বাংলা দ্বিতীয় পত্র
নির্মিতি
সারাংশ লেখো
১। সময় ও স্রোত কারো অপেক্ষায় বসে থাকে না। চিরকাল চলতে থাকে। সময়ের কাছে অনুনয় করো, একে ভয় দেখাও, ভ্রুক্ষেপও করবে না, সময় চলে যাবে আর ফিরবে না। নষ্ট স্বাস্থ্য ও হারানো ধন পুনঃপ্রাপ্ত হওয়া যায়; কিন্তু সময় একবার গত হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। গত সময়ের জন্যে অনুশোচনা করা নিষ্ফল। যতই কাঁদো না কেন, গত সময় কখনো ফিরে আসবে না।
সারাংশ : সময় চিরবহমান। শত চেষ্টা করলেও সময়ের গতিকে কেউ রুদ্ধ করতে পারে না। চেষ্টা ও শ্রম দিয়ে হয়তো লুপ্ত স্বাস্থ্য কিংবা ধ্বংস হওয়া ধন-সম্পদ পুনরায় উদ্ধার করা যায়; কিন্তু চলে যাওয়া সময়কে শত চেষ্টায়ও কখনোই ফিরিয়ে আনা যায় না।
২। অভাব আছে বলিয়াই জগৎ বৈচিত্র্যময়। অভাব না থাকিলে জীব সৃষ্টি বৃথা হইত। অভাব আছে বলিয়াই অভাব পূরণের জন্য এত উদ্যম, এত উদ্যোগ। আমাদের সংসার অভাবক্ষেত্র বলিয়াই কর্মক্ষেত্র। অভাব না থাকিলে সকলকেই স্থানু, স্থবির হইতে হইত, মনুষ্যজীবন বিড়ম্বনাময় হইত। মহাজ্ঞানীরা জগৎ হইতে দুঃখ দূর করিবার জন্য ব্যগ্র। কিন্তু জগতে দুঃখ আছে বলিয়াই সে সেবার পাত্র যত্রতত্র সদাকাল ছড়াইয়া রহিয়াছে। যিনি অন্নদান, বস্ত্রদান, জ্ঞানদান, বিদ্যাদান করেন তিনি যেমন জগতের বন্ধু, তেমনি যিনি দুঃখে আমাদের সেবার পাত্রে অজস্র দান করিতেছেন, তিনিও মানবের পরম বন্ধু। দুঃখকে শত্রু মনে করিও না, দুঃখ আমাদের বন্ধু।
সারাংশ : অভাব জগেক বৈচিত্র্যময়, জীবনকে কর্মময় ও মানুষকে উদ্যোগী করে। অভাব সেবাধর্মেরও উৎস। অন্যের দুঃখ দূরীকরণেরই মানুষের হৃদয় মনুষ্যত্ব ও মানবতা বোধে মহান হয়ে ওঠে। তাই দুঃখ মানুষের শত্রু নয়, বন্ধু।
৩। মাতৃস্নেহের তুলনা নাই। কিন্তু অতিস্নেহে অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃস্নেহের মমতার প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আসল শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মক্তির সন্ধান সে পায় না—দুর্বল, অসহায় পক্ষীশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরমসম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহে সে কথা বুঝে না—অলসকে সে প্রাণপাত করিয়া সেবা করে— ভীরুতার দুর্দশা কল্পনা করিয়া বিপদের আক্রমণ হইতে ভীরুকে রক্ষা করিতে ব্যাপ্ত হয়।
সারাংশ : মাতৃস্নেহ অতুলনীয় হলেও অতিরিক্ত মাতৃস্নেহ কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং সন্তানের স্বাভাবিক মনুষ্যত্বের বিকাশকে করে বাধাগ্রস্ত। অন্ধ মাতৃস্নেহ অবোধ সন্তানের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয়। এতে সন্তান ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৪। অভ্যাস ভয়ানক জিনিস। একে হঠাৎ স্বভাব থেকে তুলে ফেলা কঠিন। মানুষ হবার সাধনাতেও তোমাকে সহিষ্ণু হতে হবে। সত্যবাদী হতে চাও? তাহলে ঠিক করো, সপ্তাহে অন্তত একদিন মিথ্যা বলবে না। ছয় মাস ধরে এমনি করে নিজে সত্য কথা বলতে অভ্যাস করো। সপ্তাহে তুমি দুই দিন মিথ্যা বলবে না। এক বছর পরে দেখবে সত্য কথা বলা তোমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে পড়েছে। সাধনা করতে করতে এমন একদিন আসবে যখন ইচ্ছা করলেও মিথ্যা বলতে পারবে না। নিজেকে মানুষ করার চেষ্টায় পাপ ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রামে তুমি হঠাৎ জয়ী হতে কখনো ইচ্ছা করো না, তাহলে সব পণ্ড হবে।
সারাংশ : মানুষ অভ্যাসের দাস। স্বভাব থেকে কোনো বদভ্যাস এক দিনে দূর হয় না; বরং তার জন্য প্রয়োজন কঠোর সাধনা। ধীরে ধীরে সত্য বলার সাধনা করলেই মিথ্যা বলার অভ্যাসকে পরিহার করা সম্ভব।
সারমর্ম লেখো
১। কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেই সুরাসুর।
রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয়
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনি পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।
সারমর্ম : এই পৃথিবীতে মানুষের মাঝেই স্বর্গ ও নরক বিদ্যমান। বিবেকবর্জিত মানুষ পৃথিবীতেই নরক যন্ত্রণা ভোগ করে। আর যারা ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলে তাদের কাছে পৃথিবীটাই স্বর্গ।
২। আসিতেছে শুভ দিন
দিনে দিনে বহু বাড়িয়েছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দুপাশে পুড়িয়ে যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা গাহি তাহাদেরি গান,
তাদের ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।
সারমর্ম : যে শ্রমিকদের কঠোর শ্রমের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতি আজ সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছেছে, তারাই সমাজজীবনে বঞ্চিত ও অবহেলিত। কিন্তু এখন সুবিধাবাদীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। শ্রমজীবী মানষেরাই বিশ্বে নবজাগরণ ঘটিয়ে নতুন যুগের সূচনা করবে।
৩। বসুমতী, কেন তুমি এতই কৃপণা?
কত খোঁড়াখুঁড়ি করে পাই শস্য কণা।
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস—
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?
বিনা চাষে শস্য দিলে কি তাহতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে;
তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে।
সারমর্ম : শ্রমবিমুখ মানুষ এই পৃথিবীর সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়। সুকঠিন শ্রম ও কর্মসাধনার কোনো জিনিস লাভ করলে তাতে গৌরব ও আত্মতৃপ্তি দুই-ই পাওয়া যায়। পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতা মানুষের মর্যাদা ও গৌরব বাড়ায়।
৪। এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে।
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
সারমর্ম : পৃথিবীতে নতুনের জন্য পুরনোকে স্থান ছেড়ে দিতে হয়—এটাই প্রকৃতির নিয়ম। জীর্ণপৃথিবীর ব্যর্থ, মৃত, ধ্বংসস্তূপ আর গ্লানি দূর করে তাকে নবীনদের বাসযোগ্য আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র কাম্য।