• ই-পেপার

পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা

আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং আমাদের চিন্তার সংকট

রাশেদুল হাসান
আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং আমাদের চিন্তার সংকট
আবুল কাসেম ফজলুল হক। জন্ম: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ মৃত্যু: ৫ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল তেমনি ছিল একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আমরা যখন পেছনে তাকাই তখন এমন কয়েকজন মানুষকে দেখতে পাই। যারা কোনো দলীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ না থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এক বাতিঘর শিক্ষাবিদ, সমাজ-বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি শুধু একজন প্রথিতযশা শিক্ষকই নন, আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রিক সংকটে নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক।

১৯৪০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে সত্তরের দশকের শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মগজে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছেন। কিন্তু তার শিক্ষকতা ক্লাসরুমের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মনে করেন, প্রকৃত শিক্ষার মূল কাজ হলো মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবৃত্তি তৈরি করা।

আরও পড়ুন: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

শিক্ষা ব্যবস্থা যখন সনদসর্বস্ব বা চাকরি পাওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের শিক্ষাদর্শন আমাদের পথ দেখাতে পারে। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আত্মবিস্মৃত জাতি কখনো উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না’। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন, যা শিক্ষার্থীকে সংবেদনশীল, যুক্তিবাদী এবং সর্বোপরি একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার মূল ভিত্তি হলো ইতিহাসচেতনা এবং সমাজ-বাস্তবতা। তিনি সমাজকে কোনো আরোপিত বা ধার করা চশমা দিয়ে দেখেননি। বাংলার মাটি ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’, ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’, ‘মানুষ ও তার পরিবেশ’, ‘সাহিত্যজিজ্ঞাসা : সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’, ‘বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। 

এ ছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের সমাজ ও রাজনীতির স্বরূপ বুঝতে অপরিহার্য তার বইগুলো।

সত্তর ও আশির দশকে তার সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ পত্রিকা এ দেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মনন গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। তার লেখায় সমাজদর্শনের গভীর প্রভাব থাকলেও তিনি কখনো কোনো অন্ধ মতবাদের অনুসারী হননি। প্রগতিশীলতার নামে যখন কোনো কৃত্রিম চিন্তাভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট বিশ্বাস করেন, আমাদের মুক্তির পথ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হবে।

ভাষা আন্দোলনের চেতনা আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তাজগতকে গভীরভাবে চালিত করেছে। তিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের পক্ষে সবসময় সোচ্চার। তার মতে, মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোনো জাতি তার সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে পারে না। উচ্চ আদালতে ও দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার উপেক্ষিত রূপ দেখে তিনি বিভিন্ন সময়ে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন: পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা

জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করেন, তবে তা কোনো উগ্র রূপ নয়। তিনি এমন এক রাষ্ট্রচিন্তার সমর্থক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সমাজতন্ত্রের’ এক চমৎকার ভারসাম্য প্রত্যাশা করেন, যেখানে পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর শোষণ থাকবে না, আবার স্বৈরতন্ত্রের জাঁতাকলেও মানুষের বাক-স্বাধীনতা পিষ্ট হবে না।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, নৈতিক সংকটে সবসময় বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। ২০১৫ সালে এক মর্মান্তিক উগ্রবাদী হামলায় তিনি তার একমাত্র সন্তান, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হারান। সেই চরম শোকের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তিনি যে অসীম ধৈর্য, সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি কোনো অন্ধ প্রতিহিংসার কথা না বলে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, আমি সুবুদ্ধির উদয় চাই।’ তিনি সমাজের মূল ব্যাধিটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন সেটি হলো সহনশীলতার অভাব ও চিন্তার অন্ধকার।

আরও পড়ুন: অধ্যাপক ফজলুল হকের কাজ-স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে : সংস্কৃতিমন্ত্রী

আমরা এখন এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল পার করছি। একদিকে চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্যদিকে নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, দুর্নীতি ও মেধার অপচয়। সমাজ যখন চরমভাবে মেরুকৃত হয় এ পক্ষ, না হয় ওই পক্ষ। এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং স্বাধীন চিন্তকের অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করি।

তিনি ক্ষমতার মোহ থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছেন। কোনো সরকার বা দলের পদলেহন না করে, সবসময় সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস দেখিয়েছেন। আজ যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে স্তাবকতার জয়জয়কার, তখন এ ঋষিতুল্য প্রবীণ চিন্তাবিদ আমাদের মনে করিয়ে দেন বুদ্ধিজীবীর আসল কাজ কী। বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করা নয় বরং ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য উচ্চারণ করা।

রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর ও নির্মোহ। তিনি মনে করতেন, ১৯৭৩ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করা যায়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচির অভাব এবং আন্দোলনের নেতিবাচকতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে বাধা দিচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তার মতে, ‘আদর্শভিত্তিক রাজনীতি এবং নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাড়া সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়’।

বিশ্ব রাজনীতি ও ন্যায্যতার প্রশ্নেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছিলেন যে বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও মানবিক দিক থেকে একটুও অগ্রসর হয়নি। তিনি সারাজীবন বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্য এক সম্মানজনক বাঁচার অধিকারের স্বপ্ন দেখেছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক শাণিত সমাজ-বিশ্লেষক, নির্ভীক প্রাবন্ধিক এবং মুক্তবুদ্ধির আজীবন পাহারাদার। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই তার মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটি সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখানো এ মনীষী আমাদের আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রিক সংকটের এক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন।

সাহিত্য ও চিন্তার জগতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৬ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী আবদুস সাদেক

ফরিদুর রেজা সাগর

অনলাইন ডেস্ক
শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী আবদুস সাদেক

আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে বইমেলায় বের হতো একুশের সংকলন। এসব সংকলন বের করত মূলত স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা। নানান রকম সংকলন। সংকলনে বিভিন্ন ধরনের লেখা থাকত। দেশপ্রেম, একুশ, স্বাধীনতা এরকম বিষয় নিয়েই বেশি লেখা থাকত। এসব সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি সকালবেলা আমরা বিভিন্ন জায়গায় বিলি করতে চেষ্টা করতাম। এই সংকলনের নির্দিষ্ট কোনো দাম ছিল না। যে যা পারে সেটাই দিতেন। সংকলনগুলো প্রকাশের জন্য কিছু টাকার প্রয়োজন হতো। আর এই টাকা সংগ্রহের জন্য আমরা বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপনের জন্য যেতাম। তখন এসব সংকলন বা একুশের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো একটা বরাদ্দ রাখত।

বিজ্ঞাপন সংগ্রহের সূত্র ধরেই আমার সঙ্গে জনাব আবদুস সাদেকের পরিচয়। আমাদের স্কুলবন্ধু হাবিবুর রহমান বাবলুর মামা হতেন। তিনি তখন একটা বড় কোম্পানির প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিস ছিল বগুড়ায়। গুলিস্তানে ছিল তাদের সাব অফিস। সাদেক সাহেব বসতেন গুলিস্তান অফিসে। আমি বগুড়াতেও গিয়েছি। ঢাকার অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে প্রথম আলাপ হলো। দেখেই আমি তাকে চিনে ফেললাম। কারণ পত্রিকায় মাঝেমধ্যে তার ছবি দেখতাম। তিনি যে চেয়ারে বসতেন ঠিক তার পেছনেই একটি ছবি ছিল তিনি হকিস্টিক হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি বুঝতে পারলাম বাবলুর এই মামা কোনো সাধারণ একজন মানুষ নন।

তিনি যদিও এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন সঙ্গে তিনি আমাদের হকির জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়। হকি দলের অধিনায়কও ছিলেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে সাদেক মামার মতো একজন সজ্জন ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের জানাশোনা ছিল। তিনি আমাদের এই একুশের সংকলনে পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করতেন। আবার কখনো কখনো ব্যক্তিগতভাবেও তার সাহায্য পেয়েছি। তিনি যেমন খেলোয়াড় ছিলেন তেমনি ছিলেন শিল্প-সাহিত্য অনুরাগী।

সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ছিল বলেই আমরা যখনই তার কাছে যেতাম তিনি আমাদের নিরাশ করতেন না। বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম মামার কাছে। মাঝেমধ্যে তিনি আমাদের ‘খাবার দাবার’ দোকানে আসতেন। আমাকে স্নেহ করতেন। তার সঙ্গে তখন আসতেন প্রতাপ শংকর হাজরা, রফিকুল ইসলাম কামালসহ আরও অনেকেই। আমরা জুনিয়র হওয়ার সুবাদে আদর করতেন। তারা আমাদের খেলাধুলার প্রতি জোর দিতে বলতেন। খেলাধুলা করলে শরীর ঠিক থাকে সেটাও বলতেন। সাদেক মামা লেখাপড়া করতেন আরমানিটোলা স্কুলে। তারপর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। আমরা যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলে মনির হোসেন নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। মনির স্যারের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আসতেন বিখ্যাত রেফারি ননী বসাক। তিনি প্রখ্যাত চিত্রনায়িকা শবনমের বাবা। ননী বসাক এবং মনির হোসেন স্যার খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে বাবলুর সম্পর্কটাই আমার সঙ্গে গড়ে উঠল।

আমিও আবদুস সাদেক সাহেবকে মামা ডাকা শুরু করলাম। নানান সময়ে নানান কাজে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। এর কারণ ছিল আমাদের খাবার দাবার পিঠাঘর যেহেতু গুলিস্তানে ছিল সেই সুবাদে সাদেক মামার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো আমার। খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন তিনি। দেখা হলেই বলতেন স্বাস্থ্যটা ঠিক রাখো খেলাধুলা কর। বাংলাদেশে হকি স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে গুলিস্তান এলাকাতে। হকি স্টেডিয়াম কিংবা হকির যে উন্নয়ন হয়েছিল তার কৃতিত্বের দাবিদারদের অন্যতম ছিলেন সাদেক মামা অর্থাৎ আবদুস সাদেক। ২০ জুন তার চলে যাওয়ার সংবাদে মনটা ভীষণ ভারী হয়ে গেল। চোখ ছলছল করে উঠল আর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পুরোনো স্মৃতি। মামার অফিসকক্ষ, হকিস্টিক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছবি। সাদেক মামা আপনার এই চলে যাওয়ায় আমরা ব্যথিত। দেশ একজন দক্ষ সংগঠক ক্রীড়াব্যক্তিত্বকে হারাল। আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব

ভিক্টর হুগোর ‘ওডস এট বেলাডেস’ উদযাপনে ঢাকায় বিশেষ আয়োজন

অনলাইন ডেস্ক
ভিক্টর হুগোর ‘ওডস এট বেলাডেস’ উদযাপনে ঢাকায় বিশেষ আয়োজন
সংগৃহীত ছবি

ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম কবি ও ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগোর ‘ওডস এট বেলাডেস’ কাব্যগ্রন্থের দুইশ বছর উদযাপন উপলক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশেষ কবিতা ও সংগীত আলেখ্য ‘বেলাড ফর লিওপলডাইন হুগো : ভিক্টর হুগো থ্রু বেঙ্গলি মিস্টিক্স’। 

আগামী মঙ্গলবার (২৩ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডিতে অবস্থিত ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলিয়ান্স ফ্রসেসের নুভেল ভ্যাগ মিলনায়তনে এটি অনুষ্ঠিত হবে।

বৃটেনে দক্ষিণ এশীয় ধ্রুপদী শিল্পের শীর্ষ সংস্থা সৌধের প্রযোজনায় অনুষ্ঠিত এই গীতি-আলেখ্য গ্রন্থনা ও পরিচালনায় আছেন কবি টি এম কায়সার। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দোতারা বাদক সাব্বির শাহ, ইতালিয়ান জ্যাজশিল্পী মার্থা, চিত্রশিল্পী তারেক আমিন, সরোদ বাদক রুম্মান। 

ভিক্টর হুগো থেকে পাঠ করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনাসিব কামাল। আলোক প্রক্ষেপণ, কবিতা ও সঙ্গীতের দৃশ্য-ভাষ্য রচনায় আছেন আলোকচিত্রী পাবলো খালেদ। 

সৌধ পরিচালক টি এম কায়সার জানান, বিশ্বের ধ্রুপদী শিল্পের প্রচার ও নতুন নতুন ভাষ্য নির্মাণে সৌধ গত ১৫ বছর থেকে বৃটেনের মূলধারার আর্ট-প্লাটফর্মে ভূমিকা রেখে চলেছে। আমরা কাফকার সাড়ম্বর সেন্টিনারি যেমন উদযাপন করেছি কাফকার সাহিত্যকর্মের নতুন প্রেক্ষিত অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে, ঠিক তেমনি এ বছর হুগো, গিন্সবার্গ বা সুকান্তকেও নতুন আলোয় দেখতে চাই অভিনব সব পরিবেশনা দিয়ে। 

তিনি আরো জানান, বৃটেনের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা ইউরোপ ভারত বাংলাদেশ বা যুক্তরাষ্ট্রেও আমাদের বিচিত্র শিল্প-উপস্থাপনা মঞ্চস্থ করেছি। এই প্রক্রিয়া আরো নিয়মিত রাখতে চাই এবং আরো বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে চাই।

নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন আজ

অনলাইন ডেস্ক
নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন আজ

উপমহাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত ও পথিকৃৎ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন আজ। ডাকনাম ‘নূরী’ নামে পরিচিত এই প্রখ্যাত সম্পাদক নারী সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় নারীদের যুক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

তিনি উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ ছয় দশক পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন।

নূরজাহান
এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নূরজাহান বেগম

নূরজাহান বেগম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলি গ্রামে। তার পারিবারিক নিবাস ছিল পাইকারদী গ্রামে, যা মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলে তার পরিবার চালিতাতলিতে বসতি স্থাপন করে। তার পিতা মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং বিখ্যাত ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী।

শৈশবে ১৯২৯ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। সেখানে ১১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটে ‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তরে বসবাস শুরু করেন। কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন।

১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই নারীদের জন্য প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ প্রকাশিত হয়, তখন তিনি বিএ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। শুরুতে পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল। পরে নূরজাহান বেগম পত্রিকাটির সম্পাদনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় এর নেতৃত্ব দেন।

নূরজাহান
২০০৭ সালে ‘নূরজাহান জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে নূরজাহান বেগম

‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নারীদের লেখা, ছবি ও মতামত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেন। নারীদের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতিতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়।

তিনি সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫০ সালে তিনি বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকার শরৎ গুপ্ত স্ট্রিটে দীর্ঘ সময় বসবাস করেন এবং সেখান থেকেই ‘বেগম’ পত্রিকার কাজ পরিচালনা করেন। নারীদের লেখালেখিতে উৎসাহিত করতে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেখা ও ছবি সংগ্রহ করতেন বলেও জানা যায়।

নূরজাহান
নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম

নারী জাগরণ, সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৭ সালের রোকেয়া পদকসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সামাজিক সম্মাননা।

২০১৬ সালের ২৩ মে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জন্মদিনে নারী সাংবাদিকতার এই অগ্রদূতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

নূরজাহান
লেখক নূরজাহান বেগম


ছবি : সালমা আহমেদ
শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়