চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষা আর দশটি সাধারণ শিক্ষার মতো নয়। এই শিক্ষার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। চিকিৎসকের সামান্য ভুলেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। এ জন্য চিকিৎসাশিক্ষার মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে সেই মান নিশ্চিত হচ্ছে কি? গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসাশিক্ষার দুরবস্থার নির্মম চিত্রই উঠে এসেছে। সরকারি ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক বিষয়ে অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন। নেই পর্যাপ্ত অধ্যাপক, সহযোগী কিংবা সহকারী অধ্যাপকও। অনেক মেডিক্যাল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই, ক্লিনিক্যাল শিক্ষার জন্য যেতে হয় অন্য কোনো হাসপাতালে। রয়েছে অবকাঠামোসহ নানা রকম সংকট। তা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার সম্প্রতি আরো দুটি মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে। বিবেচনাধীন আরো ছয়টি মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন।
জানা যায়, পাঁচ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ। এখনো সেখানে নিজস্ব কোনো হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। ক্লিনিক্যাল ক্লাস করতে সপ্তাহে দুই দিন শিক্ষার্থীদের যেতে হয় ৫০ কিলোমিটার দূরের সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। শুধু সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ নয়, একই চিত্র দেখা যায় নেত্রকোনা, নওগাঁ, নীলফামারী, মাগুরা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও রাঙামাটি—এই সাতটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজেও। এসব মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরও প্রয়োজনীয় নিজস্ব ক্যাম্পাস বা হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রায় অর্ধেক শিক্ষকের পদ শূন্য। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মৌলিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ সাত হাজার ৩৬টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে তিন হাজার ৫২টি পদ। অর্থাৎ মোট পদের প্রায় ৪৩ শতাংশই খালি। আটটি মৌলিক বিষয়ে ২৫ শতাংশ এবং ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ৪৮ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিনে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র একজন, তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত। মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অধ্যাপক পদের ৭২.৭২ শতাংশ, সহযোগী অধ্যাপক পদের ৫১.৬৯ শতাংশ এবং সহকারী অধ্যাপক পদের ২৯ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিক্যাল এডুকেশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রকৃত চিকিৎসাশিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর মতে, দক্ষ শিক্ষক না থাকলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর। ফরেনসিক মেডিসিনের শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে শুধু চিকিৎসাশিক্ষাই নয়, বিচারব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার মান কমে গেলে মানুষ সঠিক বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
প্রয়োজনীয় নীতি ও পরিকল্পনার অভাব এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কারণে দেশে চিকিৎসাশিক্ষার মান দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। আমরা মনে করি, আর কোনো নতুন মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন দেওয়ার আগে পুরনো সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ক্লিনিক্যাল শিক্ষার জন্য হাসপাতাল ও শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি না হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় ধস নামবে এবং ভুল চিকিৎসায় মানুষের জীবনহানির শঙ্কাই শুধু বাড়বে।

