চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যায় ছয় দুর্বৃত্ত অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের আশরাফিয়া ফার্মেসির সামনে তাকে গুলি করা হয়।
নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ (৪৫) রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মৃত আব্দুল খালেক চৌধুরীর ছেলে।
আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেতাগী ইউনিয়ন থেকে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও তার নাম আলোচনায় ছিল। তিনি সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় ৬ সন্ত্রাসী। এরমধ্যে দুজন খুব কাছ থেকে তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। হামলাকারীদের মধ্যে দুজনের হাতে পিস্তল ছিল। এদের মধ্যে একজন টি-শার্ট ও জিন্স প্যান্ট পরিহিত ছিল। তারা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় মাসুদের খুব কাছে গিয়ে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পর পর গুলি ছুঁড়ে মুহূর্তের মধ্যে এলাকা ত্যাগ করে। মাথায় গুলি লাগায় ঘটনাস্থলেই মাসুদের মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল শনিবার দুপুরে পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের আশরাফিয়া ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনছিলেন মাসুদ। এ সময় ৬ জনের একটি অস্ত্রধারী দল তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। এতে মাথা, বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ১০ থেকে ১২টি গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। গুলিবর্ষণের পর হামলাকারীরা সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে কদলপুরের দিকে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর আতঙ্কে বাজারের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
খবর পেয়ে রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন এবং রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। পরে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাঙ্গুনিয়ার বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ স্থানীয়রা চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পাহাড়তলী চৌমুহনী অবরোধ করেন। এ সময় তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই সময় হাফেজ বজলুল রহমান সড়কেও অবরোধ করা হয়। পরে রাঙ্গুনিয়ার শান্তিরহাট, গোছারা চৌমুহনী, ইছাখালী ও রোয়াজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং যানবাহন আড়াআড়ি করে রেখে বিক্ষোভ করা হয়। এতে সড়কে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
বিকাল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পাহাড়তলী এলাকার অবরোধ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন। পরে ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নিহতের বড় ভাই নিজামুল হক চৌধুরী তপন বলেন, ‘গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমরা অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। মিথ্যা মামলায় আমার ভাই জেলে গেছে, কিন্তু খুন হয়নি। সেসময় আওয়ামী লীগ আমার ভাইকে হত্যা করেনি। আজ দলের সুসময়ে আমার ভাইকে প্রকাশ্যে বাজারে হত্যা করা হলো। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?
স্থানীয়দের ধারণা, বালুর ব্যবসা নিয়ে বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়াও হত্যার কারণ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সাগর নামের এক ব্যক্তি বলেন, আগামী ইউপি নির্বাচনে মাসুদ প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। তাই পথের কাঁটা সরাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হককে রাউজানের পাহাড়তলী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কারা এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। তারা পাহাড়ে কিংবা নদীতে যেখানেই থাকুক, ছাড় পাবে না।’