১৫ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশী রীতিমত ঝড় তুলে দিয়েছেন ক্রিকেট বিশ্বে। আইপিএল’এ ঝড় তুলেছিলেন ব্যাট হাতে। এখন অবশ্য উঠেছে বিতের্কর ঝড়। আইপিএল’এ ২৩৭ স্ট্রাইক রেটে ৭৭৬ রান করে বৈভব নির্বাচকদের বাধ্য করেছিলেন তাকে দলে ডাকতে। ভারতীয় দলের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সফরও করেছন। কিন্তু তাকে ছাড়াই তিনটি ম্যাচে খেলে ফেলেছে ভারত।
আয়াল্যান্ডের সঙ্গে টি-২০ সিরিজে লজ্জাজনকভাবে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচটি ভেসে গেছে বৃষ্টিতে। তিনটি ম্যাচ ড্রেসিং রুমে বসে দেখেছেন সূর্যবংশী। শনিবার (৪ জুলাই) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ ম্যাচের টি-২০ সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচের আগে সবার প্রশ্ন, সবার কৌতুহল, কবে মাঠে নামছেন বৈভব সূর্যবংশী? এ প্রশ্নে রীতিমত বিভক্ত ক্রিকেট বিশ্ব। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট অবশ্য টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ী টপ অর্ডার অভিষেক শর্মা, সঞ্জু স্যামসন আর ইশাণ কিষাণের ওপর আস্থা রাখছেন।
ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডাসকেট বলে দিয়েছেন, ‘সে (বৈভব) আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার জন্য তৈরি। তবে তাকেও একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।’ তবে অনেকে প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সূর্যবংশীর মত প্রতিভাকে বসিয়ে রাখার বিপক্ষে। ভারতের কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার তো আগেই বলেছেন, ’আয়ারল্যান্ড সিরিজেই তার দলে থাকা উচিত ছিল। আশা করি ইংল্যান্ড সিরিজে সে দলে থাকবে।’
তবে গাভাস্কারের আশা পূরণ হয়নি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম ম্যাচে বৈভবকে ছাড়াই খেলতে নেমেছিল ভারত। ভারতের ওপেনার অভিষেক শর্মা সর্বশেষ তিন ম্যাচে ৪৯ ও ৫৯ রানের দুটি ইনিংস খেলে নিজের অবস্থান শক্ত রাখতে পারলেও বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক সঞ্জু স্যামসনের ব্যাটে রানখরা। সূর্যবংশী যখন তার ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলছেন, তখন শেষ তিন ইনিংসে স্যামসন ৫, ০ ও ১ রান করে ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টকেই বিপাকে ফেলে দিয়েছেন। সাবেক ক্রিকেটার ইরফান পাঠান তো স্যামসনের ব্যাটিং টেকনিক নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
টি-২০ বিশ্বকাপে পরপর তিনটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে নায়ক বনে যাওয়া স্যামসন মাত্র তিন মাসের মধ্যে উল্টো পিঠটাও দেখে ফেলছেন। তবে মূল প্রশ্ন হলো, সূর্যবংশী শনিবারের মাচে দলে থাকবে কি থাকবেন না? সুনীল গাভাস্কার তো আগেই বলেছেন, এখন ভারতের রবি শাস্ত্রী, ইংল্যান্ডের মাইকেল ভন, আলিস্টার কুক, দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাবি ডি ভিলিয়ার্সের মত কিংবদন্তিরা মনে করেন, সূর্যবংশীর মত প্রতিভাকে বসিয়ে রাখা উচিত নয়।
তবে ভারতের সাবেক ক্রিকেটার চেতেশ্বর পুজারা, সাবা করিমরা মনে করেন, সূর্যবংশী অবশ্যই সুযোগ পাবেন, তবে পরীক্ষিত পারফরমারদের যেন বাদ দেওয়া না হয়। সূর্যবংশীকে দলে সুযোগ পেতে আর সবার মত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাটের এ ধারণার সঙ্গে একমত নন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি অ্যাবি ডি ভিলিয়ার্স।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি বলেছেন, ‘তাকে (সূর্যবংশী) কখন মাঠে নামানো হবে? আমি ভেবেছিলাম আয়ারল্যান্ড সিরিজটিই তার জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার এবং তার আবহ বোঝার একদম উপযুক্ত সুযোগ ছিল। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে তিনি কোনো সুযোগই পেলেন না। রায়ান টেন ডেসকাটের সেই বক্তব্যের সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করছি যেখানে তিনি বলেছেন—অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতো সূর্যবংশীকেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে। আইপিএলে তিনি যেভাবে খেলেছেন, এরপর তাকে সরাসরি কঠিন পরিস্থিতিতে নামিয়ে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময় ছিল, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের মতো একটি নিচু র্যাংকের দলের বিরুদ্ধে, যাতে তিনি কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারতেন।’
এক পডকাস্টে ইংল্যান্ডের দুই সাবেক মাইকেল ভন আর আলিস্টার কুকক রীতিমত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ও প্রধান নির্বাচক অজিত আগারকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। পডকাস্টে মাইকেল ভন বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই বিসিআই ও প্রধান নির্বাচককে প্রশ্ন করা উচিত কেন সূর্যবংশীকে আয়ারল্যান্ডে খেলায়নি।’ জবাবে আলিস্টার কুক বলেন, ‘কাল (শনিবার) আমি সেখানে যাচ্ছি। একজন ভক্ত হিসেবে আমি চাই সে (বৈভব) যেন খেলে।’
সূর্যবংশীর প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ নেই ভারতের সাবেক ক্রিকেটার সাবা করিম ও চেতেশ্বর পুজারারও। তবে পুজারা চান না সূর্যবংশীকে সুযোগ দিতে গিয়ে পরীক্ষিত কাউকে যেন বাদ দেওয়া না হয়, ‘আমি মনে করি ভারতের উচিত সঞ্জু স্যামসনকে দলে ধরে রাখা। আমার মনে হয় না তার কোনো চাপ অনুভব করা উচিত। টি-২০ বিশ্বকাপে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন এবং তার যে ধরনের প্রতিভা রয়েছে, তাতে তার মূল একাদশে থাকা উচিত।
সঞ্জু স্যামসনকে দল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে খুব বেশি শোরগোল হওয়া উচিত নয়। তিনি একজন মানসম্পন্ন খেলোয়াড় এবং তার আরো দীর্ঘ সময় সুযোগ পাওয়া উচিত। সঞ্জুর শুধু স্বাভাবিকভাবে ব্যাটিং করা দরকার এবং খুব বেশি চিন্তা না করা উচিত।’ বৈভব সম্পর্কে পুজারার মূল্যায়ন হলো, ‘যদি বৈভবের খেলার প্রয়োজন হয়, তবে তার খেলা উচিত। কিন্তু কাউকে দল থেকে বাদ দিয়ে নয়, বরং কাউকে বিশ্রাম দিয়ে। আপনি যদি তাকে একটি সুযোগ দিতে চান, তবে তা ঠিক আছে। কিন্তু ভারতের শীর্ষ তিন খেলোয়াড়ের কাউকেই আপনার বাদ দেওয়া উচিত নয়—তিনি সঞ্জু, অভিষেক বা ঈশান কিষাণ যেই হোন না কেন। তবে এটিও সত্যি যে, বৈভব একটি সুযোগ পাওয়ার যোগ্য এবং তার সুযোগ আসবে।’
বৈভব সূর্যবংশী সুযোগ পাবেন কি পাবেন না, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে কালকের ম্যাচ পর্যন্ত। তবে সুযোগ পেলেই তিনি শচিনকে হটিয়ে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ আন্তজক ক্রিকেটার বনে যাবেন।





