সিলেটের সীমান্তগুলো দিয়ে হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জিরার চোরাচালান। সীমান্তবর্তী যেসব রুটে এত দিন ভারতীয় চিনি ব্যাপক হারে চোরাচালান হতো সেসব রুটে প্রধান চোরাই পণ্য এখন জিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, চিনির তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি জিরা ভারত থেকে চোরাপথে দেশে ঢুকছে। তারপর সেগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জিরার চাহিদা বছরে ৬০ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈধপথে আমদানি হয়েছে ৩৪ হাজার টন। দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদন না থাকলেও তাতে জিরার ঘাটতি দেখা দেয়নি। বিটিটিসির ধারণা, বাকি ২৬ হাজার টন জিরা চোরাপথে এসেছে।
সিলেটের জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলার অন্তত ১৫টি সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হয়। তবে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ার সুবাদে জৈন্তাপুর উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়ন হয়ে উঠেছে এই পণ্য চোরাচালানের সবচেয়ে বড় হাব। এই রুট ঘিরে জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটের চোরাকারবারিরা গড়ে তুলেছে চোরাচালানের বড় নেটওয়ার্ক। তাদের নিয়ন্ত্রণে সীমান্তের অন্তত ১১ পয়েন্ট দিয়ে দিনে ও রাতে ঢুকছে জিরাসহ অন্যান্য চোরাই পণ্য। তবে মূলত গত ঈদুল ফিতরের সময় থেকেই হঠাৎ ব্যাপক হারে বেড়ে যায় জিরার চোরাচালান।
যেসব রুটে চোরাচালান : সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়ন এখন চোরাচালানের সবচেয়ে বড় হাব। ইউনিয়নের ‘ইয়াং রাজা’ টিলাকে ধরা হয় সিলেট জেলার সর্বোচ্চ বিন্দু। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ার সুবাদে এখান দিয়েই সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হচ্ছে। এই ইউনিয়নের নুরুলটিলা, অভিনাশ ও লালমিয়ার টিলা, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গি বিল, রাবারবাগান, আফিফানগর, সিঙ্গারীরপাড় পয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন নামছে ভারতীয় চোরাই জিরা। এ ছাড়া উপজেলার জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মোকমবাড়ী, আলুবাগান, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, মিনাটিলা, কাটালবাড়ী, কেন্দ্রি, ডিবির হাওর এবং নিজপাট ইউনিয়নের ডিবির হাওর আসামপাড়া, ঘিলাতৈল, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা, কমলাবাড়ী, গোয়াবাড়ী বাইরাখেল, হর্নি কালিঞ্জিবাড়ী দিয়েও চোরাইপথে আসছে জিরাসহ ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য।
তিন উপজেলা মিলে নেটওয়ার্ক : সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা দিয়ে জিরা চোরাচালান বাড়লেও পার্শ্ববর্তী তিনটি উপজেলা কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার চোরাকারবারিরা মিলে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেটকে সিলেট জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মো. শাহজাহান ও তাঁর ভাই নেতৃত্ব দেন বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. শাহজাহান বলেন, ‘আমি ব্যবসাই করি না আর চোরাচালানের ব্যবসা তো দূরের কথা। এলাকার কিছু মানুষ আলোচনা করছেন, আমাকে বলছেন চারিকাটা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে। তাঁদের বারবার বলার কারণে আমি বলেছি- নির্বাচন করব। এই বলাটাই আমার পাপ হয়ে গেছে। এর পর থেকেই প্রতিপক্ষ প্রতিহিংসা থেকে আমার বিরুদ্ধে নানা বদনাম ছড়াচ্ছে।’
বিভিন্ন সূত্র মতে, সিলেট সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার বস্তা জিরা আসছে। প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি জিরা থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ কেজি জিরা সিলেট সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে ঢুকছে বাংলাদেশে।
অভিযোগ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও : সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও গ্রামগুলোর অন্তত ১০ জন বাসিন্দা জানিয়েছেন, সবার চোখের সামনে চোরাচালান হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখে ধরা পড়ে না।
এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. সম্রাট তালুকদার বলেন, ‘অপরাধী তো অপরাধীই। পুলিশ যদি অপরাধী হয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সে প্রচলিত নিয়ম আছে, বিভাগীয় পদ্ধতি বা শাস্তির যে বিষয়—সেটা করা হবে।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুবায়ের আনোয়ারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।