• ই-পেপার

মে লা

বাংলার মেলা

  • মেহেদী উল্লাহ

অ র্থ নী তি

বৈশাখী অর্থনীতিতে উৎসবের রং

মাসুদ রুমী

বৈশাখী অর্থনীতিতে উৎসবের রং

লাল-সাদা চিরচেনা সমারোহে সাজানো শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা মানুষের ঢল নামবে পহেলা বৈশাখে। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় আয়োজন, পার্ক-উদ্যানে চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষের স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন এখন নগর পেরিয়ে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবছর এই উৎসব ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয় এবং গ্রাম ও শহরউভয় অর্থনীতিতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এই উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক আনন্দ নয়; এটি দেশের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি। হালখাতা থেকে পোশাক, বৈশাখী ভাতা থেকে মেলাসব মিলিয়ে বৈশাখ ঘিরে দেশের বাজারে সঞ্চরণ করছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বৈশাখ ঘিরে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের হাতবদল হয়। উৎসবের রং যেন অর্থনীতির চিত্র আরো উজ্জ্বল করে তুলছে।

বৈশাখী অর্থনীতিতে উৎসবের রং

ছবি : শেখ হাসান

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা কমলেও রাজধানীসহ সারা দেশের বিপণিবিতান, মার্কেট, শপিং মল থেকে ফুটপাতে বিকিকিনি হচ্ছে বৈশাখের সামগ্রী ও রকমারি পোশাক। আকর্ষণীয় অফারে গ্রাহকদের টানছে দোকানগুলো।

তবে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধের যে নির্দেশ দিয়েছে, তাতে বৈশাখী বাজারে বিক্রি আশানুরূপ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলালউদ্দিন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। দোকানিদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। সামনে পহেলা বৈশাখ। এই সময়ে শপিং মল ও মার্কেটগুলো ব্যবসা করতে না পারলে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হবে। ব্যবসায়ীরা অন্তত রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন।

 

ঐতিহ্যের হালখাতা

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে পুরনো ও ব্যাপক আয়োজন হালখাতা। দেশের বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র দোকানি ও ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে পুরনো হিসাব চুকিয়ে দেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট দোকান ও খুচরা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। প্রতিটি দোকানে হালখাতা উপলক্ষে গড় খরচ ধরা হয় ১০ হাজার টাকা। তবে শুধু খাতা কেনা নয়, এর সঙ্গে মিষ্টি বিতরণ, গ্রাহকদের জন্য ছাড়, কর্মচারীদের উপহার ইত্যাদি যুক্ত হয়। তাই দেশের অর্থনীতিতে হালখাতা ঘিরে মোট লেনদেন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

বৈশাখী পোশাক

বুটিক হাউস ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পহেলা বৈশাখ ছিল কেনাবেচার দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বৈশাখ ঘিরে বুটিক হাউস ও ব্র্যান্ডেড পোশাকের দোকানে বিশেষ আয়োজনের প্রচলন শুরু হয় প্রায় দুই দশক আগে। ধীরে ধীরে সেটির পরিধি বাড়তে থাকে।

সারা দেশে পুরুষ, নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকান রয়েছে ২৫ লাখের বেশি। সাধারণ দিনে এসব দোকানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। কিন্তু পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর, নবাবপুরের পাইকারি মার্কেট থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন সুপারমার্কেট, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, কাটাবন, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, মিরপুর, উত্তরাসব জায়গায় বাহারি রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, জামদানি, তাঁত ও সিল্কের সমারোহ। ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠান ছাড়ের অফার দিয়ে গ্রাহক টানছে।

দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ঈদসহ সারা বছর দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোতে যে পরিমাণ পোশাক বিক্রি হয়, তার ৩০-৫০ শতাংশ বিক্রি হয় পহেলা বৈশাখ ঘিরে।

দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ড অঞ্জনস-এর প্রধান নির্বাহী শাহীন আহম্মেদ বলেন, বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফ্যাশন হাউসগুলোর আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট বিক্রিও বাড়ছে। আড়ং, লা রিভ, ইয়েলোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডও ঐতিহ্যবাহী জামদানি, সিল্ক ও হস্তশিল্পভিত্তিক ডিজাইনে সাড়া পাচ্ছে।

বৈশাখী অর্থনীতিতে উৎসবের রং

ছবি : শেখ হাসান

বোনাস ও বৈশাখী ভাতা

চাকরিজীবীদের বেতন ও বোনাস উৎসবের বাজার চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখে। এ বছর কর্মজীবী মানুষেরা বোনাস বাবদ তুলেছেন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যায় বাজারেপোশাক, খাদ্য, ভ্রমণ, উপহারসামগ্রী কেনায়।

সরকারের ২০১৬ সালে চালু করা বৈশাখী ভাতা এবারও যুক্ত হয়েছে উৎসবের অর্থনীতিতে। দেশের সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পান। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই ভাতা চালু করেছে। এই অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে গেছে, যা কেনাকাটার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

পুরান ঢাকার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী রহমান মিয়া বলেন, চিনি, দুধ, ঘির দাম কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাতে টাকা আসায় নকশি পিঠা, কদমা, পায়েসের বিক্রি ভালো। পাড়া-মহল্লার অনুষ্ঠান ও মেলায় চাহিদা বাড়ছে।

পহেলা বৈশাখের দিন মিষ্টির বিক্রি বেশি হয়। পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী এখনো হালখাতা উৎসব করে বছর শুরু করেন। মিষ্টি-নিমকি দিয়ে ক্রেতা ও বন্ধুবান্ধবকে আপ্যায়ন করার ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। সব মিলিয়ে মিষ্টির ব্যবসা বেশ ভালোই চলে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য

বৈশাখের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে গ্রামীণ মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। রাজধানী থেকে গ্রামবাংলার আনাচকানাচে বিস্তৃত এই মেলা। হস্তশিল্প, গয়না, বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, তাঁতবস্ত্রসবকিছুর বিক্রি চাঙ্গা। রাজশাহীর পিঠা কারিগর নূরজাহান বেগম জানান, স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি পিঠা নিয়ে এবার মেলায় দারুণ সাড়া পাচ্ছেন। তিনি বলেন, শহরের ফ্যাশনের চেয়ে গ্রামের মানুষ সরল আয়োজনেই খুশি। আমাদের বিক্রি গতবারের চেয়ে বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এসব মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হস্তশিল্প ও কারুশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে বৈশাখী অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।

পান্তা-ইলিশ

বৈশাখ এলে শহরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন চোখে পড়ে। এবারও ইলিশের দাম কিছুটা বেশিএক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকায়। বরিশাল ও চাঁদপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় দাম ২০-৩০ শতাংশ বেশি। মধ্যবিত্তের জন্য এটি কিছুটা মহার্ঘ হলেও উচ্চবিত্তের মধ্যে ও রেস্তোরাঁগুলোতে পান্তা-ইলিশের চাহিদা কমেনি। তবে গ্রামীণ এলাকায় ইলিশের পরিবর্তে স্থানীয় ছোট মাছ, শাক-সবজি ও পিঠা-পুলির চাহিদাই বেশি। শহর-গ্রামের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও উৎসবের আমেজে ভাটা পড়েনি। বরং ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই নিজেদের সাধ্যের মধ্যে বিকল্প আয়োজন করছেন।

বৈশাখ ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুল ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়। প্রতিদিন রাজধানীতে পাইকারি বাজারে ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। সেই হিসাবে বৈশাখ ঘিরে ৬০-৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ফুল ব্যবসায়ী সমিতি।

স্থানীয় চাহিদাই ভরসা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশাখী অর্থনীতি মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর। উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা যেকোনো বাধা সত্ত্বেও চাহিদা ধরে রাখে। এ বছর হালখাতা, বোনাস ও বৈশাখী ভাতা মিলে বাজারে বাড়তি তারল্য এসেছে। ফ্যাশন হাউস ও ছোট ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাচ্ছেন।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, এবার বৈশাখের আয়োজন বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছেন। হস্তশিল্প ও কারুশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে বৈশাখী অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।

 

লোকসংগীত

বাংলাদেশের লোকসংগীত ঐতিহ্যের ভিন্ন পাঠ

অনাবিল ইহসান

বাংলাদেশের লোকসংগীত ঐতিহ্যের ভিন্ন পাঠ
ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

সাধারণ অর্থে, লোক বলতে সেই জনমানুষদের বোঝায়, যারা সমাজকাঠামোর মূলে থেকে নিরন্তর শ্রম, কৃষি বা লৌকিক সাধনার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ কৃষক, শ্রমিক ও সাধক শ্রেণির মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাই লোক শব্দের মূল ভিত্তি। প্রচলিত অর্থে গীত, বাদ্য, নৃত্য ও নাট্যের যৌগিক সমন্বয়ে সংগীত গঠিত হয়। কিন্তু সংগীতের ব্যাপ্তি মূলত সুর ও স্বরের ব্যবহারে পরিচয়বাহী হয়। আবার নীরবতাও সংগীতের মাধুর্য সৃষ্টির অন্তর্মূলে গ্রন্থিত থাকে। সৃষ্টির আদি থেকে সেই সংগীত অন্তহীন আবেগ ও আবহ নিয়ে জগেক মুখর রেখেছে। বাতাসের মর্মমূলে যেমন সংগীতের প্রবাহ আছে; সাগরে, নদীতে, মহাকাশে, এমনকি প্রতিটি প্রাণপ্রবাহের মধ্যে ছন্দ ও সুর গূঢ় ভাবের প্রসারে সবাইকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

তবে লোকসংগীতে সংগীতের গভীরতা শুধু মানুষের কণ্ঠের কারুকাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সুর ও ছন্দের ব্যাপ্তি আরো নিবিড়। উদাহরণস্বরূপগ্রামীণ জীবনে নদীতে মাঝি যখন ভাটিয়ালি গায়, তখন তার কণ্ঠে সুরের সঙ্গে বইঠার জলে পড়ার শব্দে যে সুর-ছন্দ তৈরি হয়, তা এক অপার্থিব সংগীতের জন্ম দেয়। এখানে বইঠার শব্দ নদীর কলতানের সঙ্গে মিশে এক অবিচ্ছেদ্য আবহ সুর হিসেবে কাজ করে। আবার নাগরিক জীবনেও লোকসংগীতের এই ধারা সমানভাবে প্রবহমান। শহরের আধুনিকতার ভিড়ে বিভিন্ন মাজার প্রাঙ্গণে যখন সাধকদের গান ও বাদ্যের ঝংকার ওঠে, তখন নাগরিক যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে এক লৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। সুতরাং গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের এই শ্রমজীবী ও সাধক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং জীবনদর্শন যখন গীত, বাদ্য, নৃত্য ও নাট্যের সমন্বয়ে শৈল্পিক রূপ লাভ করে, তখন তাকে লোকসংগীত বলা হয়।

  ঐতিহ্যের ভিন্ন পাঠ

ঐতিহাসিক কাল থেকে বাংলাদেশের লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে সহস্রাধিক ধরনের গানের আঙ্গিক রয়েছে। এই গানের সঙ্গে জ্ঞানের যেমন সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি উৎসব-পার্বণ, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানেরও গভীর যোগসূত্র রয়েছে। দেহ সাধনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সাধনা, কৃষিব্যবস্থা, নৌকা চালনা, বৃক্ষ বন্দনা, গৃহস্থ পশুর সুরক্ষা, শিশুদের সুরক্ষা ও মানবিক পৃথিবীর সুরক্ষার বিষয়গুলো এতে জড়িয়ে আছে। চর্যাগীতি থেকে শুরু করে বর্তমান কালের বাউল-ফকির, করম, ধামাইল, কুষান ইত্যাকার গানের সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সেই সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সংগীত বাংলাদেশের প্রধানতম সংগীতধারাকথাটি একদিকে যেমন সত্য, অন্যদিকে বাঙালি সত্তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও তা নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একদিকে যেমন মিশে আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কীর্তন, জারি, মুর্শিদি, মাইজভাণ্ডারি প্রভৃতি সংগীতধারা; ঠিক তেমনি লালন সাঁই, হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, জালাল উদ্দীন খাঁ, শাহ আব্দুল করিম প্রমুখ ব্যক্তির সৃষ্টিকর্মও। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আমাদের এই সংগীতধারা এখন বিশ্বের বহু ভাষাভাষী মানুষের গবেষণার অংশ হিসেবেও সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী সংগীত আজও অনাদরে পড়ে আছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ঝাঁপানগান ও পাগলা কানাইয়ের গানের কথা। হয়তো এমন আরো কিছু ধারা রয়েছে, যেগুলোর নামও আমাদের অজানা।

বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে ঝাঁপানগানের প্রচলন রয়েছে। ঝাঁপানকে শুধু গান বললে কম হয়ে যাবে; কারণ এটি একদিকে যেমন গান, অন্যদিকে নাট্য-নৃত্য ও লোকক্রীড়ার সমাহার। বিষধর গোখরা এই ধারার অন্যতম প্রধান মধ্যমণি। সাপুড়েরা বিষধর গোখরা সামনে রেখে নৃত্যের তালে সাপ নিয়ে খেলা, নাটক ও গান পরিবেশন করে থাকেন। গানের বিষয়বস্তুতে থাকে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গল-এর বিভিন্ন আখ্যান। অর্থাৎ কখনো মনসার গান, কখনো চাঁদ সওদাগর, কখনো বা বেহুলার গান এই আসরে পরিবেশিত হয়। অন্যদিকে রয়েছে ঝিনাইদহ অঞ্চলের ধুয়া জারির বিখ্যাত সাধক পাগলা কানাইয়ের গান। লালন সাঁইয়ের সমসাময়িক কালে এই সাধকের আবির্ভাব ঘটলেও তাঁর গান তেমন বিস্তার লাভ করতে পারেনি। অথচ তাঁর গানেও এক বিস্তৃত অধ্যাত্মবাদ প্রতিফলিত হয়।

যখন ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া বা বাউলের মতো গানের ধারাগুলো নিয়ে ভাবি, তখন দেখি আমাদের সংস্কৃতিতে এই ধারাগুলোকে কত আদর করে আপন করে নেওয়া হয়েছে! কিন্তু যখনই ঝাঁপান বা পাগলা কানাইয়ের গানের কথা আসে, তখন দেখা যায় এই ধারাগুলো ঠিক ততটাই অবহেলিত। অথচ আমরা গর্বের সঙ্গে বলি, লোকসংগীত আমাদের প্রাণের সংগীত। ঝাঁপান বা পাগলা কানাইয়ের গান কি তাহলে আমাদের লোকসংগীতের অংশ নয়? যদি হয়েই থাকে, তাহলে কেন এই অনাদর! ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বরং তা যেমনই হোক, তাকে আপন করে নেওয়াই কর্তব্য। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের বঙ্গীয় লোক-সঙ্গীত রত্নাকর গ্রন্থে এমন অনেক লোকগানের নাম পাওয়া যায়, যেগুলোর এখন আর অস্তিত্ব নেই। না আছে সুর, না আছে শিল্পী। শুধু বইয়ের পাতায় ইতিহাসের অংশ হয়ে টিকে আছে ধারাগুলো। দীর্ঘকাল চর্চা না থাকলে বা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রচলন না থাকলে সেই ধারা একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। এদের ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই ঘটেছিল।

একসময় মানুষ টেপরেকর্ডার বা ক্যাসেট প্লেয়ারে গান রেকর্ড করত বা শুনত। সেটা যেমন ব্যয়বহুল ছিল, তেমনি ছিল কষ্টসাধ্য। ক্যাসেটের সীমাবদ্ধতাও ছিল অনেক। কিন্তু এখন বেশির ভাগ মানুষের হাতেই স্মার্টফোন রয়েছে, যেখানে অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অবারিত। তা ছাড়া এখন শুধু বেতার বা টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না; ফেসবুক ও ইউটিউবের ব্যাপক প্রসার বর্তমানে লক্ষণীয়। যে ঝাঁপানগানের কথা বলেছি, তা যদি এখন কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে কেউ ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে, তাহলে সুদূর চট্টগ্রাম বা সিলেটের মানুষও তা ঘরে বসে মুহূর্তেই দেখতে পারে। আমরা হয়তো লোকঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই মাধ্যমগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না।

সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণত অঞ্চলভেদে লোকঐতিহ্যকে কিছু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবকিছু সম্ভব হয় নাএটাই বাস্তবতা। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতো। টিভি চ্যানেলগুলোতে অনেক প্রবীণ-নবীন গায়ক-গায়িকাকে সুযোগ দেওয়া হলেও আমাদের লোকশিল্পীদের তেমন একটা দেখা যায় না। গণমাধ্যমে যদি লোকশিল্পীদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া যেত, তাহলে সব ধারার প্রচার ব্যাপকভাবে ঘটত।

আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের আধিক্য এখন লোকসংগীতেও দেখা যায়। দোতারার পরিবর্তে ইউকিলিলি বা ব্যাঞ্জো, ঢোলের পরিবর্তে অক্টোপ্যাড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। বিদেশি বাদ্যযন্ত্র আমাদের গানে প্রয়োগ করা নিঃসন্দেহে ভালো ইঙ্গিত, কারণ এতে তরুণ প্রজন্ম আকৃষ্ট হয়। তবে আমাদের দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোকে সব সময় প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বিদেশি যন্ত্র সহযোগী হতে পারে, কিন্তু সেগুলো যেন আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বকে ঢেকে না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

আমাদের লোকশিল্পীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের সামান্য যে সম্মানি প্রদান করা হয়, তা নিতান্তই অপ্রতুল। তার পরও এক গভীর আবেগ থেকে তাঁরা এই শিল্পকর্ম টিকিয়ে রেখেছেন। কভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁদের অবস্থা হয়ে পড়েছিল নিদারুণ কষ্টের। অনেককে অর্থাভাবে শখের বাদ্যযন্ত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে! এই শিল্পীরা প্রায় কেউই অন্য কোনো পেশায় যুক্ত নন, তাই বাড়তি আয়ের সুযোগও নেই। সরকারি ও বেসরকারিভাবে যদি তাঁদের জন্য মাসিক আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে তাঁরা জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে লোকসংগীতে আরো মনোনিবেশ করতে পারতেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া বাংলাদেশের লোকশিল্পী তালিকা শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে ৬৪ জেলার লোকশিল্পীদের তথ্য রয়েছে। এটি গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে লোকসংগীতের বিষয়টি গুরুত্ব দিলে এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

লোকসংগীত যদি বাংলাদেশের গানের প্রাণ হয়, তাহলে লোকশিল্পীরা হলেন সেই প্রাণের প্রাণবায়ু। অক্সিজেন ছাড়া যেমন জীবন বাঁচে না, তেমনি লোকশিল্পীরা না থাকলে লোকসংগীতও একদিন হারিয়ে যাবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় লোকশিল্পীরা যেন হাহাকার না করে আনন্দের হাসি হাসতে পারেন এবং সুন্দরভাবে তাঁদের শিল্পচর্চা চালিয়ে যেতে পারেন, সেদিকে সচেষ্ট হওয়া আমাদের সবার কর্তব্য।

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন

অনুপম হীরা মণ্ডল

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন

বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে সমতলভূমি ও নদীমাত্রিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। বিকাশও সেই ভৌগোলিক অঞ্চলে। বাঙালির পেশা, নেশা কিংবা খাদ্যাখাদ্যসবই পলল গঠিত সমতলভূমির ওপর নির্ভরশীল ছিল। আজও তা-ই। বাঙালি বসতিতে পাহাড়, মরুভূমি, শৈত্যশৈলী দুর্লভ। বলা যায়, এই জাতির খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছে জল-জলানির্ভর পললভূমির ওপর নির্ভর করেই। প্রাচীন কাল থেকে বাংলার প্রধান খাদ্যশস্য ছিল ধান। বাংলাদেশে শুকনো জমিতে ধান চাষের ইতিহাস বেশিদিনের নয়। সব মিলিয়ে অর্ধশত বছরও শুকনো জমিতে ধান চাষের সূচনা হয়নি। এর আগে নিচু জমিতেই ধানের চাষ হতো।

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন

ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। চর্যাপদের একটি পদে বলা হয়েছে, হাঁড়িত ভাত নাহি, নিতি আবেশী। চর্যাপদে তো ভাত ছাড়া আর কোনো খাদ্যশস্যেরই প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে বাঙালির ভাত খাওয়ার মধ্যেও তারতম্য ছিল। ময়নামতি থেকে শুরু করে ব্রহ্মদেশ পর্যন্ত অর্থাৎ আজকের কুমিল্লা থেকে বার্মা বা মায়ানমার পর্যন্ত মানুষ আতপ চালের ভাত খাওয়ায় অভ্যস্ত ছিল। তখন বাংলার মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে রেঙ্গুন যেত, বৈবাহিক সূত্রে সেখানে স্থায়ী বসতিও গড়ত, কিন্তু খাবার হিসেবে ভাতই গ্রহণ করত। এর বাইরের মানুষ প্রায় সবাই খেত সিদ্ধ চালের ভাত।

ভাত খাওয়া হতো নানা ধরনের ব্যঞ্জন দিয়ে। সেগুলোর রন্ধনপ্রণালীও ছিল নানা রকম। শুধু রান্না করার কৌশল নয়, সবজি কাটাকুটিরও নানা প্রকার-পদ্ধতি ছিল। একেকটি সবজির ভিন্ন ভিন্ন শৈল্পিক আকার দেওয়া হতো। বাঙালি সবজি হিসেবে কাঁচকলা, বিচিকলা, কচু, কচুর লতি, কচুর ফুল, কচুর পাতা, পেঁপে, লাউ, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, উচ্ছে, পটোল, ঝিঙে, শসা, কাপোড়ি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, মেটে আলু, গোল আলু, মিষ্টি আলু, ওল প্রভৃতি ব্যবহার করে। বর্তমানে শীতের সবজিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আলু খাওয়ার চল পর্তুগিজ প্রভাবে বলে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মত।

ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে পান্তা ভাত খেত। বিশেষ করে গরমের সময় পান্তা ভাত খাওয়ার রীতি ছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে পান্তাকে বলা হয় মাদেনি। উত্তরবঙ্গে পান্তা দিয়ে তৈরি করা হয় আমানি। পান্তা বাঙালির কাছে বরাবরই জনপ্রিয় ছিল। তবে শীতে পান্তা খাওয়া হতো না। তখন রাতে রেখে দেওয়া ভাতকে বলা হতো কড়োকড়ো ভাত বা কড়কড়া ভাত। প্রাচীন কালে বাঙালিদের মধ্যে এই ভাত কচ্ছপের মাংস দিয়ে খাওয়া ছিল খুব লোভনীয় ব্যাপার। এ ছাড়া শীতের কড়কড়া ভাত পেঁয়াজ, মরিচ ও তেঁতুল চচ্চড়ি দিয়ে খাওয়া হতো। বিশেষ করে দরিদ্র বাঙালির কাছে পান্তা ভাত আর কড়কড়া ভাত উভয়েই পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে খাওয়ার চল ছিল।

ভাতের পর বাঙালির খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছিল মাছ। মাছ খাওয়া বাঙালির চিরায়ত স্বভাব। তাই হয়তো প্রবাদ তৈরি হয়েছে, মাছে-ভাতে বাঙালি। কবি ঈশ্বর গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) বলেছেন, ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালী সকল। বলা হয়, মাছের প্রতি অনীহা বাঙালির কখনোই ছিল না। নিরামিষ অন্ন গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয় হয়তো খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর পর। বৌদ্ধ ও জৈনদের প্রভাবে বাঙালি নিরামিষ খাবার গ্রহণ করতে শুরু করে। এরপর পঞ্চদশ শতাব্দীতে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে বাঙালির মধ্যে নতুন করে আবার নিরামিষ খাবার গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়।

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন

বাংলার মঠ-মন্দিরের টেরাকোটায় মাছের ছবি আছে। কালিঘাটের পটসহ অনেক পটচিত্রে মাছ, মাছ শিকার, মাছ কোটার ছবি আছে। এ থেকে বাঙালির মত্স্যপ্রীতির একটা চিত্র পাওয়া যায়। আছে অজস্র শিকারযাত্রার ছবি। এ থেকে বাঙালির মাংস খাওয়ার অভ্যাস ছিল বলে ধারণা করা যায়। হরিণ, শূকর, মেষ, ছাগ, বনমোরগ, সজারু ও পাখির মাংস খাওয়া হতো। ব্যাধ সম্প্রদায়ের পেশাই ছিল পাখি ও জীবজন্তু শিকার করে বিক্রি করা। ব্যাধ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব যেহেতু ছিল, সে কারণে মাংস খাওয়ার অভ্যাস যে বাঙালির ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাঙালি হিন্দুর মুরগি খাওয়ার শুরু বেশিদিনের নয়। অর্ধশতাব্দী কাল আগেও বাঙালি হিন্দু মুরগির মাংস খেত না। তবে হাঁস খাওয়ার চল ছিল। ছাগ, পাঁঠা, মেষ খেত। অবাঙালি ত্রিপুরা হিন্দু গোষ্ঠীর মধ্যে মহিষ খাওয়ার চল থাকলেও বাঙালি হিন্দুরা গরু-মহিষের মাংস খেত না। বাংলায় গরুর মাংস খাওয়ার প্রচলন শুরু হয় খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর পর, চট্টগ্রামে আগত আরব বণিকদের আগমনের সূত্রে। তবে এর প্রসার বাড়ে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর।

বাঙালি পাত পেড়ে প্রথম শুরু করত ঘি কিংবা শুক্তো দিয়ে। ঘি খাওয়ার অভ্যাস বেশ পুরনো। নৈষাধচরিত-এ দময়ন্তীর বিবাহভোজে গরম ভাতের সঙ্গে ঘি পরিবেশনের বর্ণনা আছে। চতুর্দশ শতকের শেষ পর্বে রচিত প্রাকৃত পৈঙ্গল গ্রন্থে বলা হচ্ছে, কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল এবং নালিতা (পাটশাক) শাক যে স্ত্রী প্রতিদিন পরিবেশন করেন তাঁর স্বামী পুণ্যবান (ভাগ্যবান অর্থে)। বাঙালির খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাক স্থান করে নিয়েছিল; যেমনপাটশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, ঘিকাঞ্চন, লালশাক, বথুয়াশাক, হেলাঞ্চি, মালঞ্চ, কচুশাক, ঘিরমিশাক, সরিষাশাক, থানকুনি ইত্যাদি। বর্তমানে ডালজাতীয় শাস্যের কচি ডগা শাক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে প্রাচীন বাঙালির খাদ্যতালিকায় ডালের অস্তিত্ব ছিল না বলে নীহাররঞ্জন রায় ধারণা করেন। শাক রান্না করা হতো প্রচুর তেল দিয়ে। তবে তেল আজকের মতো বোতলজাত পণ্য ছিল না। গৃহস্থকে বাড়িতেই নিজের প্রয়োজনমতো তেল তৈরি করতে হতো। পেশাদার তেল প্রস্তুতকারী সম্প্রদায় ছিল, তাদের বলা হতো তেলি বা কলু। সরিষা, তিসি, তিল ইত্যাদি শস্য থেকে তেল তৈরি করা হতো। সরিষা তেল ব্যবহার করে নানা ধরনের আচার এবং সরিষা দিয়ে কাসুন্দি তৈরির চল ছিল, যা এখনো টিকে আছে।

শুক্তো রান্নারও নানা পদ্ধতি ছিল। শুক্তো ছিল দুই ধরনেরশুকনো ও ভেজা। কাঁচকলা, চালকুমড়া, ডাঁটা, বেগুন, সজনেডাঁটাএগুলো দিয়ে শুক্তো রান্না করা হতো। তেতো স্বাদের জন্য নিমপাতা, হেলাঞ্চিশাক কিংবা উচ্ছে দেওয়া হতো। শুক্তোর পর পাতে পড়ত নানা ধরনের শাক। এরপর ব্যঞ্জন। শেষ পাতে পড়ত পায়েস, মিষ্টান্ন, চাটনি কিংবা আচার। নানা ধরনের সুগন্ধি ধানের চাষ হতো। এসব চিকন ধানের চাল দিয়ে পিঠা-পায়েস তৈরি করা হতো। চাটনি বা টক রান্নার জন্য বেশি ব্যবহৃত হতো তেঁতুল। এ ছাড়া আম, আমড়া, চালতা, বরই, হরিফল বা নোয়াল, বিলম্বফল দিয়ে টক বা চাটনি তৈরি করা হতো। চাটনি বা টক রান্নার জন্য ব্যবহার করা হতো আস্ত সরিষা। বর্তমানে চাটনিতে টমেটো নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে।

ব্যঞ্জন বা তরকারি রান্নার দুটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি ছিল। একটা ফোড়ন দিয়ে রান্না, আরেকটা ঢেকে রান্না। তরকারি তেলে ভেজে বসারান্নার রীতি হাল আমলের। প্রাচীন পদ্ধতি হলো সিদ্ধ করে রান্না। যখন বেশি মানুষের খাবারের আয়োজন হতো, তখন ফোড়ন দেওয়ার জন্য আলাদা পাত্র ব্যবহার করা হতো। সেই থেকে হয়তো ফোড়ন কাটা প্রবাদটির উদ্ভব। ব্যঞ্জনের মসলা হিসেবে আদা, হলুদ, মরিচ, গোলমরিচ, মেথি, জায়ফল, লবঙ্গ, দারচিনি, এলাচ, জয়ত্রি, ধনে, রাঁধুনি, সরিষা, জিরা, মৌরি, চুই ব্যবহৃত হতো। বাঙালি প্রাচীন কাল থেকে সুমাত্রা, জাভা, সিংহল (শ্রীলঙ্কা), ইরান প্রভৃতি অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রাখে। এসব দেশ থেকে মসলা ও সুগন্ধি আমদানি করা হতো। সেদিন পর্যন্ত যশোর-খুলনার বাইরের মানুষ মসলা হিসেবে চুইয়ের ব্যবহার জানত না। এখন সারা বাংলাদেশে চুইয়ের ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে অনেক আধুনিক রেস্তোরাঁয় চুইঝালের পদের কদর তৈরি হয়েছে। আজ বাঙালি ব্যঞ্জন রান্নায় মরিচ ছাড়া ভাবতে পারে না। অথচ বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মরিচের ব্যবহার ছিল না। মরিচের ব্যবহার শুরু হয় এ দেশে পর্তুগিজদের আগমনের পর। সেই হিসাবে বাঙালির মরিচ খাওয়ার ইতিহাসকে কোনোভাবেই ষোড়শ শতাব্দীর আগে টেনে নেওয়ার সুযোগ কম। পর্তুগিজরা তাদের সঙ্গে এমন অনেক কিছু এনেছিল, যা আজকের বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, এগুলোকে এখন আর বিদেশি বলে মনে হয় না।

মিষ্টান্নের জন্য ময়রার ওপর নির্ভর করতে হতো। দুগ্ধজাতীয় খাবার তৈরিতে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। ঢাকা ও ময়মনসিংহের পনির ছিল বিখ্যাত। বাংলার অনেক গঞ্জে এখানকার পনির বিক্রি হতো। সন্দেশ, সরভাজা, রসগোল্লা, রসমালাই, চমচম, জিলাপি, দানাদার, রাজভোগ, কমলাভোগ, রসকদম্ব, প্যাড়াসন্দেশএসব বাহারি নাম থেকেই বাঙালির মিষ্টান্নপ্রীতির প্রমাণ মেলে। মিষ্টির চাহিদা মেটাতে খেজুর গুড়, আখের গুড়, গোলের গুড় তৈরি করা হতো। চিনি তৈরির জন্য বাঙালির নিজস্ব পারিবারিক কারখানা ছিল। দুধ-গুড় দিয়ে তৈরি ক্ষীর, জাউ, পায়েস বরাবর বাঙালির কাছে সুস্বাদু খাবার হিসেবে লোভনীয় ছিল।

বাঙালি নিত্যদিন শাক-সবজি দিয়ে খাবার খেলেও বিয়ে কিংবা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ভূরিভোজের বিশাল আয়োজন করত। ধনশালী লোকের বিয়েতে খাবারের এত আয়োজন হতো যে, মানুষ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পদগুলোর সংখ্যা গুনে শেষ করতে পারত না।

সামাজিক ভোজে হরিণ, ছাগ ও পাখির মাংস দেওয়ার রীতি ছিল। আর নানা ধরনের মাছের পদ তো থাকতই। সঙ্গে থাকত নানা ধরনের ব্যঞ্জন। ব্যঞ্জন রান্নায় বাহারি সব মসলা ব্যবহার করা হতো। একেকটি ব্যঞ্জনের সুগন্ধি অন্যটা থেকে ভিন্ন হতো। খাওয়া শেষে নানা ধরনের পিঠা ও দই পরিবেশিত হতো। পানীয় জলের সঙ্গে কর্পূর মেশানোর প্রথা ছিল।

পান ছাড়া যেন আপ্যায়ন অসমাপ্ত থেকে যেত। তাই অতিথিদের নানা ধরনের মসলাযুক্ত পানের খিলি পরিবেশন করা হতো। পান মসলা হিসেবে কর্পূরের ব্যবহার ছিল। প্রাচীন বাঙালির পূজা-পার্বণে পান-তামাক পরিবেশন সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল। ভোজে কিংবা বাড়িতে অতিথি এলে তাদের পান-তামাক দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। এমনকি ভদ্রভাবে বলা হতো, মহোদয়, একটু নেশা ইচ্ছে করুন। এটা সজ্জনতা ও ভদ্রতার অঙ্গ ছিল। আপ্যায়নে নানা ধরনের বাহারি তামাক ব্যবহার করা হতো। মতিহার, পানবোটনানা ধরনের নাম তার। হুঁকা, গুড়গুড়ি, ডাবা প্রভৃতি নেশাযন্ত্রের জন্য তামাক কুচি কুচি করে কেটে খেজুরের ঝোলা গুড় দিয়ে মেখে কলকেতে সাজানো হতো। তামাক পরিবেশন সেকালের আভিজাত্য প্রকাশের অঙ্গ ছিল।

বরাবরই বাঙালি সমাজে পানীয় গ্রহণের রীতি ছিল। দুধ, ডাবের জল, আখের রস, তালের রস, খেজুরের রসসহ নানা ধরনের শরবত পরিবেশন করা হতো। শরবত জনপ্রিয় হয় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে। তবে দেশীয় প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত মদ্য পানের প্রমাণ পাওয়া যায়। গুড় থেকে তৈরি এক ধরনের গৌড়ীয় মদের খ্যাতি ছিল সারা ভারতে। বাইরের মদের প্রসার ঘটে পর্তুগিজ, ফরাসি ও ডাচদের আগমনের পর। আর অভিজাত লোকের মধ্যে মদ্যপান রীতি হয়ে দাঁড়ায় ব্রিটিশ প্রভাবে। তবে ইসলামী সংস্কৃতি বরাবরই মদ্যপানে নিরুৎসাহ করে।

এ দেশে ফ্রিজ আসার আগ পর্যন্ত খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নানা ধরনের দেশীয় পদ্ধতি ছিল। শুকনো খাবার হিসেবে চাল থেকে মুড়ি, খই, চিড়া, তৈরি করা হতো। তিল, নারকেল, বাদাম দিয়ে নানা ধরনের খাজা তৈরি হতো। চিড়া, তিল, মুড়ি, বাদাম, নারকেল দিয়ে নানা ধরনের নাড়ু তৈরি করা হতো। এগুলো সারা বছর চিত্রিত হাঁড়ির মধ্যে রেখে শিকায় তুলে রাখা হতো। অসময়ে অতিথি এলে এসব শুকনো খাবার দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হতো। বর্তমানেও এসব শুকনো খাবারের চল আছে। এগুলো তৈরিতেও নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা বাণিজ্যিকভাবে এগুলো তৈরি করে। বাঙালির খাদ্যে বৈচিত্র্য আসে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে। বিশেষ করে মোগলদের রসনাবিলাস বাঙালিকে বেশ আকর্ষণ করে। নানা রকম পরোটা, মাংসের নানা পদ এবং পানীয় হিসেবে নানা শরবতের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতিতে এসেছে নানা পরিবর্তন। এখন পোলাও, জর্দা পোলাও, বিরিয়ানি প্রভৃতি খাবার গ্রহণে বেশি আগ্রহ। তরুণ প্রজন্ম চটজলদি খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফাস্ট ফুড আর স্ট্রিট ফুডের জয়জয়কার। ফাস্ট ফুড হিসেবে বার্গার, হটডগ, পিত্জা, চিকেন শর্মা, ভেজিটেবল রোল, এগ রোল, স্যান্ডউইচ, বাটার বান, চিকেন বান প্রভৃতি খাবার জনপ্রিয় হচ্ছে। স্ট্রিট ফুড হিসেবে মিট বক্স, চিকেন ফ্রাই, শাশলিক, চিকেন বল, নুডলস, চিজ বল, অন্থন ও নানা ধরনের স্যুপ খাওয়ার চল হয়েছে। এর সঙ্গে নানা চপ, শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, লুচি, চটপটি, ঘুগনি ভিড়ের মধ্যে এখনো টিকে আছে। যে বাঙালি একসময় বাড়ি থেকে বের হলে চিড়া-মুড়ি সঙ্গে বেঁধে বের হতো, তারা এখন প্রায় সবাই রেস্টুরেন্টে খায়। চায়নিজ, থাই, ইন্ডিয়ান নামে নানা স্বতন্ত্র স্বাদের খাবারের আলাদা রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। অনেকে তো নাগরিক জীবনে ঠিকমতো বাড়িতে রান্নার সময় করে উঠতে পারছেন না। ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য তাঁরা পছন্দের রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সরবরাহ করতে নানা প্রতিষ্ঠানকে চাহিদা জানাচ্ছেন। তৈরি হয়েছে নানা অ্যাপস, প্রতিষ্ঠান। তারা বাড়িতে এসে দ্রুত গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে এটা একটা নীরব বিপ্লব বলা যায়।

 

পা হা ড়ি উ ৎ স ব

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বর্ষবরণ উৎসব

ম্যাকলিন চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বর্ষবরণ উৎসব

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলরাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ভিন্ন ভাষাভাষী ১৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী সহাবস্থানে বসবাস করছে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, ভাষা ও উৎসবের বৈচিত্র্য দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে; বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব, যা একক কোনো নামে সীমাবদ্ধ নয়।

ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিঝু, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু, ম্রোদের চাক্রান, খিয়াংদের সাংলান, অহমিয়াদের বিহু এবং সাঁওতালদের পাতাএই ভিন্ন ভিন্ন নামে উৎসবগুলো উদযাপিত হয়। প্রতিটি উৎসবের নিজস্ব স্বতন্ত্র ইতিহাস ও তাৎপর্য রয়েছে, যা সম্মিলিতভাবে সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির গভীরতা ও বৈচিত্র্য তুলে ধরে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বর্ষবরণ উৎসব

দেবী গঙ্গার আরাধনায় কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়।    ছবি : রকিব উদ্দিন রকি

ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতা

এই বর্ষবরণ উৎসবের ইতিহাস মূলত কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা জুম চাষ, যা ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল। ফসল সংগ্রহের পর নতুন বছরের সূচনা করা শুধু বাস্তবিক প্রয়োজন নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন। মূলত এই উৎসবগুলোই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব, যেখানে পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট, রোগ-ব্যাধি ও অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরের জন্য কল্যাণ কামনা করা হয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক জীবনের পুনর্জাগরণ নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক পুনর্নবীকরণের প্রতীক।

ধর্ম ও প্রকৃতির প্রতি আস্থা এই উৎসবের মূল ভিত্তি। চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব স্পষ্ট; তারা বর্ষবরণ উপলক্ষে মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করে এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। অন্যদিকে অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকৃতিপূজার ঐতিহ্য দৃঢ়। পাহাড়, নদী, ঝিরি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানে অপরিহার্য।

উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান

চাকমাদের বিঝু তিন দিন উদযাপিত হয়। ফুল বিঝু, মুর বিঝু ও গোজ্যেপোজ্যে দিন। ফুল বিঝুর দিন ঝিরি, নদী বা হ্রদে ফুল নিবেদন করা হয়, যা পবিত্রতা ও নতুন সূচনার প্রতীক। মুর বিঝুর দিন পরিবার ও সমাজের মানুষ একত্রিত হয়ে একে অপরের বাড়িতে যায়, আপ্যায়ন উপভোগ করে। এই দিনে রান্না করা হয় পাজন, যা বিভিন্ন পাহাড়ি সবজি দিয়ে তৈরি এবং সামষ্টিকতার প্রতীক।

মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবে পানির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ; একে অপরের ওপর পানি ছিটিয়ে আনন্দ উদযাপন করা হয়, যা শুদ্ধতা ও সৌহার্দ্যের নিদর্শন। ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবে নৃত্য, সংগীত ও সামাজিক মিলনমেলা প্রধান আকর্ষণ। তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু, ম্রোদের চাক্রান, সাঁওতালদের পাতা, অহমিয়াদের বিহু, খিয়াংদের সাংলান উৎসবেও সামাজিক ঐক্য, আনন্দ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়।

এসব উৎসব শুধু নতুন বছরকে বরণ করার মাধ্যম নয়; এগুলো সমাজের মানুষগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরো দৃঢ় ও গভীর করে তোলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পাথেয় হিসেবে কাজ করে।

সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন

সময়ের সঙ্গে এই বর্ষবরণ উৎসবগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে এগুলো ছিল সম্পূর্ণ গ্রামকেন্দ্রিক, সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত। বর্তমানে শহরাঞ্চলেও এগুলো উদযাপিত হচ্ছে, যেখানে শোভাযাত্রা, মঞ্চভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আধুনিক উপস্থাপনা যুক্ত হয়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও শিক্ষার প্রসারের ফলে এসব উৎসব বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের গভীরতা আড়াল হওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী কি তাদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? এর উত্তর জটিল। একদিকে তরুণ প্রজন্ম আধুনিকতার প্রভাবে ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে; অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো উৎসবের মূল রূপ অটুট রয়েছে। এই বাস্তবতায় আমাদের একটি সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ জরুরি। নিজ নিজ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তা বজায় রেখে আমাদের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলো পালন করা উচিত। কারণ সংস্কৃতির মূল শক্তি তার নিজস্বতায়।

বলা যেতে পারে, বর্ষবরণ উৎসবগুলো শিকড় হারায়নি; বরং সময়ের সঙ্গে নতুন রূপে বিকশিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য ঐতিহ্য, ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা তৈরির তাগিদ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

সব শেষে বলা যায়, পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব বিঝু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাক্রান, সাংলান, পাতা ও বিহু শুধু উৎসব নয়; এটি তাদের জীবনবোধের অংশ। এটি মানুষ, প্রকৃতি ও বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ককে ধারণ করে। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল হলেও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ থাকলে তা কখনো হারায় না; বরং সময়ের সঙ্গে আরো সমৃদ্ধ হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান পাথেয় হয়ে ওঠে।