ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার। তবে সাম্প্রতিক তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় স্বস্তি ফিরছে তেলের বাজারে। এ অবস্থায় বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্য থেকে তেল উৎপাদনের কোটা বা সীমা পুনরায় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেক প্লাস।
এই লক্ষ্যে রবিবার সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া ও ওমানের মতো প্রধান ওপেকের সদস্য দেশগুলোর জোটের মন্ত্রীরা ভার্চুয়ালি বৈঠকে মিলিত হন। পরে এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা দৈনিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদনে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা চলতি বছরের আগস্ট মাসে কার্যকর করা হবে।
উৎপাদন পুনরুদ্ধার
যদিও রবিবারের এই বৈঠকের আগেই তেল উৎপাদনকারী এই জোট দৈনিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল কোটা বাড়ানোর ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।
যদিও এর আগে জুন ও জুলাই মাসে একই পরিমাণ কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। রাশিয়াসহ ওপেক ও এর মিত্র উৎপাদকদের নিয়ে গঠিত ওপেক প্লাসের সাতটি মূল সদস্য দেশ এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কোটা বাড়িয়েছে।
তবে এই বৃদ্ধির বেশিরভাগটাই কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকের মতো ওপেক প্লাসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশগুলোর ট্যাংকার চলাচলের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
যুদ্ধের প্রভাব
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ওপেক প্লাসের দৈনিক উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। মে মাসে তা কমে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য ওপেক প্লাস দেশকে বেশি তেল রপ্তানিতে সহায়তা করার মার্কিন প্রচেষ্টার ফলে জুন মাস থেকে উৎপাদন কিছুটা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে। তবে এখনো তা যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের নিচে রয়েছে।
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক থেকে মে মাস পর্যন্ত কোটা বাড়াতে যাওয়া ৭টি দেশের মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক ও কুয়েতের সম্মিলিত উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল কমে গিয়েছিল।
স্বস্তি ও সরবরাহ
এদিকে গত ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। এর আওতায় তারা চুক্তির পরবর্তী আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের পথে সৃষ্ট বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
সুইস ব্যাংক ইউবিএস-এর পণ্যবাজার বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো এএফপিকে বলেন, আপাতত উৎপাদন সম্ভবত ওপেকের লক্ষ্যমাত্রার নিচেই রয়েছে।
সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলেও তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে এসেছে। চীনের আমদানি কমে যাওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদকদের রপ্তানি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে রেকর্ড কৌশলগত মজুদ ছাড় দেওয়ার কারণে দামে চাপ পড়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছে যে সরবরাহ শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।
ব্লুমবার্গ এজেন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ হয়তো ইতিমধ্যেই দৈনিক এক কোটি (১০ মিলিয়ন) ব্যারেল ছাড়িয়ে গেছে।
তবে স্যাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, বর্তমানে যে তেল এই প্রণালি দিয়ে যাচ্ছে, তা এতদিন ট্যাঙ্কার বা সংরক্ষণাগারে জমা ছিল। যদি জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে, তবে জুলাই মাসে পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাবে এবং সম্ভবত আগস্ট মাসেই উৎপাদন বৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। তারপরও বন্ধ হয়ে যাওয়া উৎপাদন পুনরায় চালু করতে সময় লাগবে।
রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন বলেছেন, আগামী বছরের জন্য সবাই উদ্বৃত্ত পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে। এরই মধ্যে মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ওপেক প্লাস কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এখন একদিকে যখন সদস্য দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চাপ দেবে, তখন জোটটিকে নিম্নমুখী দাম সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলেও জানান তিনি।
জুনের শেষের দিকে ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই জোটের কাছে তাদের উৎপাদন কোটা বাড়ানোর অনুরোধ করেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সময় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল তা পুষিয়ে নেওয়া যায়।
তবে হ্যানসেন বলেছেন, উচ্চতর কোটার বিষয়টি তাৎক্ষণিক কোনো প্রয়োজনীয়তা নয়, কারণ উৎপাদনের পরিমাণ এখনও সংঘাত-পূর্ববর্তী পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। ইরাকের অনুরোধটি হয়তো ২০২৭ সালের সক্ষমতা পর্যালোচনার অংশ হতে পারে, যেখানে উৎপাদনের ভিত্তি-মাত্রা বা ‘বেসলাইন’ খতিয়ে দেখা হবে।
নতুন চ্যালেঞ্জ
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি ওপেক প্লাস কিছু নতুন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট ছেড়ে দেয়ায় এবং ইরাক উচ্চ কোটার দাবি জানানোয় জটিলতা বেড়েছে।
সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান ও ওমান—এই সাত দেশ ২০২৩ সালে সম্মত হওয়া দৈনিক ১৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল সরবরাহ হ্রাসের ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। ওই সময় জোটে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ছিল।
কিন্তু উৎপাদন এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের সক্ষমতার সঙ্গে উৎপাদনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে চাওয়ায় গত এপ্রিলের শেষে জোট ছেড়ে দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ১ মে থেকে আমিরাতের বিদায় বিবেচনায় নিলে আগস্ট থেকে বাকি সাত দেশের হাতে বাজারে ফিরিয়ে আনার মতো আরও দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৭৯ হাজার ব্যারেল তেল রয়েছে। বর্তমান গতিতে উৎপাদন বাড়ানো অব্যাহত রাখলে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পুরো সরবরাহ হ্রাস পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়ে যাবে।