আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি কুসংস্কার হলো—কোনো ভালো কাজে বের হওয়ার সময় সামনে দিয়ে বিড়াল হেঁটে গেলে বা রাস্তা পার হলে যাত্রা অশুভ হয়। অনেকেই একে অমঙ্গলের লক্ষণ মনে করে কাজ থেকে বিরত থাকেন কিংবা ভিন্ন পথ ধরেন। কিন্তু ঘরের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো নিরীহ এই প্রাণীটিকে ঘিরে এমন ধারণা পোষণ করার কি আদৌ কোনো ভিত্তি আছে ইসলামে? পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিড়াল পোষা, এর প্রতি মানবিক আচরণ এবং আমাদের সমাজে প্রচলিত এই ‘অশুভ’ ধারণার আসল সত্যটি জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামে বিড়াল পালনের অনুমতি রয়েছে। অনেক সাহাবীও বিড়াল পালতেন। তবে বিড়াল পোষার শর্ত হলো অবশ্যই বিড়ালের যথাযথ যত্ন নিতে হবে এবং তাকে ঠিকমতো খাবার দিতে হবে। কারণ, শুধুমাত্র একটি বিড়ালের প্রতি অন্যায়ের ফলে হাদিসে এক নারীকে কঠিন শাস্তি দেয়ার কথাও এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন- একজন নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আযাব দেয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। পরে ওই অবস্থায় বিড়ালটি মারা যায়। এজন্য ওই নারীর পরিণতি হয় জাহান্নাম। কারণ, সে বিড়ালটিকে দানা-পানি কিছুই দেয়নি এবং ছেড়েও দেয়নি যাতে সে নিজ খুশিমতো জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৩৬)
আবার পোষা বিড়ালে উচ্ছিষ্টও ইসলামের দৃষ্টিতে নাপাক নয়। আবু কাতাদর পুত্রবধূ কাবশা বিনত কা’ব ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার আবু কাতাদা (রা.) তার কাছে এলেন এবং তিনি তার অজুর পানি ঢেলে দিলেন। ওই সময় একটি বিড়াল এসে পানি পান করতে শুরু করল। তখন আবু কাতাদা (রা.) বিড়ালটির জন্য পানির পাত্রটি কাত করে ধরলেন। এতে বিড়ালটি পরিতৃপ্ত হয়ে পানি পান করল। ওই সময় আবু কাতাদা (রা.) তাকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন- হে ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি এতে বিস্ময় প্রকাশ করছ! পরে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে আবু কাতাদা (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- বিড়ালের উচ্ছিষ্ট নাপাক নয়। কারণ, বিড়াল তো তোমাদের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ৯২)
তবে বিড়াল পোষার ক্ষেত্রে অনুমতি থাকলেও ইসলামে প্রাণিটি কেনা-বেচায় নিষেধ রয়েছে। আবু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার আমি জাবির (রা.) এর কাছে কুকুর ও বিড়ালের মূল্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। জবাবে তিনি বললেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন (অর্থাৎ, কেনা-বেচায় নিষেধ করেছেন)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৯০৭)
এ ক্ষেত্রে বাসা-বাড়ির আশপাশে প্রায়সময় বিড়াল ঘুরাফেরা করলেও পোষা এই প্রাণিটিকে ঘিরে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়। অনেকেই বলে থাকেন, কারও সামনে দিয়ে বিড়াল অতিক্রম করলে বা বিড়াল কারও রাস্তা কাটলে অমঙ্গল হয়। কেউ কেউ এমনও বলে থাকেন যে, বিড়াল সামনে দিয়ে যাওয়া একটি অশুভ লক্ষণ। আবার কেউ কেউ কোনো উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর যদি বিড়াল সামনে দিয়ে অতিক্রম করে তবে অমঙ্গলের আশঙ্কায় সেই কাজ থেকে বিরতও থাকেন। আসলেই কি ইসলামি শরিয়তে এমন কিছু আছে?
প্রথমত, অশুভ বা কুলক্ষণে বিশ্বাস করা ইসলামে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ (পাপ) শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এমন কেউই আমাদের মধ্যে নেই যার মনে এর ধারণা আসে না। তবে আল্লাহ তা’আলা তার ওপর (মুমিন লোকের) ভরসার কারণে তা দূর করে দেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ১৬১৪)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়য়া (রা.) বলেছেন- আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই কথা বলতে শুনেছি যে, শুভ-অশুভ নির্ণয়ে কোনো লাভ নেই, বরং শুভ লক্ষণ গ্রহণ করা ভালো। ওই সময় সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), শুভ লক্ষণ কি? জবাবে নবীজি (সা.) বললেন, ভালো বাক্য যা তোমাদের কেউ শুনে থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩৪৩)
অন্যদিকে পবিত্র কোরআন বা হাদিসের কোথাও বিড়াল সামনে দিয়ে রাস্তা পার হলে তাতে অমঙ্গল হবে বা এটি অশুভ কোনোকিছু এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ নেই। তবে জিন জাতি যে বিড়াল ও সাপসহ বিভিন্ন প্রাণির রূপ ধারণ করতে পারে সে বিষয়ে সহিহ হাদিসে বর্ণনা এসেছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে ঘিরে সব বিড়ালকেই জিন ভাবা কিংবা বিড়াল সামনে দিয়ে গেলে কারও অমঙ্গল হবে এমন ধারণা করা মোটেও উচিত নয়।
তবে বিড়াল সামনে দিয়ে গেলে যদি কারও মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি হয় বা অসুবিধাজনক কিছু মনে হয় তবে চাইলে দোয়া পড়া যায়। আহমাদ আল-কুরাশী (রহ.) সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একবার শুভ ও অশুভ লক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলে তিনি বলেন- হ্যাঁ, শুভ লক্ষণ হচ্ছে ফা’ল (শুভ চিন্তা)। আর এমন অশুভ কিছু নেই যা মুসলিমকে কোনো কাজে বা কোথাও যাত্রা থেকে বিরত রাখতে পারে। তবে তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো অসুবিধাজনক কিছু দেখতে পায়, তাহলে সে যেন বলে-
للَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
বাংলা: আল্লাহুম্মা লা ইয়াতি বিল হাসানাতি ইল্লা আনতা, ওয়ালা ইয়াদফাউস সাইয়িআতি ইল্লা আনতা, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা বিকা (অথবা ইল্লা বিল্লাহ)।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই তো কল্যাণদাতা এবং আপনিই তো অকল্যাণ দূরকারী। আপনি ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই, শক্তিও নেই। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৩৯১৯)




