লোকায়ত বাংলার অন্যতম আর্কষণ মেলা। সেকালে চৈত্রসংক্রান্তি, অষ্টমী, বারুণী, পৌষ-পার্বণ, পুণ্যাহ, রথযাত্রা, বাংলা নববর্ষ, চৈত্রপূজা, চড়ক, মহররম, মাঘী পূর্ণিমা প্রভৃতি উপলক্ষে আয়োজিত হতো মেলা। কালের প্রবাহে বেশির ভাগ উপলক্ষের মেলা হারিয়ে গেছে আজ বিস্মৃতির অতলে। তবু একালেও মেলা বসে। মেলা হয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও হবে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা দেশের শহর ও গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় এবং এর নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এক দিন থেকে মাসব্যাপী চলতে পারে। রূপ বদলে নতুন মহিমা ও প্রাসঙ্গিকতা ধারণ করে সারা দেশে উদযাপিত হয় বৈশাখী মেলা।

বৈশাখী মেলা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী লোক উৎসব, যা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা শুধু আনন্দ-বিনোদন নয়; জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকজীবন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। সেকালে বৈশাখী মেলার যে উদযাপন অনুষঙ্গসমূহ প্রচলিত ছিল, আজকের পরিসরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তা অনেকখানিই বদলে গেছে। বৈশাখী মেলার মেলাবদলের কথা প্রসঙ্গক্রমে আগের যুগের মানুষের মুখে মুখে ফেরে স্মৃতির আখ্যান হয়ে।

মেলায় বাঁশি, একতারা দেখছে দর্শনার্থীরা। ছবি : শেখ হাসান
ড. আশরাফ সিদ্দিকীর ‘পল্লীমেলা’ লেখায় সেকালের মেলার পরিচয় মেলে। পুস্তক প্রকাশের সাল গণনা করলে লেখাটির বয়স ২৫ বছর। সেই লেখায় তিনি পল্লীর হস্তশিল্প সমাহারের উল্লেখ করেন। গ্রামগঞ্জের কুমাররা তৈরি করত ছোট ছোট খেলনা, মাটির বাসনপত্র, মাটির ঘোড়া, হরিণ, গরু, ষাঁড়, বলদ, গাভি, ছাগল, ভেড়া, মোরগ, পাখি, মাছ, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, লিচু ইত্যাদি। তাতে বিভিন্ন রং দেওয়া হতো। নয়া রঙের চিকচিক মনে করিয়ে দিত বৈশাখী মেলার অনুভব। ছেলেমেয়েরা প্রায়ই সেগুলো কিনত। শুধু কি কুমারের খেলনা, গ্রামের কামার লোহা দিয়ে কত রকম ছুরি, বঁটি, দাঁড়িপাল্লা, ছোট ছোট চেয়ার-টেবিল, থালা-বাসন প্রভৃতি তৈরি করত! মেলায় ছোট ছোট ছুরির প্রধান ক্রেতা ছিল শিশু-কিশোররা; কাঁচা আম কাটার জন্য। কচি আম মাখার প্রথম শর্তই সেই লোহার ছুরি। মেলায় আসত কাঠের তৈরি কত রকমের পিঁড়ি, চেয়ার, টেবিল, ঘোড়া, হরিণ, ষাঁড়, গাভি, বেলচা, বেলন—কত কী! আসত বিভিন্ন রকম বাঁশের বাঁশি। নানা রকমের ঘুড়ি (গুড্ডি)—বিভিন্ন তাদের নাম, পতিঙ্গা, ফেচকা, বাক্স, সাপা, চং, মানুষ ইত্যাদি। নানা রঙের কাগজে সেগুলো তৈরি হতো। মানুষ ঘুড়ি ছিল মানুষের মতো অবয়বের, হেলেদুলে উড়ত সুতার অন্য প্রান্তে। দেখে কী আনন্দ ছোটদের! কী স্ফূর্তি! অমন একটি ঘুড়ি কিনে ছোটদের কী যে রাজ্য জয়ের আনন্দ!

ছবি : লুৎফর রহমান
অন্যদিকে আবার বিচিত্র রকমের উড়কি-মুড়কি তৈরি হতো। চালের গুঁড়ি দিয়ে লম্বা লম্বা উড়কি (উখরা) তৈরি হতো। একটির গায়ে আরেকটি লেগে থাকত। রং ছিল সাদা। উড়কি গুড় বা চিনি দিয়েও অনেক সময় মিষ্টি পদ তৈরি হতো। খেতে সুস্বাদু! তার সঙ্গে ছিল চিনি বা গুড়ের সাজ। ছাঁচে ফেলে তৈরি হতো চিনি বা মিছরি জমিয়ে। হাতি, ঘোড়া, পাখি, আম, লিচু, কাঁঠাল—সব রকমের ছাঁচে। খাওয়া হতো উখরা বা উড়কির সঙ্গে। ছিল মুড়কি। ভুট্টার খই দিয়ে তৈরি হতো। ছিল বিন্নির খই, বিন্নিধানের তৈরি। ছিল বাদাম, টানা, চিনাবাদাম গুড় বা মিছরি দিয়ে জমানো। আর ছিল ফুটকলাই। মটর কলাই বালু দিয়ে ভাজা হতো। ভিড় জমে যেত এই ফুট বা ফুটকলাইয়ের জন্য। খেতে হতো চিনির সাজ দিয়ে—ভারি মজা। বিক্রি হতো কত যে নাড়ু—তিলের, চিনার, ঢ্যাপের (শাপলা ফুল), খইয়ের নাড়ু, চিড়ার নাড়ু। আর বিক্রি হতো শোলার সাদা মালা, দেখতে সাদা ফিতার মতো, বেশ ভাঁজ ভাঁজ। সবাই গলায় পরত। শোলা দিয়ে আরো তৈরি হতো কত পাখি, ফুল, গাছ, মুকুট, মুখোশ প্রভৃতি।
এ ছাড়া হাতে তৈরি বিচিত্র পাটি, রঙিন পাটের শিকা, ঘোড়ার ফিক (লেজের লোম) দিয়ে অপূর্ব সব খেলনা—সারিন্দা, বাঁশ ও কাগজের তৈরি চরকি, ঘোড়ার ফিকের চটরবটর, বাঁশ ও কাগজের তৈরি মাছ, কুমির, কচ্ছপ উঠত। সাধারণ টিন দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ি, বাঁশি, ঝুনঝুনি, কাঠের ওপরে চামড়া বসানো ডুগডুগি, ছোট ঢোলক—কত কিছু! এ ছাড়া মেলায় হতো বিভিন্ন খেলা। এক রকমের খেলা ছিল, বলা হতো ‘ঢেঁকি ঘুরানি’। দেয়ালঘড়ির বৃত্তাকার সময়ের ছকের মতো কাগজের ওপর বসানো থাকত একটি লোহার তীরের মতো শলাকা। শলাকাটি ঘুরিয়ে দিলে অনেকক্ষণ ঘুরত। পয়সা দিয়ে ঘোরাতে হতো। ছকের শূন্য চিহ্নে পড়লে গচ্চা গেল। খুব ভিড় হতো নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য। অনেক সময় খেলার দোকানি বেশ ক্ষতিগ্রস্তও হতো—যদি খেলোয়াড়রা অনবরত জিতত। তখন সে অবশ্য খেলা বন্ধ করে দিত।
ছিল ছক্কা খেলা। ছক্কার ঘুঁটি থাকত বাটিতে। দুটি বাটি নিয়ে ঝাঁকানি দিয়ে দান উঠলে যত পয়সা ধরত, তার ডবল পেত। এই খেলায়ও অনেক সময় খেলার দোকানিকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতো। আর ছিল রাধাচক্কর খেলা। কালো রঙের মাটির পুতুল থাকত কাপড়ের ঢাকনার নিচে। না দেখে হাতড়ে রাধাকে তুলতে পারলে তবেই জিত, পয়সাপ্রাপ্তি।
শহর থেকে আসত বায়োস্কোপ। মোটা বাক্স ক্যামেরার মতো স্ট্যান্ডের ওপর রাখা হতো। কালো কাপড়ে ঢাকা। ছোট ছোট ফিল্মের ছবি এক আনায় বাক্সের ছিদ্র দিয়ে দেখা যেত। সাহেব-বিবি, বড় বড় ঘরবাড়ি। হয়তো এগুলো বিদেশ থেকে আসত। কিন্তু ছড়া ছিল চমৎকার।
কোনো কোনো মেলায় ঘোড়দৌড় হতো। ছুটত ঘোড়া টগবগ টগবগ। বিজয়ী ঘোড়া পেত পুরস্কার। হতো লাঠিখেলা, গ্রাম্য লাঠিয়ালের সে কত কসরত!
অতীতের বৈশাখী মেলা ছিল মূলত গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত এক লোক উৎসব। সরল, অনাড়ম্বর এবং গভীরভাবে লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিকতা ছিল মেলার প্রাণ। কিন্তু সময়ের প্রবাহে, বিশেষ করে নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিকাশ এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে বর্তমান বৈশাখী মেলায় দৃশ্যমানভাবে বহু পরিবর্তন এসেছে।
নগরবাসীকে মেলায় যাওয়ার সুযোগ করে দিতে এবং দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে তুলে ধরতে রাজধানীতে মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন ও বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মেলায় অংশ নেয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পীরা। তারা তাদের তৈরি বিভিন্ন কারুপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে মেলায়। অনেক শিল্পী তাদের পণ্য তৈরি করেও দেখায় দর্শনার্থীদের। হাতে তৈরি নানা রঙের মাদুর বিক্রি হয়। মেলায় দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ আবদুল জলিল মণ্ডলের বায়োস্কোপ।
আগে বৈশাখী মেলা প্রধানত গ্রামাঞ্চলে বসত। খোলা মাঠ, বটতলা, নদীর পার বা হাটবাজারকেন্দ্রিক ছিল এর আয়োজন। এখন শহরকেন্দ্রিক মেলার সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, চারুকলা প্রাঙ্গণ বা শহরের পার্কগুলোতে বড় আকারে বৈশাখী আয়োজন দেখা যায়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। অতীতে মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন বস্তুগত লোক উপাদান। বর্তমানে এসবের পাশাপাশি বা কখনো এগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের খেলনা, চায়না পণ্য ও আধুনিক গিফট আইটেম। আগে যেখানে মাটির ঘোড়া বা পুতুল জনপ্রিয় ছিল, এখন সেখানে ব্যাটারিচালিত গাড়ি বা ইলেকট্রনিক খেলনা বেশি বিক্রি হয়। আগে বাউলগান, যাত্রাপালা, পালাগান, লাঠিখেলা, সার্কাস ইত্যাদি ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন এসবের পাশাপাশি ডিজে মিউজিক, আধুনিক গান, এমনকি কনসার্টও যুক্ত হয়েছে। অনেক শহুরে বৈশাখী মেলায় লোকসংগীতের বদলে ব্যান্ডসংগীত বা উচ্চ শব্দের ডিজে পারফরম্যান্স দেখা যায়।
অতীতে মেলা ছিল মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র। বর্তমানে এটি অনেকাংশে বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। বড় বড় ব্র্যান্ড, করপোরেট স্পন্সরশিপ এবং প্রচারণা যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন কম্পানি বৈশাখ উপলক্ষে স্টল বসিয়ে তাদের পণ্য প্রচার করে, যা আগে দেখা যেত না। আগে মেলায় পিঠা, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, জিলাপি প্রভৃতি দেশীয় খাবারের আধিক্য ছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফাস্ট ফুড, বার্গার, পিজা, কোমল পানীয়। শহরের মেলায় এখন ফুচকা, চটপটির পাশাপাশি বার্গার-ফ্রাইয়ের দোকানও সমান জনপ্রিয়। অতীতে মেলা ছিল সম্পূর্ণ অফলাইন অভিজ্ঞতা। এখন প্রযুক্তির প্রভাবে মেলার অভিজ্ঞতা বদলে গেছে। মানুষ এখন মেলায় গিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে, লাইভ করে, এমনকি অনলাইনেও অনেক পণ্য বিক্রি হয়। আগে মেলায় নিরাপত্তা ছিল খুব সীমিত ও অনানুষ্ঠানিক। এখন প্রশাসনিক তদারকি, পুলিশ, সিসিটিভি ক্যামেরা ইত্যাদির ব্যবহার বেড়েছে। বড় শহরের মেলাগুলোতে প্রবেশপথে নিরাপত্তা চেকিং ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উপস্থিতি থাকে। আগে মেলায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। এখন এটি জাতীয়, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অংশগ্রহণে রূপ নিয়েছে। পর্যটক ও বিদেশিরাও এখন বৈশাখী মেলায় অংশ নেয়, যা আগে খুব সীমিত ছিল।
অন্যদিকে নগরজীবনে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় যে লোকজ পণ্যসম্ভার দেখা যায়, তার সঙ্গে ফোকলোরিসমাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। ফোকলোরিসমাস বলতে বোঝায় লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বা উপাদানগুলোকে তাদের স্বাভাবিক সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে নতুন, বিশেষত নগর বা বাণিজ্যিক পরিবেশে উপস্থাপন করা। অর্থাৎ লোকজ উপাদান যখন তার মূল জীবন্ত ব্যাবহারিক ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রদর্শন, বিপণন বা বিনোদনের বস্তু হয়ে ওঠে, তখন সেটিই ফোকলোরিসমাস।
নগরকেন্দ্রিক বৈশাখী মেলায় আমরা যেসব লোকজ পণ্য দেখি—মাটির তৈরি পুতুল, ঘোড়া, বাঁশ ও কাঠের হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, লোকজ অলংকার প্রভৃতি মূলত গ্রামীণ লোকজীবনের দৈনন্দিন ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের অংশ ছিল। কিন্তু শহরের মেলায় এগুলো ভিন্ন অর্থে উপস্থিত হয়। গ্রামে মাটির পুতুল শিশুদের খেলার উপকরণ ছিল, কিন্তু শহরের মেলায় তা হয়ে উঠেছে ‘শোভা’ বা ‘স্মারক’। অর্থাৎ ব্যাবহারিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নান্দনিকতা ধারণ করেছে। বেশির ভাগ লোকজ পণ্য এখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হয়। ডিজাইন, মোটিফ, রং, আকার—সবকিছু পরিবর্তিত হয় ক্রেতার রুচি অনুযায়ী। ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার মোটিফে এখন ফ্যাশন আইটেম ব্যাগ, কুশন কাভার ইত্যাদি বিক্রি হয়। আগে এসব পণ্যের সঙ্গে জীবনযাপন, বিশ্বাস ও আচার জড়িত ছিল। এখন এগুলো ‘সংস্কৃতির প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন—পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা পোশাক, হাতপাখা একটি সাংস্কৃতিক আইকন। নগরের মেলায় লোকজ পণ্য অনেক সময় স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, বরং দর্শনার্থী বা পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য প্রদর্শিত হয়। এতে লোকসংস্কৃতি ‘জীবন্ত চর্চা’ থেকে ‘প্রদর্শনীর বস্তুতে’ রূপ নেয়। নগরের বৈশাখী মেলায় লোকজ পণ্যের উপস্থিতি একদিকে যেমন ঐতিহ্যকে নতুন জীবন দিচ্ছে, অন্যদিকে তা ফোকলোরিসমাসের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে নতুন অর্থে রূপান্তর করছে। ফলে এটি এক দ্বৈত প্রক্রিয়া—সংরক্ষণ ও পরিবর্তন—যেখানে লোকসংস্কৃতি বেঁচে থাকে, কিন্তু আগের রূপে নয়; বরং নতুন সামাজিক বাস্তবতায় অভিযোজিত হয়ে।
সেকাল থেকে একাল, মেলার রূপের এই পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক নয়, এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গভীর রূপান্তরের প্রতিফলন। গ্রামীণ সরলতা থেকে নগরকেন্দ্রিক বহুমাত্রিকতায় উত্তরণ আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রভাব এবং বিশ্বায়নের অভিঘাতকে স্পষ্ট করে। এই বদলের ফলে একদিকে যেমন লোকজ সংস্কৃতি নতুন পরিসরে বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে তার মৌলিকতা ও স্বাভাবিক কনটেন্ট হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করা যায় না। কারণ রূপান্তরের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতি টিকে থাকে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে। তাই মেলার রূপ বদলের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত এই দ্বৈততায়—সংরক্ষণ ও অভিযোজনের সমন্বয়ে। আমাদের দায়িত্ব হলো আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি মেলার অন্তর্নিহিত লোকজ চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখা, যাতে পরিবর্তনের ভেতরেও ঐতিহ্যের প্রাণশক্তি অব্যাহত থাকে।








