• ই-পেপার

স্বাস্থ্যে দ্বিগুণ বরাদ্দ বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

রক্তক্ষয়ী কঙ্গোতে শান্তির পতাকা উত্তোলনে সেনাবাহিনীর বীরত্ব

অনলাইন ডেস্ক
রক্তক্ষয়ী কঙ্গোতে শান্তির পতাকা উত্তোলনে সেনাবাহিনীর বীরত্ব

বিশ্বজুড়ে অশান্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাতিসংঘের অধীনে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। প্রতি বছর ২৯ মে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’। ১৯৪৮ সালে এ মিশনের যাত্রা হলেও বাংলাদেশ এতে যুক্ত হয় ১৯৮৮ সালে। কঙ্গো, মালি, সুদান ও সোমালিয়ার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পেশাদারি, সাহসিকতা এবং জীবন উৎসর্গ করে বাংলাদেশ আজ শান্তিরক্ষী প্রেরণে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। আফ্রিকার খনিজ সমৃদ্ধ দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পরিবেশ ও ভাষাগত চ্যালেঞ্জ এবং ঐতিহাসিক চে অঞ্চলে সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক, জেনারেল মাহবুব হায়দার খান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বীরত্বের কথা।

প্রশ্ন : প্রতি বছর ২৯ মে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটির তাৎপর্য কী?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : শান্তিরক্ষা দিবসটি ১৯৪৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হলেও বাংলাদেশে আমরা প্রথম যৌথভাবে (স্থানীয় জাতিসংঘ অফিস ও সশস্ত্র বাহিনী) এটি উদ্যাপন শুরু করি ২০০৭ সালে। এ দিনটির বড় তাৎপর্য হলো আমরা সারা পৃথিবীতে শান্তির বাণী পৌঁছে দেব। সাধারণ মানুষের ধারণা সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধ করার জন্য। কিন্তু সেই ধারণা বদলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজেও ব্যবহার করা যায়, সেই বিশেষ ভাবনাটি আমরা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমাদের শান্তিরক্ষীদের অবদানের কারণে আজ বহু দেশে শান্তি ফিরে এসেছে এবং মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ধাবিত হচ্ছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে শান্তির পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছে। কবে বাংলাদেশের এই শান্তিরক্ষা মিশনের যাত্রা হয়েছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম অংশ নেয় ১৯৮৭-৮৮ সালে ‘অবজারভার’ বা ‘পর্যবেক্ষক মিশন’ হিসেবে। পরে জাতিসংঘের প্রধান শাখা (ডিপিকেও) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল পেশাগত দক্ষতা ও সুনামের ওপর ভরসা করে আমাদের ট্রপস বা পূর্ণ সেনাদল মোতায়েনের আমন্ত্রণ জানায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনগুলোতে অংশ নিয়ে আসছে। যার মধ্যে সোমালিয়া, সুদান এবং কঙ্গো অন্যতম। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আমাদের বাহিনী দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশিদের এ আত্মত্যাগকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : এই ১৭৪ জনের আত্মত্যাগ একদিকে যেমন অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, অন্যদিকে এটি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বগাথা। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন সংঘাত তৈরি হয়, তখন আমরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশের সম্মান ও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকি। এটা আমাদের সেনাদের ‘সুপ্রিম স্যাক্রিফাইস’ বা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। এ ত্যাগের নেপথ্যের গল্পগুলো দেশবাসীর জানা উচিত।

প্রশ্ন : জাতিসংঘ কেন কঙ্গোতে মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং কঙ্গো কীভাবে এতটা ভয়াবহ সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ল?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : কঙ্গো এক দুর্ভাগা দেশ, যা আগে ‘জায়ারে’ নামে পরিচিত ছিল। দেশটি সোনা, হীরা, কোবাল্ট, কোল্টানের মতো মহামূল্যবান খনিজ সম্পদে ঠাসা। এর জমিও এত উর্বর যে কোনো সার ছাড়াই চমৎকার ফসল ফলে। এ বিপুল সম্পদের প্রতি বহির্বিশ্বের এবং ভিতরের স্বার্থান্বেষী মহলের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। প্রায় ২৫০ বছর ঔপনিবেশিক শোষণের পর ১৯৬০ সালে তারা স্বাধীনতা পেলেও জাতিগত বিভেদ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সংঘাত থামেনি। ১৯৯৪ সালে পাশের দেশ রুয়ান্ডায় যে ভয়াবহ গণহত্যা (জেনোসাইড) হয়, তার ফলে অনেক সশস্ত্র বিদ্রোহী দল কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ঢুকে পড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এ হানাহানিতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পর ১৯৯৯ সালে ‘লুসাকা চুক্তি’ অনুযায়ী জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমি একটু যোগ করি। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পরপরই অরাজকতার কারণে জাতিসংঘ ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখানে প্রথমবার শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মিশন গুটিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের চুক্তির পর আবার ‘মনুক’ মিশন শুরু হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি ‘মনুস্কো’ নামে অদ্যাবধি চলছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ২০০৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কঙ্গোতে সক্রিয় অবদান রেখে চলেছে।

প্রশ্ন : কঙ্গোতে আপনারা ‘চ্যাপ্টার সেভেন’ অপারেশনের অধীনে কাজ করেছেন, এটি আসলে কী ধরনের অপারেশন ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : ২০০৩ সালে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ‘ইতুরি’র রাজধানী ‘বুনিয়া’তে জাতিসংঘের ক্যাম্পের ওপর মিলিশিয়ারা (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) অতর্কিত ও ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেলে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল ‘চ্যাপ্টার সেভেন’ অনুমোদন করে। এর আওতায় শান্তিরক্ষীদের কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, জাতিসংঘ কর্মী ও এনজিওদের জীবন বাঁচাতে সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অপারেশন ও বলপ্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। বিশ্বের খুব কম মিশনে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়, কঙ্গো তার একটি। সুদানে একটি, তার পরে লেবাননে একটি। এ তিন-চারটি শুধু জাতিসংঘের এই চ্যাপ্টার সেভেনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

প্রশ্ন : যুদ্ধ বলতে সাধারণ দর্শক টিভি পর্দা বা পত্রিকার পাতা বোঝে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি আসলে কতটা ভয়ংকর ও জটিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার ডাইমেনশন বা মাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যখন কঙ্গোতে চ্যাপ্টার সেভেন অপারেশনের অধীনে ইতুরি ননগ্রেন্ডার অপারেশন পরিকল্পনা করছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল এ্যভেবা নামক এলাকার একটি স্কুল ও তার চারপাশের অঞ্চল থেকে মিলিশিয়াদের (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) প্রধান ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের উৎখাত করা।

এ অভিযানে আমাদের শক্তি বাড়ানোর জন্য (অগমেন্ট করতে) কঙ্গোর রাজধানী থেকে সরকারি বাহিনীর একটি বিশেষ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। কিন্তু তারা যখন ‘আবা’তে এসে পৌঁছাল, আমরা দেখলাম তারা ছিল অত্যন্ত ‘ইল-ফেড’ এবং ‘ইল-ইকুইপড’ (খাবার ও সরঞ্জামহীন)। তাদের নিজেদের কোনো খাবার ছিল না, পর্যাপ্ত অস্ত্র বা গোলাবারুদও ছিল না। প্রথম দিন থেকেই আমাদের নিজেদের তহবিল থেকে তাদের খাবার, অস্ত্র ও অ্যামুনিশন (গোলাবারুদ) দিয়ে সাহায্য করতে হয়েছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হলো যখন আমরা অপারেশন শুরু করে একদম শত্রুর লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। তীব্র যুদ্ধক্ষেত্রে কঙ্গোলিজ কমান্ডোরা প্রচুর ‘ক্যাজুয়ালটি সাফার’ করল, অর্থাৎ তাদের অনেক সেনা মারা গেল এবং গুরুতর আহত হলো। এ ক্ষয়ক্ষতি দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি (ডিনাই) জানাল। তারা বিদ্রোহ (রিভল্ট) করে বসল এবং আমাদের বলল, ‘তোমরা আর সামনে যেতে পারবে না’।

কঙ্গোলিজ সেনারা গাড়ি থেকে নেমেই নিজেদের রিজনাল কমান্ডারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ‘ইনডিসক্রিমিনেটলি’ (এলোপাতাড়ি) গুলি ও গ্রেনেড হামলা শুরু করল। তাদের ক্ষোভ ছিল রাজধানী কিনশাসা থেকে আসার পর তাদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি এবং যথাযথ সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের মরার জন্য যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামরিক পরিভাষায় একে আমরা বলি ‘কোঅর্ডিনেশন’-এর অভাব। অর্থাৎ ভিন্ন দুটি বাহিনী যখন একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও বিশ্বাস না থাকলে শত্রুর চেয়েও নিজের ফ্রেন্ডলি ফোর্স বা মিত্রবাহিনী কত বড় ভীতি ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কঙ্গোর এ ঘটনাটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

প্রশ্ন : আপনাদের মিশনে কোন কোন দেশের বাহিনী যুক্ত ছিল এবং তাদের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে করেছেন?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : ‘মনুক’ মিশনে বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান, নেপাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, গুয়েতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, ইন্ডিয়াসহ প্রায় ১২টির বেশি দেশের শান্তিরক্ষী যুক্ত ছিল। সেখানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইউটিলিটি হেলিকপ্টারও মোতায়েন ছিল। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাটি আয়তনে প্রায় গোটা বাংলাদেশের সমান বড় ছিল। এত বড় দুর্গম এলাকায় বিভিন্ন দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত চমৎকার সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সামরিক অপারেশন পরিচালনা করেছি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩-এর ওপর মূলত কোন কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমাদের মূল দায়িত্ব ছিল কঙ্গোর আসন্ন সাধারণ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে হতে পারে, সেজন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। তখন সেখানে চরম অরাজকতা চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা ৩ হাজারের বেশি ছোটবড় অভিযান পরিচালনা করেছি। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা রক্ষা, সাধারণ নাগরিকদের গণহত্যা থেকে বাঁচানো, মিলিশিয়াদের ক্যাম্প উচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাকে এসকর্ট বা নিরাপত্তা দেওয়া ও পুনর্গঠনমূলক কাজ করাই ছিল আমাদের প্রধান দায়িত্ব।

প্রশ্ন : আপনাদের পরিচালিত প্রথম বড় অভিযান ‘অপারেশন বোগা’ কখন শুরু হয়েছিল এবং এর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : ২০০৫ সালের ২২ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের ‘অপারেশন বোগা’ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। বোগা অঞ্চলটি আমাদের মূল ক্যাম্প থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে গভীর জঙ্গল ও উঁচু পাহাড়ে ঘেরা এলাকা ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কোনো পূর্ব তথ্য বা ‘গ্রাউন্ড রেকি’ করার সুযোগ ছাড়াই ৯ সেপ্টেম্বর প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আমরা রওনা হই। আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশি সেনা ছাড়াও লোকাল আর্মি, সেনেগালি ও মরোক্কান ফোর্স ছিল। এক দিনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে তিন দিনে আমরা অর্ধেক পথও যেতে পারিনি। কাঠের বড় বড় গুঁড়ি দিয়ে কালভার্ট বানিয়ে ৫০-৬০টি সাঁজোয়া গাড়ি পার করতে হয়েছে। তৃতীয় দিনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর মাধ্যমে জানতে পারি ১৫ কিলোমিটার সামনে পাহাড়ের চূড়ায় ২০০ মিলিশিয়া আমাদের অ্যামুশ (ওত পেতে আক্রমণ) করার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যেই পিচ্ছিল রাস্তায় পিছলে একটি এপিসি ১০ জন সেনা নিয়ে ৫০ ফুট নিচে খাদে পড়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আমরা দ্রুত সবাইকে জীবিত ও বড় কোনো আঘাত ছাড়াই উদ্ধার করতে সক্ষম হই। পরে বিকল্প প্ল্যান অনুযায়ী হেলিকপ্টাওে সেনা পাঠিয়ে অভিযান সম্পন্ন করা হয়।

প্রশ্ন : পরিবেশগত বৈরিতার পাশাপাশি ভাষাগত পার্থক্য তো ছিলই। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আপনারা কী ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : কঙ্গোতে ফ্রেঞ্চ (ফরাসি) এবং স্থানীয় সোয়াহিলি ভাষা ব্যবহার করা হতো। তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা বিশ্বস্ত লোকাল ইন্টারপ্রেটার (দোভাষী) ব্যবহার করতাম। এ ছাড়া আমাদের গোয়েন্দাদল এবং টহলদল স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তথ্য আনত। ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’-এর মতো জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা থেকেও তথ্য পেতাম। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদ্রোহীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবননাশের আশঙ্কায় সহজে মুখ খুলতে বা তথ্য দিতে চাইত না। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের চেয়ে এখানকার তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি জটিল ও সীমাবদ্ধতাপূর্ণ।

প্রশ্ন : ‘চে’ অঞ্চলে প্রথম দুটি অভিযান কেন ব্যর্থ হয়েছিল এবং পরে ‘অপারেশন ইতুরি এক্সপ্লোরার’ কীভাবে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : কঙ্গোর ‘চে’ রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সীমান্ত সংযোগস্থলে অবস্থিত অত্যন্ত গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা। দুর্গম হওয়ায় মিলিশিয়ারা একে তাদের মূল প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং অস্ত্রাগার (বেস ক্যাম্প) বানিয়েছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে ‘চে’ দখল করা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। এর আগে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্যান্য দেশের বাহিনী নিয়ে দুটি অভিযান চালানো হলেও বিদ্রোহীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হয়। তৃতীয়বার মে মাসে যখন আমরা অপারেশনের দায়িত্ব পাই, তখন আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘ওয়ারগেমিং’ বা রণকৌশল মহড়া করি। ভাষার ভিন্নতা ও যোগাযোগের সমস্যা দূর করার পরিকল্পনা করা হয়। আগে শুধু একদিক থেকে আক্রমণ করা হয়েছিল, এবার আমরা তিন দিক থেকে (উত্তর, কেন্দ্র ও দক্ষিণ টাস্কফোর্স) একযোগে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাই এবং কঙ্গো সরকারি বাহিনীকে সামনে রেখে সফলভাবে শত্রুর দুর্গ ধ্বংস করি।

প্রশ্ন : এই পুরো অপারেশনের সময় চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক : বড় সমস্যা ছিল ‘মাল্টি-লিঙ্গুয়েস্টিক’ বা বহুভাষিক জটিলতা। ৮-১০টি দেশের যৌথ বাহিনীর সবাই ইংরেজি জানত না, এমনকি আমাদের সঙ্গে থাকা কঙ্গোলিজ সেনারাও না। দোভাষী থাকলেও যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে মনের ভাব হুবহু প্রকাশ করা কঠিন হতো। এ ছাড়া সিগন্যাল যন্ত্রাদির বিভিন্নতা অপারেশনের চ্যালেঞ্জ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়।

প্রশ্ন : কঙ্গোতে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের সবচেয়ে বড় অর্জন কী ছিল?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন : আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও ওই রক্তাক্ত এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনা। যার ফলে স্থানীয় মানুষ আশ্বস্ত হয়ে কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম একটি সফল ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছিল এবং বিদ্রোহী মিলিশিয়াদের চলাচল ও কার্যক্রম বহুলাংশে সীমিত করা সম্ভব হয়েছিল।

প্রশ্ন : সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের এ অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ দর্শকদের উদ্দেশে শেষ কী বলবেন?

জেনারেল মাহবুব হায়দার খান : এই আন্তর্জাতিক মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদার প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের কৌশলের ওপর আমাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা যে ধ্রুপদি রণকৌশল ব্যবহার করে ‘চে’ অঞ্চল মুক্ত করেছি, তা ছিল বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে অনন্য। এ বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের শিক্ষা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১০ জেলায় আজ থেকে চালু হচ্ছে আইসিইউ

অনলাইন ডেস্ক
১০ জেলায় আজ থেকে চালু হচ্ছে আইসিইউ

দেশের ১০ জেলা সদর হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু করা হচ্ছে। জরুরি রেসপন্স ও মহামারি প্রস্তুতি (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় এসব আইসিইউ স্থাপন করা হবে।

রোববার (১৪ জুন) এসব হাসপাতালের আইসিইউ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

যেসব হাসপাতালে নতুন আইসিইউ চালু হচ্ছে সেগুলো হলো, মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল, গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, শেরপুর ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল, মাদারীপুর জেলা হাসপাতাল এবং বাগেরহাট জেলা হাসপাতাল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি আইসিইউতে প্রয়োজনীয় পেডিয়াট্রিক ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় জনবলও। এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জন্য উন্নতমানের জরুরি ও নিবিড় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা পর্যায়ে এই আইসিইউগুলো পুরোদমে চালু হলে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক জটিল রোগীদের উন্নত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার’ সেবার জন্য আর রাজধানী বা বড় শহরের দিকে ছুটতে হবে না। স্থানীয় পর্যায়েই এখন থেকে জরুরি ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

১০ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কতা

অনলাইন ডেস্ক
১০ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কতা
ফাইল ছবি

দেশের কয়েকটি অঞ্চলে দুপুরের মধ্যে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। একইসঙ্গে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে।

রবিবার (১৪ জুন) দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দুপুর ১টা পর্যন্ত আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।

বার্তায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

এ সময় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। তাই ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেওয়া সতর্কবার্তায় এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

অর্থ পাচার রোধ, দুর্নীতি দমন, জনসচেতনতা

বাজেট বাস্তবায়নের তিন উপায়

অনলাইন ডেস্ক
বাজেট বাস্তবায়নের তিন উপায়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন, সদ্য ঘোষিত বাজেট তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত বৃহস্পতিবার বিএনপি সরকার তার প্রথম বাজেটে জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেছে। জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটেছে প্রস্তাবিত বাজেটে। নতুন সরকার ক্রান্তিকালে বাজেট পেশ করেছে এবং সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস চালিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, সুষম উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনজীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান বহুমাত্রিক সংকট কাটানোর যে রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে তা জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন।

সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হারে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ এবং প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সাধুবাদযোগ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, এসব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও এগিয়ে যাবে।

কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব যথোপযুক্ত। কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার। কৃষি ও কৃষকের জন্য যা কিছু কল্যাণকর সেগুলোর দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্পকারখানায় উৎপাদনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে জোরালো আইনি সমন্বয়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাহসী বাজেট। এ বাজেটে যেমন ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ আছে, তেমনি স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টাও বিদ্যমান। এ বাজেটে সরকারের দেশপ্রেমের অনেক স্বাক্ষর রয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। বন্ধ কলকারখানা চালুসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাজেট পেশ করার পর অনেকেই এর বাস্তবায়নের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন।

সিপিডিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে আরও বেশি কাজ করতে হবে। এ চ্যালেঞ্জটাই নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা’ ও ‘বাস্তবসম্মত ভিত্তির’ বড় ধরনের অভাব রয়েছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বাজেটে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এক বছরের মধ্যে এ বিশাল রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যদি রাজস্ব আদায় কম হয় এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং তা পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে, যেভাবে মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন সেটা যদি অব্যাহত রাখতে পারেন তাহলে এ বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সরকারকে তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।

প্রথমত, কর আদায়ে জনগণকে সচেতন করা।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি বন্ধ করা।

তৃতীয়ত, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং অর্থ পাচার রোধ করা।

এই তিনটি কাজ করতে পারলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে না। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, বাজেট ঘোষণার পর সবাই বাজেটকে জনকল্যাণমুখী হিসেবে দেখছেন। সবার সংশয় এর বাস্তবায়ন সম্ভব কি না তা নিয়ে।

বাজেট রাজস্ব আদায়কেই সরকারের ব্যয় নির্বাহের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন না, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার অনেক কম। একটি বিশাল পরিমাণ জনগোষ্ঠী কর কাঠামোর বাইরে। এবারের বাজেটে কর নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতার অভাবের চেয়ে মানসিকতার অভাব বেশি বাধা। এবারের বাজেটে কর কাঠামোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ের জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। দেশের জনগণকে বোঝাতে হবে, এ দেশ তাদের। জনগণের করের টাকায় তাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করা হবে। কর প্রদানে অনীহা দূর করার জন্য সরকার সংসদ সদস্যদের কাজে লাগাতে পারে। তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় জনগণের কাছে গিয়ে তারা যদি কর প্রদানের যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তাহলে নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যায়। একজন নাগরিক যদি বুঝতে পারেন, তার জীবন মানের উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজে এ টাকা ব্যবহার করা হবে, তাহলে জনগণ কর দিতে উৎসাহিত হবে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছেন। ইতোমধ্যে তাঁর ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস জন্মেছে। প্রধানমন্ত্রী যদি এ জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজে নেতৃত্ব দেন তাহলে কাজটা অনেক সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করতে হবে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বাজেটের অন্তত ত্রিশ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি ও অপচয় হয়। তাই এই দুর্নীতির ছিদ্র বন্ধ করতে হবে। এখন এ সংকটকালে সব ধরনের অপচয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। দেশের জনগণ যদি বুঝতে পারে তাদের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তাহলে তারা কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরই দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সরকারের অপচয় কমাতে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যয় সংকোচ, বিনা কারণে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করাসহ তারেক রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগ ব্যপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে দুর্নীতির রাহু থেকে বাংলাদেশ মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আশাকরি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি প্রতিরোধে সাহসী পদক্ষেপ নেবেন। দেশের জনগণ এ বিষয়ে তাঁর পাশে থাকবে সবসময়।

তৃতীয়ত, অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে হবে যেকোনো মূল্যে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে (২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩ হাজার ৪০০ কোটি (২৩৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে, যা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদে দেওয়া সরকারি হিসাব এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এই টাকা ফেরত আনতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি পাল্টে যাবে। আশার কথা এ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য এবারের বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইউনূস সরকার তাঁর দেড় বছরের শাসনকালে এ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

ইউনূস এবং তৎকালীন গভর্নর পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের নামে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিদেশে সফর করেছেন। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করেছেন। ইউনূস সরকারের অনেকের বিরুদ্ধেও এখন দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি, বিএনপি বিগত সব আমলের অর্থ পাচার নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। নতুন করে যেন অর্থ পাচার না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে সরকারকে। সরকার যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে তেমনি দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। ব্যাংকিং খাতে ফিরবে শৃঙ্খলা এবং স্বস্তি। তাই আপাতদৃষ্টিতে এ বাজেট বাস্তবায়নকে যারা কঠিন এবং অবাস্তব মনে করছেন, তারা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং বিচক্ষণতাকে বিবেচনায় নিতে পারেননি। দেশের মানুষ আশাবাদী কারণ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, তারেক রহমান আন্তরিক। তিনি পিতা ও মাতার মতোই জনকল্যাণে নিবেদিত। আপাতত দৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও এ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। সম্ভব অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন