একটা স্মার্ট ডিভাইস আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বিশ্ব এখন আপনার হাতের মুঠোয়। আপনি কোথায় থাকছেন, কী করছেন; তাতে অনেক নিয়োগদাতার কিছুই যায় আসে না। আপনাকে দেওয়া কাজ ঠিকঠাকমতো করে দিলেই হলো।
নির্দিষ্ট একটা অফিস, সেখানে ১০টা-৫টা হাজিরার গৎবাঁধা ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসছেন অনেকে। একটা ল্যাপটপ আর কফিশপের একটা নিরিবিলি কোণেই চলছে আস্ত একটা অফিস। করোনা যখন বিশ্বজুড়ে সবকিছু স্থবির করে দেয়, তখনও ওয়ার্ক ফর্ম হোম বা বাসায় বসে অফিস করার ধারণা দারুণ জনপ্রিয়তা পায়।
ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ধারণাকে ওয়ার্ক ফ্রম মানালিতে বদলে নিয়েছেন ভারতের এক কর্পোরেট দম্পতি। ব্যস্ত শহরের কোলাহল ছেড়ে তারা ডেরা বেধেছেন হিমালয়ের কোলে শান্ত, স্নিগ্ধ, প্রশান্তির মানালিতে। অনেকে অনেক পরিকল্পনা করে ব্যস্ত জীবন থেকে দুদিনের ছুটি নিয়ে মানালিতে বেড়াতে যান, আর এই দম্পতি মানালিতেই খুঁজে পেয়েছেন জীবনের মানে।
তাদের এই নতুন জীবন নিয়ে দুজনের করা একটি ভিডিও ইনস্ট্রগ্রামে পোস্ট করতেই সেটি দারুণ ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে তো অবসর জীবনটা শহরের বাইরে কোনো নিরিবিলি জায়গায় কাটাতে চান। কিন্তু অঞ্জলি আর নামান, নামের এই জুটি ব্যস্ত কর্মজীবনেই খুজে নিয়েছেন প্রশান্তির ছোঁয়া।
তারা মূলত প্রশান্তির খোঁজেই মানালি গিয়েছিলেন। এখন হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান অক্ষুন্ন রেখেও মাসে তাদের ৩০ হাজার রুপিরও বেশি সাশ্রয় হচ্ছে। এটা অবশ্য তারা করতে চাননি, এটা তাদের বোনাস প্রাপ্তি।
ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করা ভিডিওতে তারা বলেন, খরচ কমানো নয়, তারা আসলে জীবনের গতি কমাতে চেয়েছিলেন। ব্যস্ত শহরের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে হাফিয়ে উঠেছিলেন তারা।
ভিডিওতে অঞ্জলি বলেন, ‘কোনো চেষ্টা ছাড়াই আমরা হঠাৎ করেই প্রতি মাসে ৩০ হাজার রুপিরও বেশি বাঁচাতে শুরু করেছি।’
ভিডিওতে এই সুখী জুটি বলেন, ‘হাই, আমরা অঞ্জলি এবং নামান। আমরা মানালিতে বসবাসকারী একটি রিমোট কর্পোরেট দম্পতি। আমরা এখানে টাকা বাঁচাতে আসিনি, আমরা আমাদের কর্পোরেট চাকরি ঠিক রেখেই ধীরগতির ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে এসেছিলাম।’
এরপর তারা মাসে ৩০ হাজার রুপিরও বেশি সাশ্রয়ের একটা বাস্তবসম্মত হিসাব দেন। সবচেয়ে বড় সাশ্রয় হয়েছে বাড়ি ভাড়ায়। শহরে যেখানে তাদের ভাড়া বাবদ মাসে তাদের গুনতে হতো ৪৫ হাজার রুপি, মানালিতে আসার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার রুপিতে। ফলে বাড়ি ভাড়া খাতে তাদের বেঁচে যচ্ছে ১৭ হাজার রুপি। রিমোট কাজের কারণে তাদের প্রতিদিনের যাতায়াত খরচও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যা প্রতি মাসে অন্তত ৩ হাজার রুপি বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া অফিস শেষে রাতের খাবার, কফি বা টুকটাক নাস্তা খাওয়ার মতো যে খরচগুলো আগে নিয়মিত বিষয় ছিল; তা-ও এখন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এর ফলে তাদের মাসিক বাজেট থেকে আরও প্রায় সাড়ে ৭ হাজার রুপি কম খরচ হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল তাদের ছুটির দিনের ভ্রমণের খরচ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া। শহরে থাকার সময় ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তি পেতে তারা ছোটখাটো ভ্রমণের পেছনে মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার রুপি খরচ করতেন। মানালিতে আসার পর তাদের আর আলাদা করে এমন কোনো ছুটির পরিকল্পনা করতে হয় না। কারণ প্রকৃতি ও শান্ত পরিবেশ এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। প্রতিদিন তারা ছুটির মেজাজেই থাকতে পারেন।
অঞ্জলি জোর দিয়ে বলেন যে, এই আর্থিক লাভটি ছিল তাদের জন্য স্রেফ একটি অপ্রত্যাশিত উপহার। তিনি বলেন, ‘আমরা কম খরচে থাকার জন্য রিমোট কাজের সুযোগ বেছে নিইনি; আমরা এটি বেছে নিয়েছিলাম ভিন্নভাবে বাঁচার জন্য। এই সাশ্রয়টা ছিল কেবলই একটি বাড়তি পাওনা।’
ভিডিওটি অনলাইনে নাগরিক জীবনের নানান খাতের খরচ রিমোট কাজের আর্থিক সুবিধা এবং কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখতে মহানগর ছেড়ে ছোট শহরগুলোতে পেশাজীবীদের পাড়ি জমানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নগদ অর্থ ছাড়াও যে প্রশান্তি মিলছে, আর্থিক মূল্যে তার দাম ধরা সম্ভব নয়।
শহরের যানজট, আর ধুলাবালিতে জেরবার জীবন থেকে এমন আরামের জীবনে বদলে যাওয়া তাদের স্বাস্থ্যেও দারুণ ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। চিকিৎসা খাতেও নিশ্চয়ই তাদের খরচ কমে যাবে, বেড়ে যেতে পারে তাদের প্রত্যাশিত আয়ু।
অনেকে তাদের ভিডিওতে নানারকম মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ ভিন্নমতও পোষণ করেছেন। একজন লিখেছেন, ‘কিন্তু সন্ধ্যায় কি খুব শান্ত হয়ে যায় না? যেহেতু আমি সারাজীবন একটা মহানগরীতে থেকেছি, আমার মনে হয় আমি কোলাহলে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মানছি যে মাঝে মধ্যে সবার একটু শান্তি ও নীরবতা প্রয়োজন। কিন্তু মানালির একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার পুরো জীবনটা সরিয়ে নিয়ে যাওয়াটা একটু অবাস্তবই মনে হচ্ছে।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘শহুরে জীবনের ধকল সামলাতেই টাকা খরচ হয়ে যায়।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘যেকোনো জায়গা থেকে কাজ করার এটা আসল সুবিধা, উন্নত জীবনযাত্রা, কিন্তু খরচ কম।’
তবে অনেকের মনের কথাটা বলেছেন আরেক মন্তব্যকারী, ‘মানালি থেকে মাসে ৩০ হাজার রুপি সঞ্চয় করাটা এমন এক স্বপ্নের মত, যা অনেক কর্পোরেট কর্মী গোপনে দেখে থাকেন।’
তবে এ সুখী দম্পতি মানালির আগে কোন শহরে থাকতেন বা কোন প্রতিষ্ঠানে তারা চাকরি করেন; সে ব্যাপারেও ভিডিওতে কিছু উল্লেখ করেননি।