয় মোবাইলের স্ক্রিন দেখে, আর শেষ হয় সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে। ফলে অজান্তেই প্রযুক্তি মানুষের জীবন পরিচালনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

নামাজে যেমন ইমাম সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আর মুক্তাদি তাঁর অনুসরণ করেন, তেমনি আধুনিক সমাজে অনেক মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি মূল্যবোধও অনেকাংশে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। একজন মুমিনের জন্য এটি গভীরভাবে ভাবনার বিষয়। কারণ ইসলাম মানুষকে পরিস্থিতির দাস নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’(সুরা : আসর, আয়াত : ১-২)

বর্তমানে অসংখ্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে দেন, অথচ দিনের শেষে উপলব্ধি করেন যে তারা উল্লেখযোগ্য কোনো উপকারই অর্জন করেননি। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার পদযুগল নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)

সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করা প্রতিটি মিনিটও আমাদের আমলনামার অংশ।

চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছি না তো?
সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যতম বড় প্রভাব হলো এটি মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। কী ট্রেন্ডিং, কী জনপ্রিয়, কে কী বলছে—এসব দেখে অনেক মানুষ নিজের বিবেক ও বিচারশক্তির পরিবর্তে জনমতের অনুসারী হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৬)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।


ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেয়। একজন মুমিন কখনো তার ইচ্ছা, আবেগ কিংবা পরিবেশের অন্ধ অনুসারী হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজের নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, তার আবাস হবে জান্নাত।;’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)

আজকের দিনে নফসের অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, সময় অপচয় এবং ডিজিটাল আসক্তি। একজন সচেতন মুসলিমকে এসব বিষয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম লক্ষণ হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)

সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের জন্যই কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। একজন মুমিনের উচিত উপকারী জ্ঞান, ইসলামী শিক্ষা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, শিক্ষামূলক বিষয় এবং সমাজকল্যাণমূলক কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

আর সোশ্যাল মিডিয়াকে মুক্তাদি বানানোর অর্থ প্রযুক্তি বর্জন করা নয়; বরং প্রযুক্তিকে নিজের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের অধীনস্থ করা। অর্থাৎ— আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার দাস হব না, আমরা সময় নির্ধারণ করে ব্যবহার করব, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমিয়ে আনব, উপকারী ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট অনুসরণ করব, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও ফিতনা থেকে দূরে থাকব, প্রযুক্তিকে দ্বীনের খেদমত, জ্ঞান অর্জন ও আত্মউন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব ইত্যাদি। যখন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব—তখনই সোশ্যাল মিডিয়া মুক্তাদি হবে আর আমরা নিজেদের জীবনের ইমাম হতে পারব।

একজন মুমিনের ডিজিটাল নীতিমালা
১. দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা।
২. ফজর ও এশার পর অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কমানো।
৩. প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী জ্ঞানার্জনের জন্য নির্ধারণ করা।
৪. কোনো খবর শেয়ার করার আগে যাচাই করা।
৫. গিবত, তর্ক-বিতর্ক ও অশ্লীল কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা।
৬. বাস্তব জীবনের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৭. প্রতিদিন নিজের স্ক্রিন টাইম পর্যালোচনা করা।


সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে, আবার সময় ও চিন্তার স্বাধীনতাও কেড়ে নিতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে না যাওয়া। ইসলাম আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং সময়ের মূল্য শেখায়। সুতরাং আসুন, আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে আমাদের জীবনের ইমাম না বানিয়ে তাকে মুক্তাদির আসনে বসাই। আমাদের চিন্তা, সময়, আমল এবং জীবন পরিচালনার নেতৃত্ব যেন থাকে কোরআন, সুন্নাহ ও বিবেকের হাতে। তখনই আমরা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারব এবং দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারব। মনে রাখতে হবে, একজন মুমিনের হাতে প্রযুক্তি একটি উপকারী হাতিয়ার; কিন্তু প্রযুক্তির হাতে একজন মুমিন কখনো খেলনা হতে পারে না।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, মারকাজুল কোরআন ঢাকা।