• ই-পেপার

চামড়ার বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা শেষ এবার ধলেশ্বরী

মানববন্ধন

মানববন্ধন
শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতীকী মানববন্ধন করেন সাধারণ মানুষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু

‘সন্তোষজনক জবাব না পেলে আইনি ব্যবস্থা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘সন্তোষজনক জবাব না পেলে আইনি ব্যবস্থা’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে আইন অনুযায়ী কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ কথা বলেন। এদিকে অন্য এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের দেওয়া শোকজ নোটিশ আইনসম্মত নয় বলছেন আইনজীবী শিশির মনির।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে লাভ নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতেই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে কিংবা জবাব না দিলে আইনে যা আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাসপাতাল স্থাপনাসংক্রান্ত বিধিমালা, বিদ্যমান আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান পর্যালোচনা করেই সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাব পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি  বলেন, নোটিশটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, একটি গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার কর্তৃপক্ষ আমরা। তদন্তে অনিয়ম ও অবহেলার বিষয় উঠে এসেছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানান, আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল গত তিন বছর ধরে অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের নিজ নিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নবজাতকদের মৃত্যুকে অপ্রত্যাশিত অবহেলার ফল বলে উল্লেখ করেছে। তাদের গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে একজন নার্স ও একজন কর্মচারীর পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী শিশির মনির জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, উপযুক্ত চাকরির সুযোগ এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দায়ীদের শাস্তি চাইলেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হোক, তা চায় না।

নবজাতকদের একজনের বাবা ও মামলার বাদী হাবিবুর রহমানও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আমরা দায়ীদের শাস্তি চাই। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হোক, সেটা চাই না। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ঘোষিত সুবিধাগুলো ছাড়া অন্য কোনো অর্থ তাঁরা গ্রহণ করেননি।

তবে সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং কেন শুধু শিশির মনির বক্তব্য দিচ্ছেন এমন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আব্দুস সবুর সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন।

পিউ রিসার্চের জরিপ

ইসরায়েল নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষের মনোভাব নেতিবাচক

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
ইসরায়েল নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষের মনোভাব নেতিবাচক

বিশ্বের ৩৬টি দেশের বেশির ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। সেই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের আস্থা খুব সামান্য কিংবা একেবারেই নেই বলেও জানান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পরই মূলত জরিপসংক্রান্ত বেশির ভাগ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।

জরিপের আওতাভুক্ত দেশগুলোর গড়ে ৬৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক বা প্রতিকূল মনোভাব দেখিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের মনোভাব ছিল ইতিবাচক।

জরিপ করা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বা অঞ্চলগুলোয় ইসরায়েলের প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তীব্র। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে। তবে গাজা উপত্যকায় কোনো জরিপ চালানো সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া জরিপের আওতায় থাকা ইউরোপের সবকটি দেশের মানুষই ইসরায়েল সম্পর্কে তুলনামূলক নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। বিশেষ করে ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের প্রায় অর্ধেক বা এর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রতি তাঁদের অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। জরিপ করা সাব-সাহারা অঞ্চলের কিছু আফ্রিকান দেশে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।

জরিপের আওতাভুক্ত ৩৬টি দেশের গড়ে ৬৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের মনোভাব ছিল ইতিবাচক। আবার উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের ৭২ শতাংশেরই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। বিপরীতে ৫০ বছর বা এর বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ৪৫ শতাংশ।

অনেক দেশেই রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী ও ডানপন্থী মতাদর্শের মানুষের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির বিশাল ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির ৮৩ শতাংশ উদারপন্থী ও ৩৭ শতাংশ রক্ষণশীল মানুষের চোখে ইসরায়েল একটি নেতিবাচক দেশ। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেনে বামপন্থীদের প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জন বা এর চেয়ে বেশি মানুষের মনোভাব ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক। দেশগুলোর প্রতিটিতেই বামপন্থীদের এই হার ডানপন্থীদের তুলনায় অন্তত ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

জরিপ করা প্রায় প্রতিটি উচ্চ আয়ের দেশেই রাজনৈতিক আদর্শের এমন ছোট, কিন্তু ধারাবাহিক ব্যবধান দেখা গেছে। সবখানেই ডানপন্থীদের তুলনায় বামপন্থীরা ইসরায়েল সম্পর্কে বেশি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন ধারাবাহিক চিত্র দেখা যায়নি।

জরিপ করা বেশির ভাগ দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের খুব একটা বা একেবারেই আস্থা নেই। এসব দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, স্পেন, সুইডেন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও (ফিলিস্তিনের) পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম রয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর অর্ধেক বা এর চেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ওপর তাঁদের একবিন্দুও আস্থা নেই। দেশগুলোর মধ্যে শুধু কেনিয়া ও ফিলিপিন্সে অর্ধেকের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, হাঙ্গেরিতে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের ৭২ শতাংশেরই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো ভারত। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ভারতে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, আর ৩২ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে জরিপে অংশ নেওয়া সব দেশের মধ্যে ভারতেই ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে কম নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।

নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রশ্নেও ভারত ব্যতিক্রমী অবস্থানে। দেশটির মাত্র ২৭ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন, আর ৩৪ শতাংশ আস্থা রাখেন বলে জানিয়েছেন। সূত্র : রয়টার্স

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর

বাংলাদেশে বাড়ছে তুরস্কের প্রভাব

আবদুল্লাহ আল মিরাজ
বাংলাদেশে বাড়ছে তুরস্কের প্রভাব

বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক অনেক পুরনো। তবে নতুন করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান বাড়াচ্ছে তুরস্ক। কূটনৈতিক সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের সময়কালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা নষ্ট হয় তুরস্কের। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের আবারও কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া বাড়ে তুরস্কের। বর্তমান বিএনপি সরকার এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে কাজ করছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরো দৃশ্যমান হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বেড়েছে। এ ছাড়া সদ্যঃসমাপ্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে সভাপতি পদে বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক। বাংলাদেশকে তুরস্ক বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাবনাময় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়। এ জন্য দেশটি রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলোতে সম্পর্ক আরো বাড়াতে চায়।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১০টায় বাংলাদেশে আসেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তাঁকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত শুক্রবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠকে বসেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিকে আরো গভীর করার পাশাপাশি তা বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করতে তুরস্কের আগ্রহের কথা জানান। এ ছাড়া দৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে আংকারা।

বাংলাদেশে শুধু সরকার বা সরকারের দায়িত্বশীলদের সঙ্গেই নয়, বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি ও সামাজিক অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। বিষয়টিকে দেশটির বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ঢাকা ও আংকারার সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের বিচারকে কেন্দ্র করে কিছু কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর আবারও দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। তুরস্কের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিআইকেএ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা আফাদ, তুরস্কের রেড ক্রিসেন্ট এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি আরো বলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক গত এক দশকে নিজেদের একটি আঞ্চলিক শক্তি বা মিডল পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দেশটি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তুরস্ক পাঁচটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিচ্ছেবাণিজ্য, বিনিয়োগ, সফট পাওয়ার, প্রতিরক্ষা শিল্প ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার। আগামী কয়েক বছরে এটিকে কয়েক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।

বাংলাদেশে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধির পেছনে শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নয়, সাংস্কৃতিক উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন পারভেজ করিম আব্বাসী। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুর্কি টেলিভিশন সিরিজ ও ঐতিহাসিক নাটক বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন, শিক্ষা ও জনসম্পর্কের ক্ষেত্রেও যোগাযোগ বেড়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি পর্যটক তুরস্ক সফর করছে এবং দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্যও আগ্রহ বাড়ছে।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, তুরস্কের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সাধারণত বা সাধারণভাবে ভালোই আছে। সাম্প্রতিককালে তুরস্কের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা আরো উষ্ণ হচ্ছে, আরেকটু বেশি ভালো হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই সফর সম্পর্কের গতিকে আরো ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য মোটামুটি মনোযোগী। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন বন্ধু তৈরি করা বা পুরনো বন্ধুদের আরো সক্রিয় করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে অন্য কোনো দেশ চাপ বাড়াতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চিন্তা অনুযায়ীই কাজ করবে। এখানে তুরস্ক কেন, অন্য কোনো দেশেরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বাংলাদেশ এমনিতেই পছন্দ করে না।

আগে জামায়াত নেতাদের রায়ের পর সম্পর্ক খারাপ হওয়া এবং বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তুরস্কের বৈঠককে কিভাবে দেখেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পৃথিবী অনেক বদলেছে। অনেক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পুরনো বিষয় অনেক পেছনে পড়ে গেছে। এখনকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বদলেছে। বাইরের বিশ্বের বাস্তবতাও বদলেছে। তাই সেই বাস্তবতার আলোকে তুরস্ককে আমাদের দেখতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার, চীন বড় উন্নয়ন অংশীদার, ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্লক এবং উপসাগরীয় দেশগুলো রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। এ কারণে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলেও তা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতির আলোকে বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলের অংশ হিসেবেই আংকারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।

সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, বাংলাদেশে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মানবিক কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের সমন্বিত ফল। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ঢাকা একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, ব্রাসেলস ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।