দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়া ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের নাম পটিয়া জিমনেসিয়াম। তৎকালীন ‘পটিয়া যুব গোষ্ঠীর ভবন ও ব্যায়ামাগারথ। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে, ১৯৭৯ সালের ৯ জুন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একসময় ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়াবিদ, শরীরচর্চাবিদ ও তরুণ সমাজের স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, রাজনৈতিক পালাবদল ও দীর্ঘ অবহেলায় আজ সেই ঐতিহ্যবাহী জিমনেসিয়াম হারিয়েছে তার জৌলুস।
একসময় সকাল-সন্ধ্যা তরুণদের পদচারণায় মুখর থাকা ব্যায়ামাগারটি এখন দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে। জীর্ণ দেয়াল, ভাঙাচোরা অবকাঠামো, অচল যন্ত্রপাতি আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়া আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
স্থানীয় ক্রীড়াবিদ ও প্রবীণ সংগঠকদের অভিযোগ, শহীদ জিয়ার স্মৃতি বহনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়া উন্নয়নে নানা প্রকল্পের ঘোষণা এলেও পটিয়া জিমনেসিয়ামের ভাগ্য বদলাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ে একসময়কার প্রাণচঞ্চল এই ক্রীড়া কেন্দ্র।
তবে দীর্ঘদিনের সেই হতাশার মাঝে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে সম্প্রতি পটিয়ায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য মিনি স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনামের অনুরোধে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক ঐতিহাসিক পটিয়া জিমনেসিয়াম পরিদর্শন করেন এবং এর বর্তমান অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী জিমনেসিয়ামের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক, প্রশিক্ষক ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, পটিয়া জিমনেসিয়াম শুধু একটি ব্যায়ামাগার নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়া ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার ক্রীড়াবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে। পটিয়ার মিনি স্টেডিয়ামের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক জিমনেসিয়ামকে আধুনিক ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তরুণদের জন্য উন্নত ক্রীড়া অবকাঠামো নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
পটিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনাম বলেন, ‘পটিয়ার ক্রীড়া ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়ে ওঠা এই জিমনেসিয়াম শুধু একটি ভবন নয়, এটি পটিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক। প্রায় ৪৭ বছর আগে শহীদ জিয়া স্বশরীরে এসে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন। পটিয়ায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পাশাপাশি জিমনেসিয়ামের আধুনিকায়ন হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তরুণরা আরও বেশি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে।
এমপি এনাম বলেন, ‘মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। তাই ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়নকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
পটিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মঈনুল আলম ছোটন বলেন, ‘একসময় পটিয়া জিমনেসিয়াম দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা ব্যায়ামাগার ছিল। এখান থেকে বহু জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদ তৈরি হয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, আমরা বহুবার জিমনেসিয়ামটির উন্নয়নের দাবি জানিয়েছি। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শন এবং উন্নয়নের আশ্বাস আমাদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে এটি আবারও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ক্রীড়া বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
স্থানীয় খেলোয়াড় ও শরীরচর্চাবিদরা মনে করছেন, প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের এই জনবহুল উপজেলায় একটি আধুনিক জিমনেসিয়াম সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, মিনি স্টেডিয়ামের পাশাপাশি শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ক্রীড়া আন্দোলন নতুন গতি পাবে এবং নতুন প্রজন্ম সুস্থ-সবল জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এদিকে, দীর্ঘ যুগের অবহেলা ও অনাদরের পর অবশেষে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে এসেছে পটিয়া জিমনেসিয়াম। এখন ক্রীড়াঙ্গনের প্রত্যাশা শুধু আশ্বাসে নয়, দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া হোক এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব। কারণ পটিয়ার মানুষ বিশ্বাস করে, জিয়ার হাতে গড়া এই ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান আবারও জেগে উঠলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তরুণ সমাজ নতুন স্বপ্ন দেখবে, নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এবং ক্রীড়ার মাধ্যমে গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত ও আলোকিত প্রজন্ম।




