এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছে না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২ জুলাই বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা হলো উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তাই এই শিক্ষা কর্মসংস্থান, মেধার বিকাশ এবং দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এই বিপুল পরিমাণ ড্রপ আউট দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই শুধু নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষার এই অধঃপতনের ধারা গত বছরও ছিল। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে অনীহা বাড়ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি।
শুধু উচ্চশিক্ষায় নয়, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক সব পর্যায়ে ড্রপ আউট বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়মিত যায় না। দেশের অধিকাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের সংকটের কারণে ধুঁকছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ শূন্য, যা মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ। কিছু বিদ্যালয়ে এখনো প্রধান শিক্ষকের পদই সৃষ্টি হয়নি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা। একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। একটি দেশ যদি শিক্ষায় বিশ্বমান অর্জন করতে না পারে তাহলে সেই দেশের উন্নয়ন অসম্ভব, অলীক কল্পনা।
বর্তমান সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন অঙ্গীকার করেছে। বিএনপি সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে তারা। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বেশি জোর পাবে। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘নিউক্লিয়াস’ (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি।’ কিন্তু কেবল অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিক্ষার এই অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে আগে আমাদের সমস্যার উৎসে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা কেন অসুস্থ, জরাজীর্ণ হয়ে গেছে তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। গত দুই বছরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের চেয়ে অর্থ লাভের আগ্রহ বেড়েছে অনেক বেশি। কেন এমন প্রবণতা?
আমাদের শিক্ষার আজকের বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণ ইউনূস সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে এ দেশের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নন, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল। স্বাভাবিক কারণেই ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গণ অভ্যুত্থানের পর পৃথিবীর সব দেশেই এমনটা হয়ে থাকে। গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হয় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো। মিসরে আরব বসন্তের পর এমনটা হয়েছিল, তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার গণ অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল তার নাম, ব্যাক টু ক্লাস। শ্রীলঙ্কার অন্তর্র্বর্তী সরকারপ্রধান প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, শিক্ষার্থীরা যদি ক্লাসে না ফেরে তাহলে শ্রীলঙ্কা ধ্বংস হয়ে যাবে। একই ঘটনা ঘটেছিল নেপালে। কিন্তু বাংলাদেশে ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পর ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। ইউনূস ক্ষমতা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ফিরিয়ে আনলেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের বানালেন উপদেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের বদলে শুরু হলো মব সন্ত্রাসের প্রাথমিক পাঠ। ইউনূস সরকারের আমলে সারা দেশে যে মব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল তার আঁতুড়ঘর ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে সচিবালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস এমনকি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শুরু করে চাঁদাবাজি, নানারকম বাণিজ্য। এই শিক্ষার্থীরা যেন হঠাৎ ধনী হওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজে পান। কেউ শুরু করেন টেন্ডার বাণিজ্য, কেউ আবার মামলা বাণিজ্যে মনোযোগী হন। ক্লাসের বদলে তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন সচিবালয়ে কিংবা কোনো অফিসে। ইউনূস সেই সময় ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তিনি যা বলেছেন, দেশের মানুষ সেটাই বিশ্বাস করেছে। শিক্ষার্থীদের তখনকার নেতারাই তাকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছেন। কাজেই শিক্ষার্থীদের তার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু ইউনূস একবারও শিক্ষার্থীদের বলেননি, অনেক হয়েছে, এবার ক্লাসে ফিরে যাও। বরং অটো পাসের জন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন সচিবালয় ঘেরাও করল, তখন ইউনূস তাদের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিলেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ধ্বংসের এটি একটা টার্নিং পয়েন্ট।
ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় ‘মবোৎসব’। এর থেকে রেহাই পাননি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাগুরুরাও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ’, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারপর লাঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের ওপরও চালানো হয়েছে নিপীড়ন।
এভাবেই দেড় বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের উৎসব চলেছে দেশজুড়ে। ড. ইউনূস তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এরা এখন বইয়ের পাতার চেয়ে টাকা বেশি পছন্দ করেন। রাতারাতি এরা বাড়ি, গাড়ি এবং অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখন মনে করেন, ক্লাসরুমে সময় নষ্টের চেয়ে রাজনৈতিক দলে সময় দেওয়া বেশি লাভজনক। অনেকেই মনে করেন, সেমিস্টারের জন্য প্রস্তুতির চেয়ে তদবির বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই উচ্চশিক্ষা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। শিক্ষকদের একটি অংশ দলবাজি আর বিভিন্ন পদ দখলের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। অন্য অংশ হয় পলাতক, না হয় মবের ভয়ে নীরব। উচ্চশিক্ষার যদি এই হাল হয় তাহলে নিচের শিক্ষার অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। গত দুই বছরে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার। এ কারণেই শিক্ষাকে বাঁচানো এখন এই সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাকে বাঁচাতে কেবল বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মজবুত করতে হবে। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা এবং সম্মানের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেটা করতে হবে খুব দ্রুত। শিক্ষাকে বাঁচাতেই হবে। কারণ, শিক্ষা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না।
লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক
ইমেইল : [email protected]



