২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর শুরু হয়েছে ২১ জুন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে তিনি চীনের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২২ জুন রাতে চায়নার দালিয়ান ঝৌশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এই সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট, যখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে তিনি এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তার সঙ্গে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর বিভিন্ন সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় ছিল। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান সফর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘চায়নিজ পলিটিক্যাল ইকোনমি’ একটি বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী মডেল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এই মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখলেও বেসরকারি খাতকে সমানভাবে উত্সাহিত করে। অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং খাতে এই সমন্বিত নীতি দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল উন্নয়নশীল দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বহুমাত্রিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ‘চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামরিক, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম তারেক রহমানের এ সফরের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব ও অবকাঠামো ঘাটতি। চীনের সহযোগিতায় বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুেকন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অংশীদার। তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশ যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি করছে, যা শিল্পায়নকে গতিশীল করছে।
তবে এই সম্পর্কের কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য বিবেচ্য বিষয়। তাই একদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিছু কৌশল নিতে পারেন। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, কিন্তু একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রথমত, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না করে বহুমাত্রিক অংশীদারি গড়ে তোলা। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ থেকে অবকাঠামোগত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তি এবং ভারতের আঞ্চলিক সংযোগকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা জরুরি। চীনের বিনিয়োগকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে শুধু ঋণনির্ভর প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সমপ্রসারণ এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়িয়ে একটি ‘উভয় পক্ষের লাভজনক’ পরিবেশ তৈরি হবে। তৃতীয়ত, কৌশলগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা প্রযুক্তিগত অংশীদারির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সন্দেহ কমিয়ে আস্থা বাড়াতে হবে। এতে করে ‘ভূ-রাজনৈতিক সন্দেহ’ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। চতুর্থত, বহুমুখী জোট কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও রপ্তানি এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংযোগ-এই তিনটি স্তম্ভে সমন্বিত কূটনীতি গড়ে তোলা উচিত হবে। এতে করে বাংলাদেশ কোনো পক্ষের বিরাগভাজন না হয়ে বরং সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
সর্বশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য মূল পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে নিতে পারেন বাংলাদেশকে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা। বাস্তববাদী নীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
সর্বোপরি বলা যায়, চায়নার পলিটিক্যাল ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি কৌশলগত চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল থাকলে এই সম্পর্ক থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন সম্ভব। তারেক রহমানের এই চায়না সফর তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার এক সময়োপযোগী কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক (চায়না)









