দক্ষিণ চীনের গুয়াংজি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের হেংঝৌ শহরের একটি সাপের খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়েছে। এতে প্রায় ৯০০টি সাপ বের হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে মানুষ বাঁশের লাঠি দিয়ে সাপ ধরার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা উ ঝি জানান, পালিয়ে যাওয়া বেশিরভাগ সাপ বিষধর নয়। সেগুলো ধরতে মাছ ধরার জাল ও স্টান গান ব্যবহার করে ১০ সদস্যের একটি দল কাজ করছে। তিনি গ্রামবাসীদের সতর্ক করে বলেছেন, কোনো সাপ দেখলে যেন নিজেরা ধরার চেষ্টা না করেন।
চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিধস, বন্যা, প্রবল বৃষ্টিপাত ও টর্নেডোর কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছর দেশটিকে কঠিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাদের মতে, ১ জুলাই শুরু হওয়া বার্ষিক বন্যা মৌসুমে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এল নিনোর প্রভাব পড়বে, যা বন্যা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নদী, হ্রদ, জলাধার এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এদিকে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল অঞ্চলে সোমবার মধ্যরাতে বন্যা সতর্কতা সর্বোচ্চ ‘রেড’ স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫৫টি নদীর ৭০টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির স্তর সতর্কসীমার উপরে উঠে গেছে।
ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং বন্যা মোকাবেলার জন্য চীনের কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য রাবার বোট, ঝড় মোকাবেলার নৌকা এবং স্বেচ্ছাসেবক দলও মোতায়েন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ভারি বৃষ্টির কারণে দেশজুড়ে ৬২টি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া কিংসুই নদী পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্যা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে প্রতিবেশী গুয়াংডং প্রদেশের ঝাওকিং এলাকার পশ্চিম নদীর কিছু অংশে মঙ্গলবার প্রথম বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার সকাল নাগাদ পানির স্তর ২২ মিটার (৭২ ফুট) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা পাশের জেলার একটি বাঁধের উচ্চতার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া পানি আরো বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত প্রদেশজুড়ে ১২৮টি ভারি বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়।
এদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের লংনান এলাকার একটি গ্রামে ভূমিধসে ৩৩ জন মাটিচাপা পড়েন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করলেও পরে তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সোমবার সন্ধ্যায় ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার সতর্কতা জারি করেছিল। সেই সঙ্গে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়।
প্রাদেশিক সংবাদপত্র গ্যানসু ডেইলিও ভূমিধস ও কাদাধসের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে। জনগণকে উপত্যকায় বজ্রধ্বনির মতো শব্দ শোনা বা নদীর পানি হঠাৎ ঘোলা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মধ্য চীনে প্রবল বৃষ্টি ও টর্নেডোর আঘাতে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার রাতে হুবেই প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া আঘাত হানে। প্রদেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর হুয়াংগ্যাং ১৭৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২৬৯ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক বাড়ির ছাদ, সড়ক, গাছপালা এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ঝড়ের মধ্যে দোকানের দরজা বন্ধ রাখতে বাসিন্দারা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। এ সময় ছাতা, চেয়ার এবং গাছের ডালপালা বাতাসে উড়ে যেতে দেখা যায়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, কয়েক বছরের মধ্যে এটিই হুবেই প্রদেশে আঘাত হানা প্রথম টর্নেডো। দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রদেশজুড়ে তিন হাজার ৫০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ওয়াং শিয়াওলিং জানান, হুবেই প্রদেশে টর্নেডো খুবই বিরল ঘটনা। এর আগে সর্বশেষ টর্নেডো রেকর্ড করা হয়েছিল ২০২১ সালে।
চীনে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও তৃণমূল সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যের আবেদন সংগ্রহ এবং জরুরি সহায়তার চাহিদা নিরূপণের কাজ করছে। এর মধ্যে অলাভজনক ঝুওমিং দুর্যোগ তথ্যসেবা কেন্দ্র বিশেষভাবে সক্রিয় রয়েছে। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত দক্ষিণ চীনের গুয়াংসি অঞ্চলে অন্তত ৪ হাজার মানুষ সাহায্যের আবেদন করেছেন।
এর আগে চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছিল, দক্ষিণ চীনের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বৃষ্টিপাতের অঞ্চল তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর চীনেও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে, কারণ শক্তিশালী টাইফুনগুলো উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ এলাকাগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। চীনের পানিসম্পদ ও জলবিদ্যুৎ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বন্যা ও খরা দুর্যোগ হ্রাস গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক লিউ চ্যাংজাং বলেছেন, চলতি বছর দেশটি জটিল ও কঠিন বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
চীনের পানিসম্পদ ও জলবিদ্যুৎ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লিউ চাংজুন বলেন, বন্যা মোকাবেলার কৌশলে পরিবর্তন আনা জরুরি। অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু বড় নদী ও বড় জলাধারের দিকে নজর দিলেই হবে না। মাঝারি ও ছোট নদী, ছোট জলাধার, পাহাড়ি ঢলপ্রবণ এলাকা, শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ের আগাম সতর্কতা ও সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালানো সুপার টাইফুন বাভি আগামী রবিবার চীনে আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।