একটি ঘটনায় নিখোঁজ ৫ বছরের শিশু। পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে রেখে যাওয়া রহস্যময় চিঠি। অন্য ঘটনায় গভীর রাতে সড়কের পাশে কথাকাটাকাটি থেকে রক্তাক্ত হামলা, প্রাণ হারান এক যুবক। দুই ঘটনায়ই আতঙ্ক, ক্ষোভ ও নানা গুঞ্জনে উত্তাল ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার জনপদ।
কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দুটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। আধুনিক প্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, হাতের লেখার মিল খুঁজে বের করা, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে সংশ্লিষ্ট আসামিদের।
জেলা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পটিয়ার সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ২ মামলার তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য। একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে অপহরণের নাটক সাজানোর অভিযোগ যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি পঙ্কজ শীল হত্যার ঘটনায়ও পালিয়ে থাকা মূল আসামিকে দেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংঘটিত দুটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। একদিকে নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর পাঁচ বছরের শিশু জায়হানের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার, অন্যদিকে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত পঙ্কজ শীল হত্যা মামলার মূল আসামিসহ দুইজনকে গ্রেফতার দুটি ঘটনাই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছিল।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে উভয় মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মোট ৫ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পটিয়ার সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত দুই মামলার তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য। একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে অপহরণের নাটক সাজানোর অভিযোগ যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি পঙ্কজ শীল হত্যার ঘটনায়ও পালিয়ে থাকা মূল আসামিকে দেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নিখোঁজ থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ ; জমি বিরোধের বলি শিশু জায়হান :
গত ১৬ জুন মঙ্গলবার দুপুরে পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহানের ৫ বছর বয়সী ছেলে মো. জায়হান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। পরিবার পটিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করলে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামে পুলিশ। শিশুটিকে উদ্ধারে পটিয়া থানা ও জেলা গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ টিম গঠন করা হয়। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব জায়গায় চলে ব্যাপক অনুসন্ধান। তদন্তের একপর্যায়ে শিশুটির বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয় মুক্তিপণ ও প্রাণনাশের হুমকি সম্বলিত একটি চিরকুট। প্রথমদিকে ঘটনাটি অপহরণ বলে মনে হলেও চিরকুটের হাতের লেখা তদন্তে নতুন মোড় এনে দেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চিরকুটের লেখার সঙ্গে প্রতিবেশী ও স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত নার্স সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার মিল পাওয়া যায়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্তে আরো জানা যায়, পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। এরপর ঘটনাকে অপহরণ নাটক হিসেবে উপস্থাপন করতে মুক্তিপণের চিঠি রেখে দেওয়া হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মো. সাইফুদ্দীন (৩৯), শাহানুর আক্তার (৩৫) ও সুলতানা আকতার নিহা (১৮)। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহান ও ওয়াসিফা নামে আরও দুইজনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে ১৭ জুন (মঙ্গলবার) গভীর রাতে বাড়ির পেছনের নর্দমার আবর্জনার মধ্যে লুকিয়ে রাখা বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
চক্রশালার রক্তাক্ত রাত; প্রশ্ন করতেই প্রাণ গেল পঙ্কজের :
অন্যদিকে গত ৯ জুন পটিয়ার চক্রশালা এলাকায় ঘটে আরেকটি নৃশংস ঘটনা। স্থানীয়রা রাস্তার পাশে সন্দেহজনকভাবে অবস্থানরত এক নারী ও এক পুরুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র বের করে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি হামলায় গুরুতর আহত হন পঙ্কজ শীল ও তিলক চক্রবর্তী। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক পঙ্কজ শীলকে মৃত ঘোষণা করেন। তিলক চক্রবর্তী এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনার পরপরই মাঠে নামে পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, প্রযুক্তিগত তথ্য ও মোবাইল ট্র্যাকিং বিশ্লেষণ করে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সে তদন্তের ধারাবাহিকতায় টেকনাফ থেকে গ্রেফতার করা হয় প্রধান আসামি আব্দুল রহমানকে (২৩)। পরে চন্দনাইশ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ঘটনার সময় উপস্থিত বোরকা পরিহিত নারী ফাতেমা বেগম নেহাকে (১৯)। তাদের পরিহিত পোশাকও জব্দ করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ :
দুই মামলার তদন্তেই আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার সমন্বয় দেখা গেছে। হাতের লেখার বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, আলামত সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে স্বল্প সময়েই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পটিয়ায় সংঘটিত এ দুটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও দ্রুত রহস্য উদঘাটনের ফলে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসপি মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘পটিয়ার দুটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে জেলা পুলিশের সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে আমরা দ্রুত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘নিষ্পাপ শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একটি নিষ্পাপ শিশুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্যদিকে পঙ্কজ শীল হত্যাকাণ্ডেও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপরাধ দমন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
স্বস্তি ফিরলেও রয়ে গেছে প্রশ্ন :
দুটি মামলার রহস্য উদঘাটন হলেও স্থানীয়দের মনে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু প্রশ্ন। একটি শিশুকে কেন্দ্র করে কীভাবে এমন নির্মম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো। আবার প্রকাশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তরা কীভাবে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পালিয়ে বেড়ালো।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট পটিয়ার সাম্প্রতিক দুই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে দ্রুত তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আবারও প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও সমন্বিত অভিযানে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। ৫ বছর বয়সী একটি নিষ্পাপ শিশু, একটি পরিবার, একটি হত্যাকাণ্ড, রাতের আঁধারে আরেকটি রক্তাক্ত হামলা দুই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল পটিয়া। দ্রুত তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে জনমনে। তবে এসব ঘটনার নেপথ্যের সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে পুরো জনপদ।




