একজন গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে নেচে মুগ্ধ করেছিলেন বিশ্বকে, অন্যজন একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে জায়গা করে নিয়েছেন কোটি দর্শকের হৃদয়ে। তবে দুজনের গল্পের সুর একই; বয়স যেখানে স্বপ্নের ‘ফুলস্টপ’ নয়।
১৯৯০ সালের বিশ্ব আসরে সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন রজার মিলা, আর ২০২৬ বিশ্বকাপে একই চিত্রনাট্যে গোটা পৃথিবীকে মাতিয়েছেন নতুন মুখ ভোজিনিয়া। পার্থক্য বলতে রজার মিলার গল্প ছিল গোলের, আর ভোজিনিয়ার প্রতিরোধের। বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার দুই ‘বুড়ো যোদ্ধা’র নাম তাই আজ উচ্চারিত হচ্ছে একসঙ্গেই।
১৯৯০ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ক্যামেরুনকে নিয়ে খুব আশা দেখেনি কেউ। বরং ৩৮ বছর বয়সী মিলাকে দলে ফেরানো নিয়ে ছিল বিস্তর সমালোচনা। অনেকেই বলেছিলেন, তার সময় তো শেষ। কিন্তু সেই ‘শেষ’ই হয়ে উঠেছিল দিক বদলানো এক নতুন শুরুর গল্প। আসরে চার গোল করে ক্যামেরুনকে নিয়ে যান কোয়ার্টার ফাইনালে। রোমানিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, কলম্বিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের দুই গোল আজও বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। প্রতিটি গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে তার নাচ যেন আমুদে উদযাপনের এক চিরন্তন ছবিই হয়ে আছে এখনো। চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও দেখা মেলে ৪২ বছর বয়সী মিলার। রাশিয়ার বিপক্ষে গোল করে নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙে দেন তিনি, হয়ে যান বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা। আজও অটুট সেই রেকর্ড।
ছত্রিশ বছর পর সেই আমেরিকার মাটি, গল্প একই। ভোজিনিয়া নাচেননি, তবে তিনি উড়েছেন এবং ঝাঁপিয়েছেন। একবার ডান দিকে, আরেকবার বাম দিকে। ফুটবলের অভিধানে গোলদাতা আর গোলরক্ষকের কাজ আলাদা। একজন উল্লাস সৃষ্টি করেন, অন্যজন থামিয়ে দেন প্রতিপক্ষের উৎসব।
কিন্তু রজার মিলা আর ভোজিনিয়ার গল্পে সেই পার্থক্য মুছে যায় ইচ্ছাশক্তির কাছে। মিলা বিশ্বকাপে এসেছিলেন অভিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে। ১৯৮২ বিশ্বকাপও খেলেছিলেন তিনি। তবে বিশ্বকাপে এটাই ভোজিনিয়ার প্রথম উপস্থিতি। ৪০ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছেন তিনি।
বেশির ভাগ ফুটবলারের ক্যারিয়ার যখন শেষ হয়ে যায়, তখনই ‘ব্লু-শার্ক’দের এই অভিভাবক নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে স্কোরলাইন যদিও কেপ ভার্দের হারের কথাই বলেছে, কিন্তু বিশ্বকাপ বলেছে ভোজিনিয়ার গল্প।
বিশ্ব মানচিত্রে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। জনসংখ্যাও সামান্য। ফুটবলের মহাশক্তি হওয়ার মতো অবকাঠামোও নেই তাদের। কিন্তু গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ৪০ বছরের মানুষটিই যেন পুরো দেশের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিলেন। যার প্রতিটি সেভ কেপ ভার্দের প্রতিটি শিশুকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
ফুটবলে একদিন যে খেলোয়াড়কে অপরিহার্য মনে হয়, কয়েক দিন পরে তারই গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘বুড়ো’র তকমা। কিন্তু রজার মিলা আর ভোজিনিয়া সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, শরীরের বয়স বাড়তে পারে, কিন্তু স্বপ্নের বয়স নয়।
চার বছর পর পর বিশ্বকাপে নতুন নায়কের জন্ম হয়। কখনো সে ১৮ বছরের বিস্ময়বালক, আবার কখনো ৪০ বছরের এক গোলরক্ষক। এই বৈচিত্র্যই বিশ্বকাপকে আলাদা করেছে অন্য সব টুর্নামেন্ট থেকে। কারণ এখানে শুধু ট্রফির লড়াই হয় না, লেখা হয় মানুষের গল্প।
রজার মিলা আর ভোজিনিয়া সেই একই গল্পের বইয়ের ভিন্ন দুটি অধ্যায়; যেখানে আছে বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বৈশ্বিক তারকা বনে যাওয়ার সগৌরব ঘোষণা!




