৭৪ বছরে পড়েছে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। সোমবার (৬ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটির ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৫৩ সালের এই দিনে বড়কুঠির সীমিত পরিসরে যে প্রতিষ্ঠান যাত্রা করে, সময়ের পরিক্রমায় আজ তা রূপ নিয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষা, গবেষণা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চায় পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর উচ্চ শিক্ষার আলো ছড়াতে ব্রিটিশ আমলেই রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। রাজশাহীতে ওই সময় স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৫৩ সালের পূর্ববঙ্গ আইনসভায় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৫৩’ পাস হয়। এরপর শিক্ষাবিদ ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীকে প্রথম উপাচার্য করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে সাতটি বিভাগ, ১৬১ জন শিক্ষার্থী এবং পাঁচজন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই বিদ্যাপীঠ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবশেষ তথ্যকণিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ ও ছয়টি ইনস্টিটিউট রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৩০ হাজারেরও বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে এখানে পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন এক হাজার ১৩০ জন শিক্ষক। কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন দুই হাজার ২৭৯ জন।
বর্তমানে ১১টি ছাত্র হল ও ছয়টি ছাত্রী হলে মোট ৯ হাজার ৬৭৩ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি, যেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৪। প্রতিষ্ঠানটিতে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন ৭৭৬ জন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে দুইটি নতুন আবাসিক হল ও একটি একাডেমিক ভবন নির্মীয়মাণ।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০ ও ২৪’র গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের সব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তানি মিলিটারির বুলেটের সামনে নিজের বুক পেতে দিয়ে এ দেশের ইতিহাসে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মাহুতি দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীসহ অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। শহীদদের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা এবং শহীদ মিনার।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ (সোমবার) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছে, সকাল ১০টা ৫ মিনিটে প্রশাসন ভবনের সামনে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। এরপর বেলুন, ফেস্টুন ও পায়রা উড়িয়ে কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
সকাল ১১টায় বৃক্ষরোপণ এবং সাড়ে ১১টায় সিনেট ভবনে ছিল আলোচনাসভা। এছাড়া বিকেলে ৪টায় কেন্দ্রীয় স্টেডিয়ামে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যা ৭টায় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণাকে আরো সহজ, আধুনিক ও কার্যকর করা।’
উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের থিসিস পর্যায় থেকেই আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। আমরা সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই।’








