গম, চাল বা ভুট্টা থেকে তৈরি প্রক্রিয়াজাত দানাদার খাদ্য উপাদান হলো সুজি, যা আন্তর্জাতিকভাবে সেমোলিনা নামে পরিচিত। হালকা ও সহজপাচ্য হওয়ায় এটি সকালের নাশতা থেকে শুরু করে অসুস্থ অবস্থার খাদ্যতালিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।
সুজিতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডায়েটারি ফাইবার ও প্রোটিন, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। পাশাপাশি এতে থিয়ামিন, ফোলেট, রাইবোফ্ল্যাভিন ও আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও থাকে, যা শরীরকে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। সহজে হজম হওয়ায় এটি দ্রুত শক্তি পাওয়ার একটি ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমান সময়ে অনেকেই ময়দা এড়িয়ে চলেন, আবার ওটস বা কর্নফ্লেক্সেও একঘেয়েমি চলে আসে। এমন পরিস্থিতিতে সকালের নাশতায় ভিন্ন কিছু খুঁজলে সুজি একটি সহজ ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। সাধারণত আমাদের দেশে সুজি বলতে হালুয়া বানানোর কথাই বেশি মনে হয় অথবা এটাকে শিশু বা রোগীর খাবার হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এটি দিয়ে তৈরি করা যায় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার।
সুজির ঝাল উপমা
সকালের নাশতা বা বিকেলের হালকা খাবার হিসেবে সুজির ঝাল ঝাল উপমা খুবই জনপ্রিয়। এটি তৈরি করতে প্রথমে একটি প্যানে ২ টেবিল চামচ তেল গরম করে আধা চা চামচ সরিষা ফোড়ন দিন। এরপর একটি মাঝারি আকারের পেঁয়াজ কুচি, আধা কাপ গাজর কুচি, আধা কাপ ক্যাপসিকাম কুচি এবং ২-৩টি কাঁচামরিচ কুচি দিয়ে ২-৩ মিনিট ভেজে নিন। সবজি কিছুটা নরম হয়ে এলে ১ কাপ সুজি দিয়ে মাঝারি আঁচে ৪-৫ মিনিট নাড়তে নাড়তে ভাজুন। সুজি হালকা সোনালি রং ধারণ করলে আড়াই কাপ গরম পানি ও স্বাদমতো লবণ যোগ করুন। এরপর অনবরত নাড়তে থাকুন যাতে দলা না বেঁধে যায়। পানি শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে এলে চুলা বন্ধ করে ২ মিনিট ঢেকে রাখুন। চাইলে পরিবেশনের আগে সামান্য ধনেপাতা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
সুজির চিলা
সুজির চিলা এক ধরনের স্বাস্থ্যকর ও মজাদার প্যানকেক, যা সবজি দিয়ে তৈরি করা হয়। প্রথমে একটি বড় পাত্রে ১ কাপ সুজি, আধা কাপ টক দই এবং প্রয়োজনমতো পানি মিশিয়ে ঘন ব্যাটার তৈরি করুন। এরপর এতে আধা কাপ পেঁয়াজ কুচি, আধা কাপ টমেটো কুচি, আধা কাপ গাজর কুচি, ২টি কাঁচামরিচ কুচি, আধা চা চামচ জিরা গুঁড়ো, সামান্য চিলি ফ্লেক্স ও স্বাদমতো লবণ মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি ১০-১৫ মিনিট ঢেকে রাখুন, যাতে সুজি ফুলে নরম হয়ে যায়। এবার একটি নন-স্টিক তাওয়া গরম করে সামান্য তেল ব্রাশ করুন। এক চামচ ব্যাটার ঢেলে গোল করে ছড়িয়ে দিন। মাঝারি আঁচে ৩-৪ মিনিট রান্না করে এক পাশ সোনালি হলে উল্টে দিন। অন্য পাশও মচমচে করে ভেজে গরম গরম পরিবেশন করুন। টমেটো সস বা ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে খেতে দারুণ লাগে।
ইতালিয়ান সেমোলিনা নিয়াকি
ইতালির জনপ্রিয় এই খাবারটি বাইরে থেকে মুচমুচে এবং ভেতরে নরম হয়। এটি তৈরির জন্য প্রথমে একটি সসপ্যানে ২ কাপ দুধ, ২ টেবিল চামচ মাখন, সামান্য লবণ এবং এক চিমটি জায়ফল গুঁড়ো নিয়ে ফুটিয়ে নিন। দুধ ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে ধীরে ধীরে ১ কাপ সুজি ঢালুন এবং একটানা নাড়তে থাকুন যাতে দলা না বাঁধে। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। এরপর এতে ১টি ডিম ও আধা কাপ গ্রেট করা চিজ মিশিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। একটি মাখন মাখানো ট্রেতে মিশ্রণটি ছড়িয়ে দিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। শক্ত হয়ে গেলে ছোট গোল বা চৌকো টুকরো করে কেটে নিন। একটি বেকিং ডিশে টুকরোগুলো সাজিয়ে ওপর থেকে আরও কিছু চিজ ও সামান্য মাখন ছড়িয়ে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ১৫-২০ মিনিট বেক করুন। উপরে সোনালি রং ধরলেই পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত।
মরোক্কান প্যানকেক
মরক্কোর এই ঐতিহ্যবাহী প্যানকেকের বিশেষত্ব হলো এর ওপরে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি হয়। এটি বানাতে একটি পাত্রে দেড় কাপ সুজি, ৪ টেবিল চামচ ময়দা, এক চিমটি লবণ এবং হালকা গরম পানি মিশিয়ে মসৃণ ব্যাটার তৈরি করুন। ব্যাটারটি ১০-১৫ মিনিট ঢেকে রাখুন। রান্নার ঠিক আগে এতে ১ চা চামচ বেকিং পাউডার বা ইনো মিশিয়ে নিন। একটি নন-স্টিক প্যান মাঝারি আঁচে গরম করে তাতে এক হাতা ব্যাটার ঢেলে দিন। কোনো তেল বা মাখন ব্যবহার করবেন না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্যানকেকের ওপর অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি হবে। উপরের অংশ শুকিয়ে গেলে নামিয়ে নিন। এটি উল্টানোর দরকার হয় না। পরিবেশনের সময় মধু, মাখন বা খেজুরের সিরাপ ছড়িয়ে দিলে স্বাদ আরো বেড়ে যায়।
তিসি দিয়ে বেকড সুজির ধোকলা
এই রেসিপিটি স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর নাশতা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। প্রথমে একটি পাত্রে ১ কাপ সুজি, ২ টেবিল চামচ বেসন, ১ কাপ টক দই, সামান্য লবণ, ১ চা চামচ আদা কুচি ও ২টি কাঁচামরিচ কুচি মিশিয়ে প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ব্যাটার তৈরি করুন। মিশ্রণটি ৩০ মিনিট রেখে দিন যাতে সুজি ফুলে যায়। এরপর ব্যাটারে ১ চা চামচ ইনো এবং ১ টেবিল চামচ তিসির দানা মিশিয়ে নিন। একটি বেকিং ট্রেতে সামান্য তেল মেখে ব্যাটার ঢেলে দিন। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আগে থেকে গরম করা ওভেনে ১৫-২০ মিনিট বেক করুন। ওভেন না থাকলে ভাপেও রান্না করা যায়। রান্না হয়ে গেলে ওপরে সর্ষে, কারিপাতা ও শুকনা মরিচের ফোড়ন ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। এটি চাটনি বা সসের সঙ্গে খেতে খুবই সুস্বাদু।





