কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টার শিকার নারী, পুরুষ, শিশুসহ ১২ জন ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে আড়াই বছরের শিশু সামাদসহ চার শিশু তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বড়দের ঠান্ডা, কাশিসহ নানান শারীরিক দুর্বলতার উপসর্গ দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ৫ দিন ধরে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় পাটক্ষেতে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি ও গরমের মধ্যে এক কাপড়ে অবস্থানের কারণে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসব কারণে তাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানান, অসুস্থদের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে। শিশু সামাদের শারীরিক অবস্থা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। বিজিবির কড়া নজরদারি থাকলেও মানবিক কারণে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা তাদের জন্য শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করেছেন।
এদিকে শূন্যরেখায় অবস্থানরত ১২ জনকে ঘিরে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেও নতুন করে আরো তিনটি পৃথক সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আবারও পুশ ইনের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চর বিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে ৪ জন এবং জয়পুর সীমান্ত দিয়ে আরো ৮ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া গত রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চল্লিশপাড়া সীমান্ত দিয়ে শাহাবুদ্দিন (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে পুশ ইনের চেষ্টা করলে বিজিবি তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়। বিজিবি জানায়, তাদের কড়া নজরদারি ও টহলের কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বিজিবি জানায়, গত শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বিলগাথুয়া সামান্ত দিয়ে বিএসএফ নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় সমাধানের লক্ষ্যে ওই দিন বিকেল ৪টায় পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বিএসএফের অসহযোগিতার কারণে বৈঠকটি হয়নি।
পরবর্তীতে গত শনিবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ৯টায় বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস পিলার সংলগ্ন এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ১২ জন ব্যক্তি এখনও পর্যন্ত গত ৫ দিন ধরে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
পতাকা বৈঠকে বিজিবির পক্ষে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির উপ-অধিনায়ক নুরুল হুদার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল এবং বিএসএফের পক্ষে রানীনগর কম্পানি কমান্ডার এসি সুনিল কুমার ইয়াদবের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
বৈঠকে বিএসএফ দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের অভিযোগ অস্বীকার করে এবং শূন্যরেখায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের নিজেদের হেফাজতে নিতে রাজি হয়নি। এ অবস্থায় বিজিবি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানালে বিএসএফ বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাতে সময় চায়।
এরই মধ্যে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষি বাহিনী বিএসএফ প্রতি রাতেই পুশ ইনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনতার কঠর নিরাপত্তায় তারা বার বার ব্যর্থ হচ্ছে বলেও জানান বিজিবি সূত্র।
এদিকে পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উজির আলী (৫০), তার স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), ছেলে শিহাদ (১৭), ইনজামুল (৮) ও আড়াই বছরের শিশু সামাদ। এছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আরও দুটি পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন।
স্থানীয় চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম বলেন, মানবিক কারণে তাদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি চারজন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে আড়াই বছরের একটি শিশু উচ্চ জ্বরে আক্রান্ত। তাছাড়া বিভিন্ন বয়সের আরও তিনটি শিশু শর্দি, কাশি ও জরে আক্রান্ত। আমি প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দিয়ে এসেছি। বড়রাও ঠান্ডা-কাশিতে ভুগছেন। তারা জানিয়েছেন, ১২ থেকে ১৫ দিন ধরে তারা গোসল করতে পারেননি এবং এখন ৫ দিন ধরে খোলা মাঠে অবস্থান করছেন।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি কালের কন্ঠকে বলেন, বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়েছে। বিএসএফ পুশ ইনের অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টি তদন্তের জন্য সময় চেয়েছে। বর্তমানে ১২ জন ব্যক্তি শূন্যরেখার প্রায় ৫০ মিটার ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি কোনো পুশ ইন বরদাশত করা হবে না।