• ই-পেপার

যে ৮ ইবাদতে জুমার দিন প্রাণবন্ত হয়

হাদিসের বাণী

আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে
সংগৃহীত ছবি

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের থেকে একজনকে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ছিল। তখন তাকে জাহান্নামের মধ্যে ঢুকানো হবে, এরপর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি কখনো কল্যাণকর জিনিস দেখেছ? তোমার কাছে কখনো কি সুখের আসবাবপত্র এসেছে? সে বলবে, হে আমার রব, ওয়াল্লাহি! না। আর জান্নাতিদের থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে জগতে সবচেয়ে দুঃখী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার প্রবেশ করানোর পর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি দুনিয়াতে কখনো দুঃখ পেয়েছ? তোমার ওপর কি কোনো বিপদাপদ এসেছিল? সে বলবে, না, ওয়াল্লাহি! আমি দুনিয়াতে কোনো দুঃখ ও মুসিবতে পড়িনি এবং কোনো দুঃখ দেখিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০৮৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩১১২)

শিক্ষা ও বিধান

১. দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী। মানুষ দুনিয়াতে যত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই ভোগ করুক, যদি তার শেষ পরিণতি জাহান্নাম হয়, তবে জাহান্নামের সামান্য শাস্তিও তার সমস্ত সুখকে ভুলিয়ে দেবে। অন্যদিকে, একজন মুমিন দুনিয়াতে যত কষ্টই ভোগ করুক, যদি তার গন্তব্য জান্নাত হয়, তবে জান্নাতের সামান্য নেয়ামতই তার সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে।

২. আখিরাতই প্রকৃত জীবন। তাই আসল সফলতা বা ব্যর্থতা দুনিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আখিরাতের পরিণতির ওপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)

৩. আজ যারা দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, অপমান, নির্যাতন বা নানা বিপদে আক্রান্ত, তাদের জন্য এই হাদিস বিশাল সান্ত্বনার উৎস। কেননা একজন মুমিন যদি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, তবে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তার জীবনের সব কষ্টকে তুচ্ছ করে দেবে।

৪. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ দুনিয়াতে অত্যন্ত সুখী, ধনী ও ক্ষমতাবান। কিন্তু বাহ্যিক সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। যদি তারা ঈমান ও নেক আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের দুনিয়ার সমস্ত সুখ কোনো উপকারে আসবে না।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার সুখ দেখে অহংকার করা এবং দুঃখ দেখে হতাশ হওয়া কোনোটিই মুমিনের কাজ নয়। কারণ জান্নাতের এক মুহূর্তের নেয়ামত পৃথিবীর সব কষ্টকে মুছে দেয়, আর জাহান্নামের এক মুহূর্তের শাস্তি পৃথিবীর সব সুখকে বিস্মৃত করে দেয়। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভের জন্য আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০) 

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮) 
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’ 
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى 

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’ 
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১, তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯) 

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ 

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’ 

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে আপনি সেই দিন ক্ষমা করে দিবেন; যেই দিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের একটি মহান বিধান হলো জুমার নামাজ। এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ, সাপ্তাহিক মহাসমাবেশ এবং ঈমানি চেতনা নবায়নের এক অনন্য উপলক্ষ। প্রতি সপ্তাহে একদিন মুসলমানরা সব ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি কাজকর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে আল্লাহর ঘরে সমবেত হয়। খুতবা শ্রবণ করে, নামাজ আদায় করে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু এই মহিমান্বিত ইবাদতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা এক চমৎকার ও শিক্ষণীয় অধ্যায় দেখতে পাই।

‘জুমা’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
আরবি ‘জুমুআহ’ (الجمعة) শব্দের অর্থ হলো—একত্র হওয়া, সমবেত হওয়া বা সংঘবদ্ধ হওয়া। যেহেতু এ দিনে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য একত্রিত হয়, তাই দিনটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ বা জুমার দিন। জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘জুমুআহ’, যদিও ইমাম আ‘মাশ (রহ.) ‘জুমআহ’ উচ্চারণকেও গ্রহণ করেছেন। বাংলা ভাষায় প্রচলিত রূপ হলো ‘জুমা’। তবে নামের পার্থক্য থাকলেও এর মর্যাদা ও তাৎপর্য একই। (তাফসিরে রুহুল মাআনি : ১৪/৯৯, দরসে তিরমিজি : ২/১৯২)

জাহেলি যুগে শুক্রবারের নাম
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবরা শুক্রবারকে ‘ইয়াওমুল আরুবা’ নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্যতম পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এ দিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ রাখেন। তিনি প্রতি শুক্রবার কুরাইশদের সমবেত করতেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। এ ঘটনা ঘটেছিল মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রায় পাঁচ শত ষাট বছর পূর্বে। সেই সময় থেকেই দিনটি সমাবেশ ও সম্মিলনের দিনের পরিচয় লাভ করে। আর কাআব ইবনে লুয়াই ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পূর্বপুরুষদের অন্যতম। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃ : ১৩৭১)

জুমার গুরুত্ব
ইসলামে জুমার মর্যাদা এতই মহান যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামই রেখেছেন ‘সুরা জুমুআহ’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’(সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জুমা শুধু একটি নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি মহান ইবাদত।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা
হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে কুবা এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছলে জোহরের সময় হয়ে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। ইতিহাসে এটিই মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিসেবে স্বীকৃত। আর এই ঘটনাই ইসলামী ইতিহাসে জুমার নামাজের বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর থেকে মুসলমানদের জন্য জুমার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়। (দরসে তিরমিজি : ২/১৯২, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৪৪)

মদিনায় জুমার প্রাথমিক চর্চা
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই সেখানে বসবাসকারী আনসার সাহাবিরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করেন, আনসারগণ আলোচনা করলেন—ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত রয়েছে, যেদিন তারা সমবেত হয়। অতএব মুসলমানদেরও একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন সবাই একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে।

এভাবে জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম মহান নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক সমাবেশ হয়ে উঠে। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসে। আনসার সাহাবিদের আগ্রহ, তাদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তা এবং সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমার মাধ্যমে এ মহান ইবাদতের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে কোটি কোটি মুসলমান প্রতি শুক্রবার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদে সমবেত হচ্ছেন।

জুমা আমাদের শেখায়—ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, আল্লাহর স্মরণ এবং ইসলামের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর আদব ও সুন্নতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং এই বরকতময় দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথভাবে তা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে কিছু পরামর্শ

শায়খ উমায়ের কোব্বাদী
বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে কিছু পরামর্শ
সংগৃহীত ছবি

আমরা বউমা ও শাশুড়ির প্রতি বিশেষ কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি। প্রথমে আসা যাক, শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ সম্পর্কে। শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ একটাই—অন্তর প্রশস্ত করতে হবে। আর অন্তর প্রশস্ত করতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে।

১. বউমার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে
দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক শাশুড়ি আছেন, পুত্রবধূকে আপন করে নিতে পারেন না। তাকে বাড়ির সেবিকা বা চাকরানি মনে করেন।

শাশুড়ি নিজের মেয়েকে এক চোখে দেখেন, পুত্রবধূকে ভিন্ন চোখে দেখেন। এ জন্য একটি ব্যাপার স্পষ্ট থাকা দরকার যে পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। সুতরাং এ জন্য তাকে শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন করতে পারবেন না; বরং আপনার উচিত অন্তর প্রশস্ত করা। তার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা।

টুকটাক বিষয় নিয়ে বউমার সঙ্গে মতবিরোধ হতেই পারে। সে জন্য খামোখা ঝগড়াঝাঁটি করতে যাবেন না। চেষ্টা করুন তার মতকেও গুরুত্ব দিতে। হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতবার মাফ করব? তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন।

তৃতীয়বার প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রতিদিন তাকে তোমরা ৭০ বার মাফ করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৬৪)
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যেখানে খাদেম বা চাকরকে প্রতিদিন ৭০ বার মাফ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে এই মেয়েটি তো আপনার বউমা। আপনি বড়, সে ছোট। ভুল তো ছোটরাই করে। সুতরাং মাফ করে দিন।

২. পুত্র ও পুত্রবধূর সবকিছুতে নাক গলাবেন না
মনে রাখবেন, আপনার ছেলে এখন আপনার ছোট্ট বাবু নয়। সে এখন বড় হয়েছে। তার পার্সোনাল লাইফ আছে। আপনার পুত্র ও পুত্রবধূর দাম্পত্য জীবনে একে অন্যের প্রতি কিছু দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। এখন যদি আপনি এসব বিষয়েও নাক গলানো শুরু করেন, তাদের নিজেদের মতো করে দাম্পত্য জীবন উপভোগ করার স্পেস না দেন। যেমন—ছেলে তার স্ত্রীর জন্য কিছু আনলে আপনি যদি বলেন, এত দামিটা কেন আনল কিংবা আমার জন্য বা আমার মেয়ের জন্য কেন আনল না; অথবা ধরুন, ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে চায় আর আপনি এক্কেবারে ‘না’ করে বসলেন, তাহলে মনে রাখবেন, সুখ ও শান্তি আপনার  ছাদের নিচে কক্ষনো আসবে না। সুতরাং তাদের এসব পার্সোনাল বিষয়ে আপনাকে ছাড় দিতে হবে।

আসলে উক্ত সমস্যার অন্যতম কারণ হলো ছেলেকে বিয়ে করানোর পর মা মনে করে, এই বুঝি ছেলে পর হয়ে গেল। বউমাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। আর বোধ হয় তাঁকে সেভাবে পাত্তাও দেবে না। ছেলের অধিকারবোধ নিয়ে তাঁরা আশঙ্কায় ভোগেন বিধায় এমনটি করে থাকেন। এ জন্য এ ক্ষেত্রে মায়ের উচিত অন্তরটাকে বড় করা।

৩. পুত্রবধূর ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন
কিছু শাশুড়ি আছে বউমার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করা তো দূরের কথা, বরং পদে পদে তার ভুল ধরতেই ব্যস্ত থাকেন। ছেলের কাছে বউয়ের নামে গোপনে দুর্নাম করেন। নুন থেকে চুন খসলে ছেলের কাছে বিচার দেন। নিজের মেয়েদের কাছে বলে বেড়ান। এমনকি বাইরের মানুষের সামনে অপদস্থ করেন। আর মেয়েদের কাছে বললে এটা তো স্বাভাবিক যে এ দুর্নামগুলো তাদের স্বামীর কানেও পৌঁছে। তখন বউয়ের জন্য প্রধান বিচারপতি বনে যায় মেয়ে কিংবা তার স্বামী! যার কারণে আমাদের সমাজের বেশির ভাগ ননদ তাদের ভাবিকে দাজ্জাল মনে করে। আর ভাবিরা ননদকে দাজ্জাল মনে করে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এটার জন্য অন্যতম দায়ী কিন্তু শাশুড়ি। অথচ শাশুড়ি যদি বউয়ের বদনাম না করে তার দোষগুলো গোপন করতেন এবং তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করতেন, তাহলে পারিবারিক বিবাদ-কলহ অনেকাংশে কমে যেত। তাই শাশুড়িকে বলব, আল্লাহকে ভয় করুন। বউয়ের গিবত করা, তাকে অপবাদ দেওয়া থেকে দূরে থাকুন, তার দোষগুলো মায়ের মতো করে লুকিয়ে রাখুন, তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন; দেখবেন, আপনার সংসারে অশান্তি থাকবে না।

৪. নিজের মেয়ে ও বউমাকে এক দৃষ্টিতে দেখুন
অনেক শাশুড়ি আছেন, ঘরে যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ে থাকে তাহলে তার কোনো দোষ আছে বলে মনেই করেন না। মনে করেন, সব দোষ শুধু পুত্রবধূর। এটা জঘন্য অন্যায়।

মনে রাখতে হবে যে আইন দিয়ে জীবন-সংসার চলে না। একটু আগে বলেছিলাম, পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। এটা তো আইনের কথা। বাস্তবতা হলো আইনের রুক্ষ বাঁধনের ওপর ভিত্তি করে হয়তো ‘তালাক’ ঠেকানো যাবে—যদিও অনেক সময় তাও সম্ভব হয় না; কিন্তু সুখ-শান্তি কখনোই আসবে না। কেননা, এটা যেমন আইন, তেমনি এটাও আইন যে স্ত্রীকে তার মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যবস্থা করে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়; বরং ইসলামী আইনজ্ঞরা এ পর্যন্তও বলেছেন, স্ত্রীর মা-বাবা সপ্তাহে মাত্র একবার আসবেন, তাও মেয়েকে দূর থেকে দেখে চলে যাবেন। তাঁদের ঘরে বসিয়ে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়।

সুতরাং আইনের এসব চৌহদ্দিতে পড়ে থাকা মানে অশান্তি ডেকে আনা; বরং বউমাকেও ভাবতে হবে যে তাকেও একদিন শাশুড়ি হতে হবে। হতে হবে বৃদ্ধা। আর বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রবধূর কাছ থেকে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করে—এ প্রশ্ন নিজেকে করলে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে কেমন আচরণ করবে তার জবাব সে পেয়ে  যাবে।

বউমার প্রতি বিশেষ পরামর্শ
পারিবারিক সুখ-শান্তি যেন বিনষ্ট না হয় এ লক্ষ্যে বউমার প্রতি সংক্ষেপে কিছু বিশেষ পরামর্শ পেশ করছি। যদি মানতে পারেন তাহলে ইনশাআল্লাহ শ্বশুরকে ‘বাবা’ এবং শাশুড়িকে ‘মা’ হিসেবে পাবেন।

১. শ্বশুর-শাশুড়ির আনুগত্য ও সেবা করুন
সুখের নীড় রচনা করতে হলে পুত্রবধূর উচিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে যতটুকু সম্ভব শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করা। একে নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করা। দুঃখজনক হলো আজকাল এমন নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যাঁরা বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আর থাকতে চান না বা তাঁদের সেবা করা নিজেদের ওপর জুলুম মনে করেন। অনেকে শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে স্বামীকে তাঁর মা-বাবার বিরুদ্ধাচরণ করতে উসকানি দেন। উদ্দেশ্য হলো, শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন জীবন যাপন করা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা থেকে অব্যাহতি পাওয়া। অথচ ওই নারীই একসময় যখন আরেকজন মেয়ের শাশুড়ি হন, তখন চান নিজের পুত্রবধূ তাঁর ভালোমন্দ খোঁজখবর নিক। সেবাযত্ন করুক। তাঁদের পাশেই থাকুক। এটা সম্পূর্ণ দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৫)

২. শ্বশুরবাড়ির বদনাম বাবার বাড়িতে করবেন না
আপনার শ্বশুরবাড়ি হলেও সেটি আপনার স্বামীর নিজের বাড়ি। তা ছাড়া বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই হয়ে যায় নিজের বাড়ি। আর নিজের বাড়ির বদনাম কেউ সহ্য করতে পারে না। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করলে আপনার স্বামী রেগে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেই বাড়ির সব সদস্য তাঁর আপনজন। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করবেন না। যদি সুযোগ পান তবে প্রশংসা করুন। এতে আপনার স্বামী খুশি থাকবেন। ভালো থাকবে আপনার সম্পর্ক। সংসারও সুখের হবে।

৩. মাঝে মাঝে শাশুড়িকে তাঁর পছন্দের কিছু উপহার দেওয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো। এর দ্বারা অন্তরের সংকীর্ণতা ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯২৫০)
এই হাদিয়া নিজেই কিনে দিতে হবে তা জরুরি নয়, বরং মাঝে মাঝে স্বামীকে কিনে দিতে বলা। এতে শাশুড়ি মনে মনে অনেক খুশি হবেন এবং পুত্রবধূকে বেশি স্নেহ করবেন।

৪. শ্বশুরালয়ের বদনাম প্রতিবেশীর কাছে করবেন না
এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই প্রতিবেশী আপনার বদনামের কথা তার পেটে রাখবে না, এটা শতভাগ নিশ্চিত। সন্দেহ নেই, যার কারণে আপনার সংসারে আগুন জ্বলে উঠবে। তা ছাড়া এর কারণে গিবতের গুনাহ হয়।

৫. শাশুড়ির কাছ থেকে তার অতীতের সুখ-দুঃখের গল্প  শুনবেন
এতে সম্পর্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। শাশুড়ির প্রতি এক প্রকার আবেগ তৈরি হবে। শাশুড়ি আপনাকে শাসন কিংবা বকাঝকা করে থাকলে তার কারণ কী; এটাও বোঝা সহজ হবে। মহান আল্লাহ সহায় হোন।