একসময় দেখা গেছে, বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁজে ক্রেতাদের চোখ জ্বালা করত, দাম ছিল চড়া। সেই পেঁয়াজ এবার দেশে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদিত হয়েছে। দামও কমেছে। বলা হচ্ছে, পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে দেশ, যা অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া খবর। কিন্তু একই সঙ্গে হতাশ হতে হয়, যখন দেখা যায় পেঁয়াজ চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, বেশির ভাগ পেঁয়াজ চাষি তাঁদের উৎপাদন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যের বরাত দিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, দেশের ইতিহাসে এবার সর্বোচ্চ পরিমাণ পেঁয়াজ ঘরে তুলেছেন কৃষকরা। এর পরও স্বস্তিতে নেই তাঁরা। জানা গেছে, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন খরচের অর্ধেকের কম দামে কৃষকরা পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষোভ, হতাশায় অনেক কৃষককে পুকুর বা ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিতেও দেখা গেছে। এবার প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কোথাও কোথাও ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়ও নেমে এসেছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, দেশ যখন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে যাচ্ছে, সেই সময়ও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী পেঁয়াজ আমদানি করছেন। এতে কৃষক আরো ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষকরা পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তাঁরা ক্ষতির মুখে আছেন। এই অবস্থায় আমদানির কোনো সুযোগ নেই। আমরা পেঁয়াজ আমদানি শূন্যের কোঠায় নিতে চাইছি।’ তাঁর এই কথার বাস্তবায়ন জরুরি।
খবরে বলা হয়েছে, সারা বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে এবার পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ৪৯ লাখ ৬১ হাজার টন। আরো আশার কথা শুনিয়েছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাসউদুল হক ঝন্টু। তিনি জানান, পেঁয়াজের ২২টি ফেনোটাইপ নিয়ে গবেষণা চলছে এবং প্রতিবছর উৎপাদন ৭ থেকে ১২ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশই ‘মুড়ি কাটা’ বা আগাম জাতের, যা বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। এ ছাড়া মূল মৌসুমের ‘হালি’ পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য দেশে আধুনিক বা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার স্টোরেজ অনেক কম। এ কারণে প্রতিবছর উৎপাদিত পেঁয়াজের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়।
আমরা মনে করি, রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন অনেক বড় অর্জন, তবে এই অর্জন ধরে রাখাও কম বড় চ্যালেঞ্জ নয়। এর জন্য প্রথমত কৃষক যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা দেখতে হবে। তাঁদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া পেঁয়াজ সংরক্ষণে আধুনিক স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি।

