বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল তেমনি ছিল একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আমরা যখন পেছনে তাকাই তখন এমন কয়েকজন মানুষকে দেখতে পাই। যারা কোনো দলীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ না থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এক বাতিঘর শিক্ষাবিদ, সমাজ-বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি শুধু একজন প্রথিতযশা শিক্ষকই নন, আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রিক সংকটে নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক।
১৯৪০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে সত্তরের দশকের শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশক তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মগজে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছেন। কিন্তু তার শিক্ষকতা ক্লাসরুমের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মনে করেন, প্রকৃত শিক্ষার মূল কাজ হলো মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবৃত্তি তৈরি করা।
আরও পড়ুন: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই
শিক্ষা ব্যবস্থা যখন সনদসর্বস্ব বা চাকরি পাওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের শিক্ষাদর্শন আমাদের পথ দেখাতে পারে। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আত্মবিস্মৃত জাতি কখনো উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না’। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন, যা শিক্ষার্থীকে সংবেদনশীল, যুক্তিবাদী এবং সর্বোপরি একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার মূল ভিত্তি হলো ইতিহাসচেতনা এবং সমাজ-বাস্তবতা। তিনি সমাজকে কোনো আরোপিত বা ধার করা চশমা দিয়ে দেখেননি। বাংলার মাটি ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’, ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’, ‘মানুষ ও তার পরিবেশ’, ‘সাহিত্যজিজ্ঞাসা : সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’, ‘বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’।
এ ছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশের সমাজ ও রাজনীতির স্বরূপ বুঝতে অপরিহার্য তার বইগুলো।
সত্তর ও আশির দশকে তার সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ পত্রিকা এ দেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মনন গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। তার লেখায় সমাজদর্শনের গভীর প্রভাব থাকলেও তিনি কখনো কোনো অন্ধ মতবাদের অনুসারী হননি। প্রগতিশীলতার নামে যখন কোনো কৃত্রিম চিন্তাভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট বিশ্বাস করেন, আমাদের মুক্তির পথ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হবে।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তাজগতকে গভীরভাবে চালিত করেছে। তিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের পক্ষে সবসময় সোচ্চার। তার মতে, মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোনো জাতি তার সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে পারে না। উচ্চ আদালতে ও দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষার উপেক্ষিত রূপ দেখে তিনি বিভিন্ন সময়ে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন: পুতুলে প্রাণ সঞ্চারে আজীবন সাধনা
জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করেন, তবে তা কোনো উগ্র রূপ নয়। তিনি এমন এক রাষ্ট্রচিন্তার সমর্থক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সমাজতন্ত্রের’ এক চমৎকার ভারসাম্য প্রত্যাশা করেন, যেখানে পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর শোষণ থাকবে না, আবার স্বৈরতন্ত্রের জাঁতাকলেও মানুষের বাক-স্বাধীনতা পিষ্ট হবে না।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, নৈতিক সংকটে সবসময় বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। ২০১৫ সালে এক মর্মান্তিক উগ্রবাদী হামলায় তিনি তার একমাত্র সন্তান, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হারান। সেই চরম শোকের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তিনি যে অসীম ধৈর্য, সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি কোনো অন্ধ প্রতিহিংসার কথা না বলে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, আমি সুবুদ্ধির উদয় চাই।’ তিনি সমাজের মূল ব্যাধিটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন সেটি হলো সহনশীলতার অভাব ও চিন্তার অন্ধকার।
আরও পড়ুন: অধ্যাপক ফজলুল হকের কাজ-স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে : সংস্কৃতিমন্ত্রী
আমরা এখন এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল পার করছি। একদিকে চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্যদিকে নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, দুর্নীতি ও মেধার অপচয়। সমাজ যখন চরমভাবে মেরুকৃত হয় এ পক্ষ, না হয় ওই পক্ষ। এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং স্বাধীন চিন্তকের অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করি।
তিনি ক্ষমতার মোহ থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছেন। কোনো সরকার বা দলের পদলেহন না করে, সবসময় সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস দেখিয়েছেন। আজ যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে স্তাবকতার জয়জয়কার, তখন এ ঋষিতুল্য প্রবীণ চিন্তাবিদ আমাদের মনে করিয়ে দেন বুদ্ধিজীবীর আসল কাজ কী। বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করা নয় বরং ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য উচ্চারণ করা।
রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর ও নির্মোহ। তিনি মনে করতেন, ১৯৭৩ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করা যায়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচির অভাব এবং আন্দোলনের নেতিবাচকতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে বাধা দিচ্ছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তার মতে, ‘আদর্শভিত্তিক রাজনীতি এবং নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাড়া সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়’।
বিশ্ব রাজনীতি ও ন্যায্যতার প্রশ্নেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছিলেন যে বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও মানবিক দিক থেকে একটুও অগ্রসর হয়নি। তিনি সারাজীবন বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্য এক সম্মানজনক বাঁচার অধিকারের স্বপ্ন দেখেছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক শাণিত সমাজ-বিশ্লেষক, নির্ভীক প্রাবন্ধিক এবং মুক্তবুদ্ধির আজীবন পাহারাদার। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই তার মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটি সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে সমাজকে ক্রমাগত পথ দেখানো এ মনীষী আমাদের আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রিক সংকটের এক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন।
সাহিত্য ও চিন্তার জগতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৬ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক







