কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্র পড়তে পড়তে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে। খবরগুলো আলাদা, চরিত্রগুলোও আলাদা। কোথাও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, কোথাও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা, কোথাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটির স্বাধীনতার আড়াই শতক উদ্যাপন। প্রথম দেখায় এগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব কটির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি শব্দ, বিশ্বাস এবং স্মৃতি। বিশ্বাস হারালে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। স্মৃতি হারালে মানুষ দুর্বল হয়।
রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। তাই রাষ্ট্রের সংকট আর মানুষের সংকট কখনো পুরোপুরি আলাদা হয় না। যে সমাজ নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে একই ভুল বারবার করে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে ভুলে যায়, সে একদিন জনগণকেও ভুলে যায়। আর যে মানুষ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার উচ্চতা যতই হোক, ভিত ততটা শক্ত থাকে না।
এই চারটি বিষয়-বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াই শতক এবং ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন-আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়।
১. গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট ক্ষমতার নয়, আস্থার
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন বিচার, সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন একসঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি ইতিবাচক। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন থাকে না, সেখানে উত্তরও জন্মায় না।
কিন্তু একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজি আইনে, কমিশনে, কিংবা নতুন কোনো কাঠামোয়। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, পারস্পরিক আস্থা।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংসদ ভবন নয়, সংবিধানের বইও নয়; বরং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বৈধতাকে স্বীকার করার সংস্কৃতি। যে মুহূর্তে একটি দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে শুধু তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিনিধি, আর অন্য সবাই রাষ্ট্রের সমস্যা-সেই মুহূর্ত থেকেই গণতন্ত্রের ভিতরে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হতে শুরু করে।
আমাদের রাজনীতির একটি মজার বৈপরীত্য আছে। ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই সংলাপকে সময়ের অপচয় মনে করেন। বিরোধী দলে গেলেই সংলাপ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। যেন সংলাপেরও একটি রাজনৈতিক ঠিকানা আছে!
উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, Democracy is the worst form of government except for all those other forms that have been tried.’ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখে। আর সেই সংশোধনের প্রথম শর্তই হচ্ছে কথোপকথন।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা শুধু নিজেদের মতো মতামতই বেশি শুনি। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে আরও পোক্ত করে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব কমই প্রসারিত করে। ফলে রাজনৈতিক মতভেদ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বৈরিতায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রহণযোগ্য সংস্কার নয়; একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ সংস্কার ও আস্থা তৈরি হয় বহু বছর ধরে।
গণতন্ত্রে জয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরাজিত পক্ষের নিরাপত্তাবোধ। যে নির্বাচনে বিজয়ী আনন্দিত হয়, কিন্তু পরাজিত নিরাপদবোধ করে না, সেখানে গণতন্ত্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
২. রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি, গণতন্ত্রেরও অর্থনীতি
আস্থার প্রশ্ন থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি শুনতে অর্থনীতির মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ভিতরে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনে অংশ নেয় না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতৃত্ব তৈরি করে, নীতি প্রণয়ন করে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে গণতন্ত্রও একসময় অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে।
এ কারণেই জার্মানি, সুইডেন, কানাডা কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নির্দিষ্ট শর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় বা নির্বাচনি ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত পায়। তবে সেখানে অর্থের সঙ্গে জুড়ে থাকে কঠোর হিসাব, স্বাধীন নিরীক্ষা, অনুদানের প্রকাশ্য তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন শাস্তি। অর্থ দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও রাজনৈতিক দলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন গণতন্ত্রের বিকল্প নয়; এটি গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য উপকরণ মাত্র। দল যদি নিজেই গণতান্ত্রিক না হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সরকারি অর্থও তাকে গণতান্ত্রিক করতে পারবে না।
একটি পুরোনো প্রবাদ আছে ‘Money talks.’ কিন্তু গণতন্ত্রে অর্থের চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত নীতি। আমরা যদি রাজনীতিতে কালোটাকার প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে শুধু অর্থের উৎস নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎসও বদলাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্রেরই প্রতিফলন।
৩. আড়াই শতকের আমেরিকা : ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের শক্তি
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আড়াই শতকের এই যাত্রা কখনোই সরল ছিল না। গৃহযুদ্ধ হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হত্যা হয়েছে, মহামন্দা এসেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলন হয়েছে, রাজনৈতিক মেরূকরণও বেড়েছে। তবু রাষ্ট্রটি টিকে আছে। কেন? কারণ একটি রাষ্ট্রকে শুধু জনপ্রিয় নেতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও বহন করে।
১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার নিজেকে নতুন করে গড়েছে। সংবিধান সংশোধন করেছে, ভুল স্বীকার করেছে, আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই-এটি নিখুঁত নয়, কিন্তু নিজেকে সংশোধনের সুযোগ রাখে।
বাংলাদেশের জন্যও এখানেই শিক্ষা। আমাদেরও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে। কারণ ব্যক্তি ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই সেই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও আজ নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা-সম্পর্কের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, আবার হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তা দুই দেশের মধ্যে একটি মানবিক সেতু তৈরি করেছেন।
বর্তমান বিশ্বে বিচক্ষণ রাষ্ট্রগুলো একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করে না; তারা সবার সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী। বাংলাদেশেরও সেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। কূটনীতির পরিণত রূপ নিরপেক্ষতা নয়; কৌশলগত প্রজ্ঞা।
৪. সাফল্যের আলো আর অদৃশ্য মানুষের ছায়া
রাষ্ট্রের গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের গল্পেই এসে মিশে যায়। আমরা সবাই সাফল্য দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সাফল্যের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, এর মুখ দৃশ্যমান, কিন্তু এর ভিত্তি অদৃশ্য। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নেন, অথচ সেই মঞ্চ তৈরির গল্পে থাকে একজন শিক্ষক, একজন সহকর্মী, একজন সম্পাদক, একজন অফিস সহকারী, একজন চালক, একজন জীবনসঙ্গী কিংবা এমন একজন বন্ধু, যিনি আলো আসার আগেই বিশ্বাস করেছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ অনেক সময় অর্থ নয়, আস্থা।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ আমার মনে হয়, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, তাদের ভুলে যাওয়াও একধরনের পাপ। কারণ কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতা। মানুষ যত বড় হয়, তার স্মৃতিও তত বড় হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। উচ্চতা বাড়ে, স্মৃতি ছোট হয়ে যায়।
গাছ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, কিন্তু বেঁচে থাকে শিকড় দিয়ে। নেতৃত্বও তেমন। বড় নেতা শুধু নিজের অর্জনের হিসাব রাখেন না; তিনি মানুষের অবদানেরও হিসাব রাখেন। ইতিহাস হয়তো কয়েকটি নাম মনে রাখে, কিন্তু ইতিহাস তৈরিতে অংশ নেয় হাজারো অচেনা মানুষ। একজন সত্যিকারের নেতা জানেন, দরজায় তাঁর নাম লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজাটি বানিয়েছেন অন্য অনেকে।
শেষ কথা
এই সপ্তাহের চারটি বিষয়-বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের পথচলা এবং কৃতজ্ঞতার দর্শন-আসলে চারটি ভিন্ন গল্প নয়। এগুলো একই আয়নার চারটি প্রতিফলন।
প্রথমটি আমাদের শেখায়, আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। দ্বিতীয়টি মনে করিয়ে দেয়, জবাবদিহি ছাড়া প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। তৃতীয়টি বলে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে দীর্ঘজীবী করে। আর চতুর্থটি শেখায়, কৃতজ্ঞতা ছাড়া সাফল্য পূর্ণতা পায় না।
ইতিহাসের একটি নীরব অভ্যাস আছে। সে শুধু কে কত উঁচুতে উঠেছিল, সেটি মনে রাখে না; কে উঠতে গিয়ে কতজনকে সঙ্গে নিয়েছিল, আর কতজনকে ভুলে গিয়েছিল-সেটিও মনে রাখে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই, মানুষের ক্ষেত্রেও। শিখরে ওঠা অবশ্যই সাফল্য। কিন্তু শিখরকে ধরে রাখার শক্তি আসে শিকড় থেকে। তাই আমাদের রাজনীতিরও শিকড়ে ফিরতে হবে, গণতন্ত্রেরও শিকড়ে ফিরতে হবে, আর ব্যক্তিজীবনেও ফিরে যেতে হবে সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা আলো আসার অনেক আগে আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। কারণ শিখর মানুষকে পরিচিত করে। কিন্তু শিকড়ই মানুষকে স্থায়ী করে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ



