ভারতের পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের মৃত্যু সিনেমা না বাস্তব, দ্বন্দ্বে পড়ে যাবেন যে কেউ। বাগদত্তা সিয়া গোয়াল আর তার প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীর নিখুঁত পরিকল্পনায় কেতনের মৃত্যুর ঘটনা যেন থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়।
গত ফেব্রুয়ারিতে কেতন আগরওয়াল আর সিয়া গোয়ালের বাগদান হয়েছিল। প্রস্তুতি চলছিল জমকালো বিয়ে আয়োজনের। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য জয়পুরে ১৭ কোটি টাকায় একটি রাজপ্রাসাদ ভাড়া করা হয়েছিল, অতিথিদের আনা-নেওয়ার জন্য দুটি বিমানও ভাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু সিয়া গোয়ালের এ বিয়েতে মন ছিল না। তিনি মন দিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী চেতন চৌধুরীকে।
বিয়ের পরিকল্পনা এগিয়ে যেতেই সিয়া আর চেতন মিলে কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রথমে সিয়া ভেবেছিলেন দেশের বাইরে কোনো নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে কেতনকে হত্যা করবেন। কিন্তু সিয়া একা এটা করতে সাহস পাননি। ট্র্যাকিং কেতনের খুব পছন্দ ছিল। সেই পছন্দকে কাজে লাগিয়েই সিয়া পাল্টে নেন হত্যা পরিকল্পনা। গত ৩১ মে কেতন আর সিয়া পুনের লোহাগড় দূর্গে ট্র্যাকিং করতে যান। কিন্তু সেবার লোকজনের ভিড়ে সিয়া হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি।
গত ৬ জুন তাদের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য ইন্দোনেশিয়ার বালি যাওয়ার কথা ছিল। সঙ্গে আরো দুই বন্ধু ছিল বলে সিয়া বালি যেতে চাননি। তবে প্রকাশ্যে সেটা বলেনওনি। বালি যেতে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে মুম্বাইয়ের একটি রেস্টুরেন্টে নাশতা খেতে থামেন তারা। এক ফাঁকে সিয়া কেতনের ব্যাগ থেকে তার পাসপোর্টটি চুরি করে ছিঁড়ে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দেন। মুম্বাই এয়ারপোর্টে পৌঁছে কেতন দেখেন তার পাসপোর্ট নেই। ফলে তাদের বালি ট্রিপ বাতিল করতে হয়। বালি যেতে না পারার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ১৪ জুন তারা আবারও লোহাগড় দুর্গে যান। সেদিনও সিয়া কেতনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিজ্ঞ ট্র্যাকার কেতন ঝোপঝাড় ধরে পতন ঠেকান। সন্দেহ থেকে নিজেকে বাঁচাতে সিয়া ‘সাপ সাপ’ বলে চিৎকার করে কেতনকে জড়িয়ে ধরেন। সিয়া বলেন, সাপের হাত থেকে বাঁচাতেই তিনি কেতনকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কেতনেরও সন্দেহ হয়নি।
১৯ জুন ছিল সিয়ার ২০তম জন্মদিন। জন্মদিনকে সামনে রেখে ১৮ জুন আবার তারা লোহাগড় দুর্গে যান। একা একা খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়ে সিয়া এবার আর কোনো ঝুঁকি নেননি। ডেকে নেন তার প্রেমিক চেতন চৌধুরীকেও। তারা দুজন মিলে প্রথমে কেতনকে ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করেন। তারপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন ৪০০ ফুট গভীর খাদে।
ভেততে ভেতরে খুনের পরিকল্পনা করলেও ওপরে ওপরে সিয়া দারুণ প্রেমের অভিনয় চালিয়ে যান। তার ইনস্টাগ্রামজুড়ে ছিল হবু বরের প্রতি ভালোবাসার গদগদ প্রকাশ। বিয়ের প্রস্তাব, ফুল উপহার, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নাচ, ‘অফিশিয়ালি টেকেন’ লেখা ট্যাগ- সিয়ার ইনস্ট্রাগ্রাম অনুসরণ করলে কেউ বুঝতেই পারবেন না, তার মনে কী আছে।
ফেব্রুয়ারিতে বাগদানের ঠিক এক মাস পর, সিয়া ইনস্টাগ্রামের একটি পোস্টে মোমবাতি জ্বালানো কেকের ছবি শেয়ার করে ক্যাপশন দিয়েছিলেন, ‘আমার মন তার ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার এক মাস পূর্তি উদযাপন’, সেই পোস্টে তিনি কেতনকে ট্যাগও করেছিলেন। মে মাসের আরেকটি পোস্টে দেখা যায় কেতন সিয়াকে ফুল দিচ্ছেন, যার ক্যাপশনে সিয়া লিখেছিলেন, ‘পছন্দ হ্যায় তুমহে' (তোমাকে পছন্দ করি)’। এরপর তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার প্রকাশ দেখান। সিয়া কেতনের একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরি রিপোস্ট করেছিলেন, যেখানে তাকে (সিয়াকে) দেখানো হয়েছিল, যার ক্যাপশন ছিল ‘দ্যাট স্মাইল’ এবং সঙ্গে ছিল একটি হার্টের ইমোজি।
১৯ মে সিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় তার জন্মদিনের ক্ষণগণনার পোস্ট দেন, যেখানে সিয়া ও কেতনকে একটি রোমান্টিক গানের তালে নাচতে ও ঘুরতে দেখা যায়।
লোহাগড় দুর্গে কেতনের পরে যাওয়াকে প্রথমে দুর্ঘটনা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। সিয়া পুলিশ ও কেতনের পরিবারের সবাইকে বলেছিলেন, ছবি তুলতে গিয়ে কেতন পরে গেছেন। কিন্তু পুলিশ ও পরিবার দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারছিলেন না কিছুতেই। অনেকগুলো প্রশ্ন দুর্ঘটনাকে আড়াল করে সন্দেহকে সামনে আনে। বালিতে যাওয়ার পথে মূল্যবান সব কিছু রেখে শুধু কেতনের পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়া, বারবার তাদের লোহাগড় দুর্গে যাওয়া, কেতনের মতো অভিজ্ঞ ট্র্যাকারের ৪ দিনের মধ্যে দুইবার পরে যাওয়া—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিল পুলিশ। চার দিনের মধে দ্বিতীয়বার লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার কারণ হিসেবে সিয়া কেতনের পরিবারকে বুঝিয়েছিলেন, আগামী দিনগুলোতে বিয়ে ও ব্যবসার কাজে তাদের ব্যস্ততা বাড়বে তাই ১৯ জুন তার জন্মদিন উদযাপনের অংশ হিসেবে একটু নিরিবিলিতে সময় কাটাতেই তারা ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে যান। এই যুক্তি অবশ্য সন্তানহারা পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে পাারেনি। তারা আরো গভীরভাবে সন্দেহ করতে থাকেন।
সন্দেহ হলেও প্রমাণ ছাড়া কাউকে ধরতে পারছিল না পুলিশ, কোনো সিদ্ধান্তেও আসতে পারছিল না। একটি সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের সন্দেহকে নিশ্চিত করে। লোহাগড় দুর্গে সিয়া আর কেতন যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন ২০-৩০ ফুট পেছন থেকে শর্টস পরা এক যুবক তাদের অনুসরণ করছিলেন। সিয়া একবার পেছন ফিরে সে যুবককে দেখেনও। তখন সে যুবক চট করে বসে পড়েন, যাতে কেতন তাকে দেখতে না পান। সেই যুবক একটি হুডি পরেছিলেন, যাতে তার চেহারা দেখা না যায়। কিন্তু চেহারা আড়াল করতে পরা সে হুডিই খুনির চেহারা সামনে নিয়ে আসে।
৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমে ট্র্যাকিং ট্রেইলে কেউ হুডি পরে থাকবে কেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পুলিশ পৌঁছে যায় খুনির কাছে।
সন্দেহকে নিশ্চিত করতে পুলিশ সিয়া ও চেতনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল কল রেকর্ড অনুসন্ধান করে। তখনই পুলিশ বুঝতে পারে, ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়।’ গত নভেম্বরে এক ব্যাবসায়িক বৈঠকে পরিচয়ের পর থেকে সিয়া আর চেতন সম্পর্কে জড়িয়ে পরেন। তারপর থেকে গত সাত মাসে তারা ২ হাজার ৪টি টেলিফোন কলে ২৩৮ ঘণ্টা নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন। ২২ বছর বয়সী চেতন শুকনো ফলের ব্যবসা করতেন। পুনের একটি সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান সিয়াও একটি বেকারি চালাতেন। প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ ঘটনার ৫ দিন পর ২৩ জুন সিয়া ও চেতনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারের পর দুজনই পুলিশেরে কাছে তাদের পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
২৪ জুন পুনের একাট আদালত তাদের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে।
কেতন আগরওয়ালের বাবা বিশাল আগরওয়াল পুনের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি ও আবাসন ব্যবসায়ী। পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাকসেস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। পড়াশোনা শেষে বিদেশ থেকে ফিরে কেতনও পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন। কেতন ছিলেন সাকসেস গ্রুপের পরিচালক ও চিফ মার্কেটিং অফিসার। ২৬ বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বিশাল আগরওয়াল এ ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। তার একটাই আফসোস, বিয়ে করতে না চাইলে বললেই হতো। এভাবে কেতনকে মেরে ফেললো কেন?
শুধু কেতনের বাবা নয়, এ প্রশ্ন এখন ভারতের মানুষের মুখে মুখে। বাগদত্তা ও তার প্রেমিকের পরিকল্পনায় কেতন আগরওয়ালের মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে মানুষের বিশ্বাসের ভিত।