বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির সরকারি বাসভবনকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সূত্রের দাবি, ওই বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক বিক্ষুব্ধ সাংসদ বর্তমানে বৈঠক করছেন। একইসঙ্গে সেখানে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক আলোচনার পর্ব চলছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি এমন সময় সামনে এল, যখন রাজধানীতে বিরোধী 'ইন্ডি-শিবিরের' গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে কনস্টিটিউশন ক্লাবে। সেখানে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে এবং সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে দিল্লিতে একই সময়ে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের ছবি সামনে এসেছে।
সূত্রের দাবি, ৮ জুনের ওই বৈঠকের আগেই তৃণমূলের লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদরা আলাদা একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হন। এরপরই ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে গিয়ে একাংশ সাংসদ আবারও বৈঠকে বসেন বলে জানা যায়।
এর মধ্যে রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়। তাঁর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে দলীয় অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও মতবিরোধ আরো স্পষ্ট হয়েছে বলে ধারণা রাজনৈতিক মহলের।
সূত্রের আরো দাবি, ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়ির বৈঠকে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণ আলোচনার পর তিনি দুপুর প্রায় ২টার দিকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান বলে জানা গেছে। তবে এরপরও তৃণমূলের একাধিক বিক্ষুব্ধ সাংসদ ওই বাসভবনে অবস্থান করছেন।
জানা গেছে, ওই বৈঠকের আগে সাংসদদের আরেকটি পৃথক বৈঠকও হয়। সেখানে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখ উপস্থিত ছিলেন। পুরোনো ও নতুন- দুই ধরনের সাংসদের অংশগ্রহণ ছিল বলে দাবি করছে সূত্র।
সংখ্যা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। কোনো সূত্র বলছে, প্রায় ২০ জন সাংসদ এই বিক্ষুব্ধ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। আবার অন্য সূত্রের মতে, সংখ্যাটি ১২-এর কাছাকাছি। তবে প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ও অন্যান্য স্তরেও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই বিধানসভায় দলের পরিষদীয় গোষ্ঠীতে বিভাজনের অভিযোগ সামনে আসে। যেখানে অধিকাংশ বিধায়ক আলাদা অবস্থান নেন বলে দাবি করা হয়। ৮০ জনের মধ্যে ৬০ জন আলাদা করে দল গঠন করে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা এবং সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান, শিউলি সাহা, সাবিনা ইয়াসমিনকে উপ-বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্য থেকে শুরু হওয়া এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন দিল্লির রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। কলকাতা পৌরসভা ও অন্যান্য স্থানীয় স্তরেও অসন্তোষ ও অনুপস্থিতির ঘটনা ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, বিধানসভার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, সাংসদদের একসঙ্গে বসা স্বাভাবিক বিষয়। তিনি বলেন, তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে, এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তিনি আরো দাবি করেন, একাধিক সাংসদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে এবং পদত্যাগী সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের বক্তব্যের সঙ্গে তিনি সহমত।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যেমন বিদ্রোহী বিধায়করা নতুন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছিলেন, তেমনই একই ধরনের সমীকরণ দিল্লিতে লোকসভা ও রাজ্যসভায়ও তৈরি হতে পারে। এমন গুঞ্জন কয়েকদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে অবস্থান করলেও একই সময়ে এই ধরনের একাধিক বৈঠক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
সব মিলিয়ে দিল্লিতে একদিকে বিরোধী জোটের বৈঠক, অন্যদিকে ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিক্ষুব্ধ সাংসদদের উপস্থিতি- দুইয়ের মাঝে তৃণমূলের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।